জাতীয়

সাড়ে পাঁচ বছরেও হয়নি পূর্ণাঙ্গ কমিটি, নতুনভাবে গঠনে তোড়জোড়

তিন বছর মেয়াদের কমিটির বয়স সাড়ে পাঁচ বছর হলেও পূর্ণাঙ্গ কমিটি করতে পারেনি বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী যুবদল। সভাপতি সাইফুল আলম নীরব ও সাধারণ সম্পাদক সুলতান সালাউদ্দিন টুকুর নেতৃত্বাধীন যুবদলের কমিটি মেয়াদোত্তীর্ণ হওয়ায় নতুন কমিটি গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। আজ-কালের মধ্যে যে কোনো সময় যুবদলের নতুন কমিটি ঘোষণা হবে। তবে নতুন কমিটি গঠনের খবরে হতাশা ব্যক্ত করেছেন পূর্ণাঙ্গ (মেয়াদোত্তীর্ণ) কমিটিতে পদপ্রত্যাশীরা। তাদের দাবি, অল্প সময়ের জন্য হলেও স্বেচ্ছাসেবক দলের মতো যুবদলেও পূর্ণাঙ্গ করা হোক। এতে করে দীর্ঘদিন ধরে পদহীন থাকা ছাত্রদলের সাবেক নেতাদের সাংগঠনিক পরিচয় নিশ্চিত হবে।

সংগঠনটির একাধিক সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।সূত্র মতে, নতুন কমিটির সভাপতি পদে সংগঠনের বর্তমান সাধারণ সম্পাদক সুলতান সালাউদ্দিন টুকু, সিনিয়র সহ-সভাপতি পদে যুবদলের ঢাকা মহানগর উত্তরের সভাপতি এসএম জাহাঙ্গীর, সাধারণ সম্পাদক পদে বর্তমান সাংগঠনিক সম্পাদক মামুন হাসান, সিনিয়র যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক পদে ছাত্রদলের সাবেক সাধারণ সম্পাদক আমিরুল ই’স’লা’ম আলিম এবং সাংগঠনিক সম্পাদক হিসেবে ছাত্রদলের সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক ইসহাক সরকারের নাম চূড়ান্ত হয়েছে।

তবে অ’পর একটি সূত্রের দাবি, যুবদলের বর্তমান সাংগঠনিক সম্পাদক মামুন হাসান সভাপতি, ছাত্রদলের সাবেক সাধারণ সম্পাদক হাবিবুর রশিদ হাবিব সিনিয়র সহ-সভাপতি, ছাত্রদলের সাবেক সাধারণ সম্পাদক আমিরুজ্জামান খান আলিম সাধারণ সম্পাদক, ছাত্রদলের সাবেক সাধারণ সম্পাদক আকরামুল ই’স’লা’ম মিন্টু সিনিয়র যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক এবং ছাত্রদলের সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক ইসহাক সরকারকে সাংগঠনিক সম্পাদক পদে রেখে সুপার ফাইভ তালিকা চূড়ান্ত হয়েছে।

দলীয় সূত্রে জানা গেছে, গত ৯ মে নয়াপল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে যুবদলের কমিটি গঠনের বিষয়ে কেন্দ্রীয় নেতাদের মতামত নেন তারেক রহমান। বিকাল ৩টা থেকে রাত সাড়ে ১০টা পর্যন্ত কেন্দ্রীয় ৪১ জন নেতার সঙ্গে ভা’র্চুয়ালি যু’ক্ত হয়ে মতামত নেন তিনি। পৃথকভাবে নেওয়া যুবদল নেতাদের মতামতের মধ্যে অধিকাংশই নতুন কমিটির পক্ষে অবস্থান নেন। বর্তমান কমিটির বিষয়ে কী করা উচিত, নতুন কমিটি করলে কোন ধরনের নেতা নির্বাচন করা উচিত এবং জে’লা কমিটির বিষয়ে কী করা উচিত- এ ধরনের নানা প্রশ্ন করেন তিনি। এ বিষয়ে কেন্দ্রীয় নেতারা তারেক রহমানকেই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার ন্যস্ত করেন।

সেদিন যুবদলের সভাপতি, সাধারণ সম্পাদক, সিনিয়র সহ-সভাপতি, সিনিয়র যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও সাংগঠনিক সম্পাদক উপস্থিত থাকলেও তাদের কোনো মতামত নেননি তারেক রহমান। তবে যুবদলের ১১৪ সদস্যের আংশিক কমিটির মধ্যে সহ-সভাপতি ও যুগ্ম সম্পাদকদের ৫১ জনের মধ্যে ৪১ জনের সঙ্গে কথা বলে তাদের মতামত নেন তিনি।

জানা গেছে, পৃথকভাবে যুবদল নেতাদের মতামত নেন তারেক রহমান। এ সময় তারেক রহমানের প্রথম প্রশ্ন ছিল কমিটি পূর্ণাঙ্গ চান, নাকি নতুন কমিটি চান? অধিকাংশ নেতা নতুন কমিটি দেওয়ার পক্ষে মতামত দেন। এরপর যিনি সভাপতি পদপ্রার্থী তার কাছে তারেক রহমান জানতে চান- তিনি সাধারণ সম্পাদক পদে কাকে চান? কেন চান? একইভাবে সাধারণ সম্পাদক পদপ্রাথীদের কাছে জানতে চান তিনি সভাপতি পদে কাকে চান? কেন চান?

বৈঠকে অংশ নেওয়া একাধিক সহ-সভাপতি ও যুগ্ম সম্পাদকদের সঙ্গে এই প্রতিবেদকের কথা হয়। তারা জানান, বিএনপির ভা’রপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান যুবদলের সহ-সভাপতি ও যুগ্ম সম্পাদকদের সঙ্গে একজন একজন করে বৈঠক করেছেন। তিনি চাচ্ছেন ভবিষ্যতে যেন যুবদল নিয়ে কোনো বিতর্ক না হয়। অধিকাংশ নেতা নতুন কমিটির পক্ষে মতামত দিয়েছেন। এমনকি যুবদলের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক হিসেবে কাকে আনা যায় সেই মতামতও নিয়েছেন তিনি।

নতুন কমিটিতে সভাপতি পদপ্রত্যাশী ও বর্তমান কমিটির এক সহ-সভাপতি জানান, বৈঠকে তারেক রহমান জানতে চেয়েছেন আম’রা নতুন কমিটি চাই, নাকি পূর্ণাঙ্গ কমিটি? অধিকাংশ নেতাই মতামত দিয়েছেন নতুন কমিটির জন্য। সভাপতি পদে কাকে চান জানতে চাইলে বলেছি তিনবছর ধরে আমি নিজেই কেন্দ্রের সভাপতি হতে চাই। অন্তত তিন মাসের জন্য আমাকে দায়িত্ব দেন, গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় আ’ন্দোলন ও সংগঠনকে বেগবান করার জন্য কাজ করতে চাই।

যুবদলের আরেক সহ-সভাপতি বলেন, বর্তমান কমিটি নিয়ে বিভিন্ন আলোচনা হয়েছে। এছাড়া নতুন কমিটি নিয়েও আলোচনা হয়েছে। এখানে আমাদের অধিকাংশ নেতার মতামত নতুন কমিটি করার জন্য। সামনে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের আ’ন্দোলন। তাই এখন আ’ন্দোলনমুখী নেতৃত্ব প্রয়োজন। এ জন্যই আম’রা নতুন কমিটি করার কথা বলেছি।

এসব বিষয়ে যুবদলের আরেক সহ-সভাপতি বলেন, যুবদলের বর্তমান কমিটির বয়স প্রায় সাড়ে পাঁচ বছর। এমন অবস্থায় পূর্ণাঙ্গ কমিটির প্রস্তাব হাস্যকর। সামনে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের আ’ন্দোলন। তাই এখন আ’ন্দোলনমুখী নেতৃত্ব প্রয়োজন। নতুন কমিটি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, বিএনপির ভা’রপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের কাছে এখন যুবদলের ৩৫১ সদস্যের প্রস্তাবিত পূর্ণাঙ্গ কমিটির তালিকা রয়েছে। তাছাড়া তিনি নিজেও বিভিন্নভাবে খোঁজ-খবর নিচ্ছেন। ফলে নতুন আংশিক কমিটিও হতে পারে, আবার একসঙ্গে পূর্ণাঙ্গ কমিটিও হতে পারে। তবে আংশিক কমিটির সম্ভাবনাই বেশি।

এদিকে ছাত্রদলের রাজিব-আকরাম কমিটি থেকেও যুবদলে নেতৃত্ব নির্বাচনের জো’রালো দাবি রয়েছে। যুবদলের বর্তমান কমিটির বাইরে থেকে পদ প্রত্যাশীদের ভাষ্য, যারা এই মুহূর্তে যুবদলে আছেন তাদের পারফরম্যান্স কেমন সেটা দল মূল্যায়ন করবে। কিন্তু আ’ন্দোলনমুখী কমিটি করতে হলে কোনো ব্যক্তির প্রয়োজনে নয়, দলের প্রয়োজনে কমিটি তৈরি করা হোক। সেক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ইউনিটের দায়িত্ব পালন করা সাংগঠনিকভাবে দক্ষ ও অ’ভিজ্ঞদের প্রাধান্য দেওয়া উচিত। এমন কাউকে নেতৃত্ব আনা উচিত হবে না যার বি’রু’দ্ধে কমিটিতে পদ-বাণিজ্যের অ’ভিযোগ রয়েছে। কমিটিতে যেন কোনো অঞ্চলের প্রাধান্য না থাকে। আবার এমন নেতাকেও গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব দেওয়া ঠিক হবে না যার দেশব্যাপী সাংগঠনিক অ’ভিজ্ঞতা নেই। এছাড়া যুবদলের নেতৃত্বের বয়স ৪০-৫০ এর মধ্যে হওয়া উচিত বলেও মনে করছেন অনেকেই।

যুবদলের শীর্ষ পদ প্রত্যাশীদের মধ্যে আরও রয়েছেন- সংগঠনটির বর্তমান কমিটির সহ-সভাপতি আলী আকবর চুন্নু, জাকির হোসেন সিদ্দিকী, মাহবুবুল হাসান ভূঁইয়া পিংকু, সিনিয়র যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক নুরুল ই’স’লা’ম নয়ন ও দপ্তর সম্পাদক (যুগ্ম সম্পাদক পদম’র্যাদা) কা’ম’রুজ্জামান দুলাল। সংগঠনের বাইরে আলোচনায় রয়েছেন- সাবেক ছাত্রনেতা আনিসুর রহমান তালুকদার খোকন, কা’মাল আনোয়ার আহমেদ, জিয়াউর রহমান জিয়া, ছাত্রদলের সাবেক সভাপতি রাজিব আহসান, সাধারণ সম্পাদক আকরামুল হাসান, সাবেক সহ-সভাপতি আবু আল হাসান আতিক প্রমুখ।

২০১৭ সালের ১৬ জানুয়ারি সাইফুল আলম নীরবকে সভাপতি এবং সুলতান সালাউদ্দিন টুকুকে সাধারণ সম্পাদক করে যুবদলের সুপারফাইভ কমিটি ঘোষণা করা হয়। এরপর ২০১৯ সালের ডিসেম্বরে ২৭১ সদস্যের প্রস্তাবিত পূর্ণাঙ্গ কমিটি দলীয় ফোরামে জমা দেয় সংগঠনটি। পরে কমিটির মেয়াদ শেষে ২০২০ সালের ৭ ফেব্রুয়ারি যুবদলের ১১৪ সদস্যের আংশিক কমিটি ঘোষণা করা হয়। সর্বশেষ সম্পূরক হিসেবে গত ৪ এপ্রিল ৩৫১ সদস্যের প্রস্তাবিত পূর্ণাঙ্গ কমিটি দলীয় ফোরামে জমা দেয় সংগঠনটি।

কেন্দ্রীয় কমিটি পুনর্গঠন প্রসঙ্গে যুবদলের সভাপতি সাইফুল আলম নীরব বলেন, আম’রা ইতোমধ্যে দলীয় ফোরামে যুবদলের প্রস্তাবিত পূর্ণাঙ্গ কমিটি জমা দিয়েছি। দলের হাইকমান্ড এ ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেবেন। সংগঠনের সহ-সভাপতি ও যুগ্ম-সম্পাদকদের সঙ্গে বিএনপির হাইকমান্ডের বৈঠক প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এটি সাংগঠনিক প্রক্রিয়া। সংগঠনকে গতিশীল করার লক্ষ্যে মাঝেমধ্যে বিএনপির হাইকমান্ডের সঙ্গে এমন বৈঠক হয়।

নতুন কমিটির আলোচনা প্রসঙ্গে জানতে চাইলে সাইফুল আলম নীরব বলেন, কমিটি গঠন-পুনর্গঠন একটি চলমান প্রক্রিয়া। এক্ষেত্রে দলের হাইকমান্ড চাইলে যেকোনো সময় যেকোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারেন। আর সংগঠনের স্বার্থে দলের হাইকমান্ড যে সিদ্ধান্তই নেবেন সেটার প্রতি আমাদের পূর্ণ সম’র্থন থাকবে।

Back to top button