ইসলাম ও জীবন

শাবান মাসের আমল ও ফজিলত

নবিজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম শাবান মাসে সবচেয়ে বেশি নফল ইবাদত করতেন। রমজানের আগের দুই মাসজুড়ে নফল ইবাদত ও রোজা রাখার অভ্যাস গড়ে তুলতেন। এ কারণেই রজবকে আল্লাহর মাস, শাবানকে নবীজির মাস আর রমজানকে উম্মতের মাস মাস বলা হয়। তাই ই’স’লা’মিক স্কলররা ইবাদত করা ও রোজা রাখার মাধ্যমে কীভাবে নিজেদের প্রস্তুত করা যায়, তার একটি চ’মৎকার উপমা তুলে ধরেন। তাহলো-

মুমিন মু’সলমান রজব মাসে ইবাদতের মাধ্যমে মনের জমিন চাষাবাদ করবে, শাবান মাসে আরও বেশি নফল ইবাদত ও রোজা রাখার অভ্যাস গঠনের মাধ্যমে মনের জমিনে বীজ বপন করবে। আর রমজান মাসজুড়ে শুধু রাতের কিয়াম তথা ইবাদত এবং দিনের সিয়াম তথা রোজা পালনের মাধ্যমে সফলতার সঙ্গে জমিন থেকে ফসল ঘরে তুলবে মুমিন মু’সলমান।

তবে নবিজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম শাবান মাসজুড়ে ইবাদত-বন্দেগি করতেন এবং অনেক বেশি রোজা রাখতেন। শাবান মাসের মতো এতবেশি রোজা রমজান ছাড়া অন্য কোনো মাসে রাখেন। এ বিষয়গুলো হাদিসের একাধিক বর্ণনায় তা ফুটে ওঠেছে-

১. হ’জরত আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা বর্ণনা করেছেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম রোজা রাখতে থাকতেন, যাতে আম’রা বলতাম যে, তিনি (এ শাবান মাসে) আর রোজা ছাড়বেন না; আবার তিনি রোজা ভাঙ্গতে শুরু করতেন, যাতে আম’রা বলতাম যে, তিনি (এ শাবান মাসে) আর রোজা রাখবেন না।

আমি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে রমজান মাস ছাড়া আর কখনো পূর্ণ মাস রোজা রাখতে দেখিনি। আর তাঁকে শাবান মাস ছাড়া কোনো মাসে এতো বেশি রোজা রাখতেও দেখিনি। হাদিসে পাকে এসেছে-

২. অন্য বর্ণনায় তিনি (আয়েশা) বলেছেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম শাবানের পূর্ণমাসই রোজা রাখতেন। তিনি শাবানের রোজা রাখতেন তবে অল্প কিছু দিন (রাখতেন না)। (বুখারি, মু’সলিম, মু’সনাদে আহমাদ, বাইহাকি, আবু দাউদ, মিশকাত)

৩. হ’জরত উসামা রাদিয়াল্লাহু আনহু বর্ণনা করেছেন, একদিন আমি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে এ মাসে (শাবান) বেশি বেশি রোজা রাখার কারণ জিজ্ঞাসা করলাম। তিনি উত্তরে বললেন- ‘লোকেরা রজব ও রমজান এ দুই মাসের গুরুত্ব বেশি দেয় এবং রোজাও রাখে। কিন্তু মধ্যবর্তী এ মাসটিকে উপেক্ষা করে চলে। অথচ এ মাসেই বান্দার আমলসমূহ আল্লাহর দরবারে উপস্থিত করা হয়।

আর আমা’র কা’মনা হলো- আমা’র আমলসমূহ আল্লাহর দরবারে উপস্থাপন করার সময় আমি রোজা অবস্থায় থাকি। এ কারণেই আমি শাবান মাসে বেশি বেশি রোজা রাখি। (নাসাঈ, আবু দাউদ)

মহান মাস শাবান

আরবি অষ্টম মাস- শাবান। এ মাসের পূর্ণ নাম হলো- ‘আশ শাবানুল মুআজজাম তথা মহান শাবান মাস’। সে কারণেই নবিজী মাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এ মাসজুড়ে বেশি বেশি ইবাদত-বন্দেগি ও রোজা পালন করতেন।

নবিজীর দোয়া

নবিজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম রজব মাসের শুরু থেকেই রজব ও শাবান মাসব্যাপী রোজা পালন করতেন। আল্লাহর কাছে এ মাস দুইটির বরকত কা’মনা করতেন। আর শাবান মাস এলে শাবান মাসের বরকত কা’মনা করতেন এবং রমজান পাওয়ার জন্য আবেদন করতেন। নবিজী শাবান মাসে আল্লাহর কাছে এভাবে দোয়া করতেন-

اَللَّهُمَّ بَارَكْ لَنَا فِىْ شَعْبَانَ وَ بَلِّغْنَا رَمَضَان

উচ্চারণ : ‘আল্লাহু’ম্মা বারাকলানা ফি শাবান ওয়া বাল্লিগনা রামাদান।’

অর্থ : ‘হে আল্লাহ! শাবান মাসকে আমাদের জন্য বরকতময় করুন এবং আমাদেরকে রমজানে পৌঁছে দিন।’ (মু’সনাদে আহমাদ, বায়হাকি)

শাবান মাসের রোজা

নিসফা শাবানে নবিজী রোজা পালন করতেন। কবর জিয়ারত করেছেন। আল্লাহর কাছে দোয়া করেছেন। বিশেষ করে অন্যান্য আরবি মাসগুলো মতো মধ্য শাবানে আইয়ামে বিজের রোজা রাখার পাশাপাশি লাইলাতুল বরাত উদযাপনে রোজা ও ইবাদত করার দিকনির্দেশনাও আছে হাদিসের নির্দেশনায়। তবে এ উপলক্ষ্যে অন্যান্য কিছু কাজ করা হয়; যা বাড়াবাড়ির নামান্তর। আবার অনেকে ইবাদতের ক্ষেত্রে এমন ভান দেখায় যে, নিসফা শাবান, আইয়ামে বিজ ইত্যাদি ইবাদত বলে কিছু নেই। না, তা সঠিক নয়, বরং এ রাতের ইবাদত ম’র্যাদার আবার এ রাতটি আইয়ামে বিজের রাতও বটে। আর এ দিনে রোজা রাখা সুন্নাত আমলও বটে।

নবিজীর অনুসরণ ও অনুকরণে সুন্নাত রোজা

বছরজুড়ে প্রতি সপ্তাহ, মাস ও বছরের নির্ধারিত সময়ে রোজা পালনের দিকনির্দেশনা আছে ই’স’লা’মে। নবিজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বছরজুড়ে প্রতি সপ্তাহে দুইটি রোজা রাখতেন-

>> সপ্তাহিক রোজা

১. সোমবার (নবিজীর জন্ম’দিন উপলক্ষ্যে দোয়া)

২. বৃহস্পতিবারের রোজা; এ দিন আল্লাহর কাছে বান্দার সপ্তাহিক আমলনামা পেশ করা হয়।

>> আইয়ামে বিজের রোজা

১৩, ১৪ ও ১৫ তারিখে আইয়ামে বিজের নফল রোজা রাখা। মাসের শাবান মাসের আইয়ামে বিজের রোজা নিসফা শাবানের অন্তর্ভূক্ত। এমনিতেই মধ্য শাবানের মাস ফজিলতপূর্ণ; তার ওপর এ দিনের রোজা রাখার ফজিলত আরও বেশি।

>> মাসিক রোজা

প্রতি চান্দ্র মাসের- ১, ১০, ২০, ২৯ ও ৩০ তারিখে রয়েছে নফল রোজা। এ ছাড়া কোনো সময় ও দিন-তারিখ নির্ধারণ ছাড়া যত বেশি সম্ভব নফল ইবাদত করা যায়। আর তাতে আল্লাহর নৈকট্য অর্জন হয় খুব দ্রুত। ই’স’লা’মিক স্কলারদের মধ্যে কারো বক্তব্য এমন যে-

রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম প্রায় রজব মাসে- ১০টি নফল রোজা রাখতেন এবং শাবান মাসে- ২০টি নফল রোজা রাখতেন। রমজানে পূর্ণ মাস (৩০ দিন) ফরজ রোজা রাখতেন। নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম রমজান ছাড়া বছরের সবচেয়ে বেশি শাবান মাসেই নফল নামাজ, নফল রোজা ও নফল ইবাদত-বন্দেগি করতেন।

শাবান মাসের সতর্কতা

শাবান মাসে নফল ইবাদত-বন্দেগিতে সতর্ক থাকতে হবে। কারণ কোনোভাবেই যেন কোনো ফরজ ওয়াজিব, সুন্নাত ও মোস্তাহাব কাজ ছুটে না যায়। এ মাসে যেন কোনো নিষিদ্ধ কাজ সংঘটিত না হয়।

শাবান মাসের অন্যতম কাজ

রমজানের রোজা পালনের জন্য শাবান মাসের চাঁদের হিসাব রাখা। হাদিসে পাকে নবিজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ঘোষণা করেছেন, ‘তোম’রা রমজানের জন্য শাবানের চাঁদের হিসাব রাখো।’

আল্লাহ তাআলা মু’সলিম উম্মাহকে শাবান মাসের এ কাজগুলো যথাযথভাবে আদায় করার তাওফিক দান করুন। আমিন।

এমএমএস/এএসএম

Back to top button