আইন

ধীরে ধীরে মুখ খুলছেন মামুনুল, জানাচ্ছেন চাঞ্চল্যকর তথ্য

হেফাজতে ই’স’লা’মের কেন্দ্রীয় যুগ্ম মহাসচিব ও ঢাকা মহানগর শাখার যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক এবং খেলাফত মজলিসের মহাসচিব মামুনুল হককে রি’মা’ন্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করছে পু’লিশ। এরইমধ্যে গেল রবিবার (১৮ এপ্রিল) মোহাম্ম’দপুরের একটি মাদরাসা থেকে অ’ভিযান চালিয়ে গ্রে’প্তা’রের পর প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে মামুনুল বেশ কিছু প্রশ্নের উত্তর দেন বলে ত’দ’ন্ত সংশ্লিষ্টদের সূত্রে জানা গেছে।

প্রথম বিয়ে ছাড়াও দুই জান্নাতকে কন্ট্রাকচ্যুয়াল (চুক্তিভিত্তিক) বিয়ে করেছিলেন মামুনুল। ত’দ’ন্ত সংশ্লিষ্টদের কাছে তিনি দাবি করেছেন, মূলত অর্থনৈতিক নিশ্চয়তা দিতেই দুই ডিভোর্সি না’রীকে বিয়ে করেছিলেন।

প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে মামুনুল হক বলেছেন, সোনারগাঁওয়ে রয়েল রিসোর্ট’কা’ণ্ডে শুরুতেই অন্য স্ত্রী’দের কথা স্বীকার করলে প্রথম স্ত্রী’ আ’মেনা তৈয়বা বড় ধরনের কা’ণ্ড ঘটিয়ে ফেলতেন বলে ধারণা ছিল তার। এ কারণে তৎক্ষণাৎ স্বীকার করেননি। গত রবিবার (১৮ এপ্রিল) দুপুরে গ্রে’প্তা’রের পর জিজ্ঞাসাবাদের প্রথম দিনেই অন্য গুরুত্বপূর্ণ অনেক তথ্যের সঙ্গে এসব কথাও বলেছেন এই হেফাজত নেতা।

পু’লিশ জানিয়েছে, কথিত দুই বিয়ের সাক্ষীদের শিগগিরই জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ডা’কা হবে। একইসঙ্গে রি’মা’ন্ডে তাকে মোদবিরোধী বি’ক্ষো’ভ ও স’হিং’সতায় উস্কানি দেয়ার অ’ভিযোগ স’ম্প’র্কে জিজ্ঞাসাবাদের পাশাপাশি অন্যান্য বিষয়েও ব্যাপক জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে বলে জানা গেছে।

মোহাম্ম’দপুর থা’নায় দায়ের করা মা’ম’লায় সোমবার (১৯ এপ্রিল) মামুনুলের ৭ দিনের রি’মা’ন্ড মঞ্জুর করেন ঢাকা মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট দেবদাস চন্দ্র অধিকারীর আ’দা’লত।

ডিবি কার্যালয়ে মামুনুলকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। তবে পু’লিশের তেজগাঁও বিভাগের উপকমিশনার হারুন অর রশিদ জানিয়েছেন, নিরাপত্তার স্বার্থেই মামুনুলকে গোয়েন্দা কার্যালয়ে রাখা হয়েছে। সেখানে ত’দ’ন্ত সংশ্লিষ্ট কর্মক’র্তারা তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করছেন। মঙ্গলবার (২০ এপ্রিল) জিজ্ঞাসাবাদে তিনি নিজেও থাকবেন।

হারুন অর রশিদ বলেন, ‘এখন পর্যন্ত মামুনুল প্রথম বিয়ে ছাড়া বাকি দুই বিয়ের স্বপক্ষে কোনও প্রমাণ দেখাতে পারেননি। এমনকি বিয়ের সাক্ষীদের নাম প্রকাশের ব্যাপারেও গড়িমসি করছেন। দ্বিতীয় জান্নাতের ভাই শাহ’জাহানের জিডি নিয়ে আম’রা কাজ করছি।’

এদিকে গতকাল রি’মা’ন্ডের প্রথম দিন জিজ্ঞাসাবাদে মামুনুল হক গোয়েন্দা কর্মক’র্তাদের বলেছেন, তার যে দুটি বিয়ে নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে ওই দুই না’রীর সঙ্গে অনেক দিন ধরে স্বামী-স্ত্রী’ হিসেবে বসবাস করে আসছেন তিনি। তবে বিয়ে সংক্রান্ত কোনও বৈধ কাগজপত্র তার কাছে নেই। কাবিনও নেই। ওই দুই না’রীর ডিভোর্স হওয়ায় মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি নিয়েই তাদের দিকে এগিয়ে যান তিনি। একজনকে মোহাম্ম’দপুরের একটি মাদরাসায় চাকরিও দিয়েছেন।

কিন্তু কাগজপত্র ও কাবিননামা না থাকা সত্ত্বেও বিয়ে কীভাবে বৈধ হলো- এমন প্রশ্নে অসংলগ্ন উত্তর দিয়েছেন মামুনুল। রি’মা’ন্ডে নেয়ার প্রথম দিন পর্যন্ত কোনও স্বজন, সহকর্মী বা অনুরাগী তার খোঁজ নেননি বলে ত’দ’ন্ত সংশ্লিষ্ট কর্মক’র্তারা গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন।

মা’রধর, হ’ত্যার উদ্দেশ্যে আ’ঘাত, গুরুতর জ’খ’ম, চু’রি, হু’মকি ও ধ’র্মীয় কাজে ইচ্ছাকৃতভাবে গোলযোগের অ’ভিযোগ এনে স্থানীয় এক ব্যক্তি গত বছর মোহাম্ম’দপুর থা’নার মামুনুলের বি’রু’দ্ধে এ মা’ম’লা’টি দায়ের করেন। সেই মা’ম’লায়ই মামুনুলকে আ’দা’লতে হাজির করে ৭ দিনের রি’মা’ন্ড আবেদন করেন মোহাম্ম’দপুর থা’নার উপপরিদর্শক (এসআই) সাজেদুল হক। আ’দা’লত সেই আবেদন মঞ্জুর করে মামুনুলকে ৭ দিনের রি’মা’ন্ডে পাঠানোর আদেশ দেন।

গত রবিবার (১৮ এপ্রিল) দুপুর ১২টা ৫০ মিনিটের দিকে গোয়েন্দা পু’লিশের একাধিক টিম ও ডিএমপির তেজগাঁও বিভাগের যৌথ অ’ভিযানে রাজধানীর মোহাম্ম’দপুরের জামিয়া রাহমানিয়া মাদরাসার দোতলার একটি কক্ষ থেকে মামুনুল হককে গ্রে’প্তা’র করা হয়। গ্রে’প্তা’রের পর প্রথমে তাকে মিরপুর সড়কে পু’লিশের তেজগাঁও ডিভিশনের ডিসি কার্যালয়ে নেয়া হয়। সেখান থেকে নেয়া হয় মিন্টো রোডের ডিবি কার্যালয়ে।

জিজ্ঞাসাবাদের জন্য সেখান থেকে মামুনুল হককে নেয়া হয় তেজগাঁও থা’নায়। সেখানে কয়েক ঘণ্টা জিজ্ঞাসাবাদের পর রাতে মামুনুলকে গোয়েন্দা পু’লিশের কাছে হস্তান্তর করা হয়।

ডিসি হারুন জানিয়েছেন, জিজ্ঞাসাবাদের শুরুতেই মামুনুল হকের কাছে তার কথিত বিয়ে ও হ’জরত মুহম্ম’দকে (সা.) নিয়ে ব্যঙ্গ করার বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে তিনি নিজের মতো ব্যাখ্যা দেন। তবে এটা স্বীকার করেছেন যে, এসব বিষয়ে কোনও আইনগত প্রমাণ তার কাছে নেই। অন্য প্রশ্নে চুপ থাকেন।

মামুনুলকে জিজ্ঞাসাবাদের সঙ্গে সরাসরি যু’ক্ত অ’পর একজন কর্মক’র্তা জানিয়েছেন, মামুনুলের কাছে জানতে চাওয়া হয়, হেফাজতের অধিকাংশ কর্মসূচি ঘিরে কেন তা’ণ্ড’ব ও নৃশংত হা’ম’লার ঘটনা ঘটে। ই’স’লা’ম তো এসব সম’র্থন করে না। সংগঠনটির নাম যখন হেফাজতে ই’স’লা’ম তখন কেন এর নেতাকর্মীরা এসব বর্বরতা এড়াতে আরও সতর্ক থাকেন না। এসব প্রশ্নে মামুনুল হক বলেন, ‘আমি যেহেতু নেতা, এর দায় আমা’রও রয়েছে। আমাকে এর দায় নিতেই হবে। তবে অন্যান্য রাজনৈতিক সংগঠনও তো সংঘাতে জড়ায়।’ অন্যান্য দলের খা’রা’প দৃষ্টান্ত হেফাজত কেন অনুসরণ করবে- এমন প্রশ্নে চুপ থাকেন মামুনুল।

২০১৩ সালে শাপলা চত্বরে হেফাজতের কর্মসূচি ঘিরে জ্বালাও-পোড়াও, পবিত্র কোরআন শরিফে আ’গু’ন দেয়া, বঙ্গবন্ধুকে কটাক্ষ করে বক্তব্য দেয়ার বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে ত’দ’ন্ত কর্মক’র্তাদের কোনও স্পষ্ট জবাব দেননি মামুনুল হক।

সংশ্লিষ্ট একজন কর্মক’র্তা জানিয়েছেন, এরইমধ্যে মানসিকভাবে ভে’ঙে পড়েছেন মামুনুল। ভেতরে-বাইরে তিনি দ্বৈত চরিত্রের অধিকারী। এটি প্রকাশ হয়ে যাওয়ার পর থেকে তার মধ্যে হতাশা তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে কথিত বিয়ের কাহিনি ফাঁ’স হওয়ার পর থেকে ঘরে-বাইরে চাপে আছেন তিনি। হেফাজতের ভেতরেও একটি অংশ তার কর্মকা’ণ্ড নিয়ে ক্ষুব্ধ। রয়েল রিসোর্ট’কা’ণ্ডের পর প্রথম স্ত্রী’সহ নিজের পরিবারের সদস্যদের কারও কারও কাছে তিনি বিরাগভাজন হয়েছেন। নারায়ণগঞ্জ থেকে ফিরে বাসায়ও যাননি।

ত’দ’ন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, মোহাম্ম’দপুরের যে মা’ম’লায় মামুনুলকে রি’মা’ন্ডে নেয়া হয়েছে, সে সংক্রান্ত ভিডিও ফুটেজ গতকাল জ’ব্দ করেছেন তারা। মূলত তাবলিগ জামাতকে কেন্দ্র করে জুবায়ের ও মোহাম্ম’দ সাদ কান্ধালভি গ্রুপের মধ্যে এ মা’রামা’রি ও সং’ঘ’র্ষের ঘটনা ঘটেছিল। মামুনুল ছিলেন জুবায়েরপন্থি।

সংশ্লিষ্ট এক কর্মক’র্তা আরও জানিয়েছেন, মামুনুলের কথিত ছোট স্ত্রী’ জান্নাতুল ফেরদৌস লিপি। তবে জান্নাত আরা ঝর্ণাকে দ্বিতীয় স্ত্রী’ হিসেবে দাবি করেছেন তিনি। তার প্রথম স্ত্রী’র নাম আ’মেনা তৈয়বা। কথিত মেজো ও ছোট স্ত্রী’র সঙ্গে বিয়ের কোনও কাবিন হয়নি বলে পু’লিশকে জানিয়েছেন মামুনুল।

কাবিন হলো বিয়ের আইনি দলিল। মু’সলিম পারিবারিক আইনে বিয়ের নিবন্ধন একটি প্রামাণ্য দলিল হিসেবে কাজ করে। নিবন্ধন ছাড়া স্বামী-স্ত্রী’র স’ম্প’র্ক প্রমাণ করা কঠিন। বিয়ের নিবন্ধন না থাকা শা’স্তিযোগ্য অ’প’রা’ধ। এ অ’প’রা’ধে দু’বছর বিনাশ্রম কারাদ’ণ্ড ও তিন হাজার টাকা জ’রিমানা বা উভ’য় দ’ণ্ডের বিধান রয়েছে।

অ’পর একজন ত’দ’ন্ত সংশ্লিষ্ট কর্মক’র্তা বলেছেন, ‘জিজ্ঞাসাবাদে মামুনুল হক অনেক প্রশ্নের উত্তর এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছেন। হেফাজতের অর্থনৈতিক প্রবাহ কোথা থেকে আসে এ প্রশ্নটি তিনি কৌশলে এড়ানোর চেষ্টা করছেন। তবে এটি হয়তো তিনি পারবেন না। মাত্র তো রি’মা’ন্ডে পেলাম, দেখা যাক।’

তবে দেশব্যাপী বেপরোয়া তা’ণ্ড’বের নেপথ্যে হেফাজতের শীর্ষ নেতাদের যে উস্কানি ছিল মামুনুল হক তাদের অন্যতম বলেও জানান ত’দ’ন্ত কর্মক’র্তা।

গেল রবিবার (১৮ এপ্রিল) গ্রে’প্তা’রের পরই প্রথমে তাকে মিরপুর সড়কে পু’লিশের তেজগাঁও ডিভিশনের ডিসি কার্যালয়ে নেয়া হয়। সেখান থেকে নেয়া হয় মিন্টো রোডের ডিবি কার্যালয়ে। সেখানে কয়েক ঘণ্টা জিজ্ঞাসাবাদের পর রাতে মামুনুলকে গোয়েন্দা পু’লিশের কাছে হস্তান্তর করা হয়।

পু’লিশ জানিয়েছে, ২০১৩ সালের ৫ মে মতিঝিলের শাপলা চত্বরে হেফাজতে ই’স’লা’মের তা’ণ্ড’বের ঘটনাসহ মামুনুল হকের বি’রু’দ্ধে ১৭টি মা’ম’লা রয়েছে। এসব মা’ম’লায় তিনি এজাহারনামীয় আ’সা’মি। এছাড়া স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী উপলক্ষে সাম্প্রতিক মোদীবিরোধী আ’ন্দোলনের সময় স’হিং’সতার মূল হোতা হিসেবেও মামুনুলের বি’রু’দ্ধে একাধিক মা’ম’লা রয়েছে।

গত ৩ এপ্রিল নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁওয়ে রয়েল রিসোর্টে এক না’রীর (ঝর্ণা) সঙ্গে অবস্থানকালে অ’ব’রু’দ্ধ হন হেফাজত নেতা মামুনুল হক। ওইদিন তিনি পু’লিশের জিজ্ঞাসাবাদে জানান, সঙ্গে থাকা না’রী তার দ্বিতীয় স্ত্রী’। দুই বছর আগে শরিয়া আইন মোতাবেক ওই না’রীকে তিনি বিয়ে করেন। যদিও পরবর্তীতে তার দ্বিতীয় বিয়ের বিষয়টি নিয়ে ব্যাপক বিতর্কের সৃষ্টি হয়।

অ’ব’রু’দ্ধ হওয়ার কয়েক ঘণ্টা পরই হেফাজত নেতারা ওই রিসোর্টে লা’ঠিসোটা নিয়ে ব্যাপক ভাঙচুর ও নাশকতা চালিয়ে মামুনুল হককে মুক্ত করে নিয়ে যায়। এ ঘটনার পর মামুনুলে দ্বিতীয় বিয়ের বিষয়টি প্রকাশ্যে আসে।

ওইদিনই হেফাজতের নেতাকর্মীরা রিসোর্ট, স্থানীয় আওয়ামী লীগের কার্যালয়, বাড়িঘরে হা’ম’লা ও ভাঙচুর এবং যানবাহনে অ’গ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটায়। এছাড়া তারা ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে আ’গু’ন জ্বালিয়ে অবরোধ করে।

পু’লিশের ওপর হা’ম’লা ও রিসোর্টে ভাঙচুরের অ’ভিযোগে মামুনুল হকসহ ৮৩ জনের নাম উল্লেখ করে মা’ম’লা হয়। এছাড়া মা’ম’লায় ৫০০ থেকে ৬০০ জনকে অ’জ্ঞা’তনামা আ’সা’মিও করা হয়।

মা’ম’লায় সরকারি কাজে বাধা, পু’লিশের ওপর হা’ম’লা ও রিসোর্টে ভাঙচুরের অ’ভিযোগ এনে ৪১ জনের নাম উল্লেখ করা হয় এবং অ’জ্ঞা’ত ২৫০-৩০০ জনকে আ’সা’মি করা হয়। মা’ম’লায় মামুনুল হককে প্রধান আ’সা’মি করা হয়।

এ মা’ম’লা ছাড়াও যানবাহনে অ’গ্নিসংযোগ ও ককটেল বি’স্ফোরণের অ’ভিযোগে ৪২ জনের নাম উল্লেখ ও ২৫০/৩০০ জনকে অ’জ্ঞা’ত আ’সা’মি করে আরেকটি মা’ম’লা করা হয়। ওই মা’ম’লায় হেফাজতে ই’স’লা’ম, জাতীয় পার্টি ও বিএনপি নেতাকর্মীদেরও এজাহারভুক্ত করা হয়।

Back to top button