জাতীয়

মধ্যবিত্তের বোবা কা’ন্না, ক্ষোভে ফুঁসছেন নিম্নআয়ের মানুষ

লাফিয়ে বেড়ে চলা নিত্যপণ্যের মূল্যের কারণে ক্ষোভে ফুঁসছেন শিল্পাঞ্চল নারায়ণগঞ্জের নিম্নআয়ের মানুষ। চাল, ডাল, তেল, চিনি, আটা-ময়দা, পেঁয়াজসহ নিত্যপণ্যের সঙ্গে স্বস্তি নেই সবজির বাজারেও।

অবস্থা এমন জায়গায় পৌঁছেছে যে, নদীর মাছ, মুরগি কিংবা গরু বা খাসির মাংস এখন নিম্ন ও মধ্যবিত্তের কাছে সোনার হরিণের মতোই। যে ডিম, চাষের মাছ আর বয়লার মুরগি ছিল তাদের ভরসা সেখানেও দাম বেড়ে চলেছে পাল্লা দিয়ে। দাম বেড়ে যাওয়ায় এখন ডিম ও বয়লার মুরগি কিনতেও দশবার ভাবতে হচ্ছে নিম্নআয়ের মানুষের।

এর মধ্যে মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা হয়ে দাঁড়িয়েছে বাড়তি বাসা ভাড়া। বিশেষ করে নারায়ণগঞ্জের মধ্যবিত্ত পরিবারগুলোতে চলছে ‘বোবা কা’ন্না’। কী পরিমাণ ক’ষ্ট আর চাপা ক্ষোভ বিরাজ করছে তাদের মাঝে সে কথা উঠে এসেছে অনেকের চোখের কোণে জমে উঠা নোনা পানিতে।

নারায়ণগঞ্জে দেশের বৃহত্তম রপ্তানি খাত নিট শিল্পের সঙ্গেই প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে কাজ করছেন বিভিন্ন জে’লার প্রায় ১৫ লাখ মানুষ। এছাড়াও বিভিন্ন সেক্টরে রয়েছেন আরও প্রায় ১০ লাখ স্থানীয় ও অন্য জে’লার মানুষ-যাদের বেশিরভাগই নিম্ন ও মধ্যম আয়ের।

২০১৯-২০ এই দুই বছরে ক’রো’নার হটস্পট হিসেবে পরিচিতি পাওয়া নারায়ণগঞ্জে লকডাউন পরিস্থিতির কারণে চরম দুর্ভোগে পড়তে হয়েছিল এ বিশাল জনগোষ্ঠীকে। জনপ্রতিনিধি ও সরকারের তরফ থেকে পাওয়া ত্রাণের বাইরে জীবিকার মাধ্যম হারিয়ে বেশিরভাগ নিম্ন আয়ের মানুষই দিন কাটিয়েছেন অবর্ণনীয় দুর্দশায়। তবে ওই সময় সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগে ছিলেন মধ্যবিত্ত পরিবারগুলো। কারণ এ সব পরিবারের লোকজন মুখ খুলে কাউকে বলতেও পারেননি কিংবা হাত পাততেও পারেননি।

গত বছরের (২০২১) পুরোটা সময় সেই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের পথ খুঁজতে ও স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসার চেষ্টায় ছিলেন এসব নিম্ন ও মধ্যম আয়ের পরিবারগুলো। কিন্তু চলতি বছরে তাদের সামনে জীবিকা নির্বাহ করার জন্য কঠিন বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে দ্রব্যমূল্যের লাগামহীন বৃদ্ধি।

সরেজমিন শহরের পাইকারি ও খুচরা বাজারগুলোতে ঘুরে, বিভিন্ন শ্রমঘন এলাকায় নিম্ন ও মধ্যম আয়ের মানুষের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে তাদের দুর্দশার কথা।খোঁজখবর নিয়ে জানা গেছে, গত ২ মাসে গুঁড়োদুধের দাম কেজিতে বৃদ্ধি পেয়েছে ৩৮-৪০ টাকা। শি’শু খাদ্যের মূল্যও একইভাবে বেড়ে চলেছে দিনের পর দিন। এ ছাড়া যে সয়াবিন তেল এর মূল্য বৃদ্ধি নিয়ে দেশজুড়ে এত তোলপাড় হয়েছিল সেই সয়াবিন তেল বিক্রি হচ্ছে প্রতি কেজির মাপে ২০৬ টাকা আর লিটারের মাপে ১৯৩ টাকা। খুচরা বাজারে মোটা চাল (ইরি) বিক্রি হচ্ছে ৪৮-৫০ টাকা কেজি দরে, একটু কম মোটা চাল বিক্রি হচ্ছে ৬০-৬৫ টাকা কেজি দরে; যা আগের চেয়ে কেজিতে বেড়েছে ছয়-সাত টাকা। চিকন চাল বিক্রি হচ্ছে ৬৫-৭০ টাকা দরে।

এছাড়াও ডাল, চিনিসহ নিত্য ভোজ্যসামগ্রীর দাম বাড়ছে লাফিয়ে লাফিয়ে। খুচরা ও পাইকারি বাজারের ব্যবসায়ীরা আশ’ঙ্কা প্রকাশ করে বলছেন, আন্তর্জাতিক বাজারের কারণে এ মূল্য আরও বাড়তে পারে বলে।শহরের দ্বিগুবাবুর বাজারের ক্রেতা ব্যাংক কর্মক’র্তা চৌধুরী গো’লাম জিলানী বলেন, দ্রব্যমূল্য নিয়ে কিছু বলে আর লাভ নেই। আম’রা যারা চাকরিজীবী তাদের ওই এক হিসেবের মধ্যেই মাস পার করতে হয়। সেখানে জিনিস পত্রের দাম যেভাবে বাড়ছে মাস পার করার হিসেব কষতে কষতেই আমাদের ত্রাহি অবস্থা। এটা সত্যিই দুঃখজনক ব্যাপার।

অ’পর ক্রেতা গণমাধ্যম কর্মী আবির শিকদার জানান, দ্রব্যমূল্যের বৃদ্ধিও জন্য শুধু আন্তর্জাতিক বাজার আর বিদেশের যু’দ্ধকে দায়ী করেন কেউ কেউ। কিন্তু এই কারসাজির নেপথ্যে সবচেয়ে বড় ভূমিকায় আছেন কিছু অসাধু ব্যবসায়ী আর কিছু কালোবাজারি। যাদের সিন্ডিকে’টের কাছে জি’ম্মি হয়ে পড়েছে দেশের মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত মানুষ। সরকারের বাণিজ্যমন্ত্রীর বিম’র্ষ চেহারাই বলে দেয় কোনো কোনো ক্ষেত্রে সরকারকেও জি’ম্মি করে এরা। এজন্য সরকারের উচিত বাজার নিয়ন্ত্রণে অধিক সংখ্যায় মনিটরিং সেল গঠন করা। পাশাপাশি অসাধু ব্যবসায়ীদের কঠোর শা’স্তি ব্যবস্থা করতে হবে।

সিদ্ধিরগঞ্জের কয়েকজন স্কুলশিক্ষক ক্ষোভ জানিয়ে বললেন, কাকে কী বলবো? বাড়ি ভাড়া, বিদ্যুৎ বিলসহ বাসার খরচ, গ্রামের বাড়িতে থাকা বয়স্ক বাবা-মায়ের খরচ, অফিসে আসা-যাওয়া খরচ, নিজেদের মোবাইল খরচ, চিকিৎসা, ইন্টারনেট, ডিশ কানেকশনসহ কোন খরচটা বাদ দেওয়া যায় বলুন। এ সময় তাদের চোখে জমে উঠে নোনা জল।ক্ষোভের সুরে বললেন, মন্ত্রী-সচিবরা ঠিক কথাই বলেছেন। একদিনের তেলে ২ দিন খাবো। এক বেলার ভাত দুই বেলা খাবো। একমাত্র খাওয়ার খরচই কমাতে হয় আমাদের। তাই এখন মাছ-মাংসের কথা স্বপ্নেও ভাবি না, আর সবজি আর ডাল-ভাতও তিন বেলা খাওয়াই যেন ক’ষ্ট’কর হয়ে যাচ্ছে।

এদিকে কয়েক লাখ শ্রমিকের আবাসস্থল হিসেবে পরিচিত শিল্পাঞ্চল ফতুল্লার অসংখ্য গার্মেন্টস কর্মীর সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে তাদের অবর্ণনীয় দুর্ভোগের কথা।শ্রমিকরা জানান, ক’রো’নার মধ্যে কয়েক মাস কারখানা বন্ধ ছিল। বেতন বাড়েনি। বাড়িওয়ালা ক’রো’নার কারণে কিছু ভাড়া মাফ করলেও গত দেড় বছরে ভাড়া বাড়িয়েছে। বর্তমান বাজার দরে তারা হিমশিম খাচ্ছেন। তারা জানান, ডাল-ভাত যে তিন বেলা খাবো সেটাই তো ক’ষ্ট’কর হয়ে যাচ্ছে।বেশ কয়েকজন রিকশাচালকের সঙ্গে কথা বললে তারা জানান, সারা দিনে রিকশা চালিয়ে গ্যারেজে জমা’র টাকা দিয়ে ২শ টাকার বেশি হয় না। এ টাকায় পরিবার নিয়ে খাওয়া, থাকা, চিকিৎসা কেমনে সম্ভব। যাত্রীদের কাছে বেশি ভাড়াও চাওয়া যায় না; তারাও তো একই পরিস্থিতির শিকার।

Back to top button