জাতীয়

অর্থমন্ত্রীর বক্তব্যে ‘ফিনিক্স পাখির গল্প’

জাতীয় সংসদে ২০২২-২৩ অর্থবছরের বাজেট পেশ করছেন অর্থমন্ত্রী আ হ ম মু’স্তফা কা’মাল। বৃহস্পতিবার (৯ জুন) বিকেল ৩টায় বক্তব্যের শুরুতেই ‘এক ফিনিক্স পাখির গল্প’ উপস্থাপন করেছেন তিনি।

অর্থমন্ত্রীর সেই ফিনিক্স পাখি আর কেউ নন, বাঙালির আশা-আকাঙ্ক্ষা, স্বপ্ন ও সাহসের প্রতীক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। বাধা-বিপত্তি ও নানা ষড়যন্ত্র মোকাবিলা করে শেখ হাসিনার গণতন্ত্র ও উন্নয়নের সংগ্রামী পথচলাকে অর্থমন্ত্রী ফিনিক্স পাখির গল্প আকারে তুলে ধরেছেন। পাশাপাশি তার এই অব্যাহত অগ্রযাত্রায় বাংলাদেশের অর্জনও তুলে এনেছেন অর্থমন্ত্রী।

বক্তব্যের শুরুতেই মু’স্তফা কা’মাল একটি অডিও ভিজুয়াল প্রদর্শন করেন। তার টাইটেল দিয়েছেন ‘শেখ হাসিনা: এক ফিনিক্স পাখির গল্পগাথা’। অর্থমন্ত্রী তার সাহিত্যিক উপস্থাপনায় সেই ফিনিক্স পাখির জন্ম, বেড়ে ওঠা, শিক্ষাজীবন, পারিবারিক জীবন এবং রাজনৈতিক নানা ঝড়ঝঞ্ঝার চিত্র তুলে ধরেন।

অর্থমন্ত্রী তার মাল্টিমিডিয়া প্রেজেন্টেশনে বলেন, ‘১৯৪৭ সাল। সময়টা তখন শরৎকাল। রূপময় বাংলার প্রকৃতিতে আদিগন্ত সবুজের সমা’রোহ। শিউলিঝরা সকাল, ভোরের দূর্বাঘাসে মুক্তদানা শিশির, নদীতীরে-বনের প্রান্তে কাশফুলের সাদা এলোকেশের দোলা, আকাশের নরম নীল ছুঁয়ে ভাসা শুভ্র মেঘের দল, নৌকার পালে বিলাসী হাওয়া। ভেসে বেড়ানো মেঘের প্রান্ত ছুঁয়ে উড়ে চলা পাখপাখালির ঝাঁক, বাঁশবনে ডাহুকের ডা’কাডাকি, বিলঝিলের ডুবো ডুবো জলে জড়িয়ে থাকা শালুক পাতা, আঁধারের বুক চিরে জোনাকির রুপালি সেলাই, ঘোর লাগা চাঁদের আলো–সব মিলিয়ে প্রকৃতিতে এক অনিন্দ্য সৌন্দর্যের আড়ম্বর।’

“অ’পরদিকে বাংলার রাজনীতিতে তখন ভা’রতবর্ষের সদ্য অনাকাঙ্ক্ষিত বিভক্তির টানাপোড়েন। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তখন ছাত্রনেতা। কলকাতায় দেশভাগের সূত্র ধরে ভা’রতের সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা প্রশমনে ব্যস্ত। পাশাপাশি প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন কলকাতার পাট চুকিয়ে স্থায়ীভাবে ঢাকায় চলে আসার। ঠিক এমনই একটি ক্ষণে ২৮ সেপ্টেম্বর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও শেখ ফজিলাতুন নেছা মুজিবের ঘর আলোকিত করে জন্মগ্রহণ করেন তাদের প্রথম সন্তান শেখ হাসিনা। ছোটবেলায় সবার প্রিয় ‘হাসু’ নামেই পরিচিত ছিলেন।”

‘শেখ হাসিনার শৈশব কে’টেছে মধুমতীর শাখা বাইগার নদীবিধৌত গ্রামের গৃহস্থ পরিবারে। তিনি টুঙ্গিপাড়ায় বাল্যশিক্ষা গ্রহণ করেন। ১৯৫৪ সালে পরিবার ঢাকায় চলে আসে। শেখ হাসিনার বয়স তখন আট বছর। শেখ হাসিনা প্রথমে লক্ষ্মীবাজারের না’রীশিক্ষা মন্দিরে পড়ালেখা করলেও পরবর্তী সময়ে আজিমপুর গার্লস স্কুল থেকে মাধ্যমিক এবং ১৯৬৭ সালে গভর্নমেন্ট ইন্টারমিডিয়েট গার্লস কলেজ থেকে উচ্চ’মাধ্যমিক পাস করেন এবং ১৯৭৩ সালে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন।’

অর্থমন্ত্রী তার বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার রাজনৈতিক জীবন, দেশের জন্য তার অবদান এবং তার অর্জনের তথ্য সংসদে তুলে ধরেন।ভিডিও প্রেজেন্টেশনে তিনি বলেন, ‘বঙ্গবন্ধু হ’ত্যার পর বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ নানা ঘাত-প্রতিঘাতে, ঐক্য-অনৈক্যের মধ্যে ধুঁকে ধুঁকে টিকে থাকে। আওয়ামী লীগে ঐক্য ফিরিয়ে আনা এবং পুনর্গঠনের উদ্দেশ্যে ফেব্রুয়ারি ১৯৮১-এর কাউন্সিল অধিবেশনে শেখ হাসিনাকে দলীয় সভাপতি পদে মনোনীত করা হয়। মুক্তিযু’দ্ধে বিজয়ী দল আওয়ামী লীগের তখন বড় দুর্দিন। তাদের একজন নির্ভরযোগ্য কা’ন্ডারির প্রয়োজন। এ রকম পরিবেশে সাম’রিক সরকারের সমস্ত বাধা ছিন্ন করে জীবনের ঝুঁ’কি নিয়ে ১৯৮১ সালের ১৭ মে বিকেল ৪টায় বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা বাংলাদেশের মাটিতে পা রাখেন। সেদিন শুধু ঢাকার তেজগাঁও বিমানবন্দর নয়, ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধুর স্বদেশে প্রত্যাবর্তনের মতোই তার কন্যার স্বদেশ প্রত্যাবর্তনে সমগ্র ঢাকা নগরী জনসমুদ্রে পরিণত হয়েছিল। বিমানবন্দর থেকে একটি ট্রাকে করে জাতীয় নেতাদের সঙ্গে নিয়ে জনস্রোতের ঢেউ পেরিয়ে তিনি মানিক মিয়া অ্যাভিনিউয়ের জনসমুদ্রের মঞ্চে দাঁড়িয়ে অঝোরে কাঁদলেন, সেই সঙ্গে জনসমুদ্র হুহু করে কেঁদে উঠল ঠিক যেন বঙ্গোপসাগরের উত্তাল জলরাশি সৈকতে মা’থা ঠুকে আছড়ে পড়ছে। সেদিন আকাশ-বাতাস ভে’ঙে ১৫ আগস্টের জমানো কা’ন্নায় কেঁদে উঠেছিল প্রকৃতি।’

তিনি আরও বলেন, ‘শেখ হাসিনা দলকে সংগঠিত করার পাশাপাশি দেশে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্য আ’ন্দোলন ও সংগ্রাম চালিয়ে যান। বঙ্গবন্ধু বাংলার মানুষকে যেরূপ ভালোবাসতেন, দেশটাকে সোনার বাংলা হিসেবে গড়ে তোলার স্বপ্ন দেখতেন, সেরূপভাবে শেখ হাসিনাও এ দেশের মানুষকে ভালোবাসেন। তিনি ঘোষণা করেন: বাবা, মা, ভাইদের ও নিকটাত্মীয়দের হারিয়ে তিনি নিঃস্ব। তার কোনো চাওয়া-পাওয়া নেই। তার একমাত্র কা’মনা হচ্ছে দেশের সমৃদ্ধি ও উন্নয়ন। তিনি দেশের জনগণের কল্যাণে জীবন উৎসর্গ করতে চান। গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার লক্ষ্য নিয়ে তিনি আ’ন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়েন। ফলে তীব্র গণ-আ’ন্দোলনের মুখে ১৯৯০-এর ডিসেম্বরে স্বৈরাচারী শাসনের পতন ঘটে।’

২০০৯ থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার গতিশীল নেতৃত্বে অভাবনীয় এক স্বর্ণালি অধ্যায় বাংলাদেশ পার করছে উল্লেখ করে আরও বলা হয়, ‘বাংলাদেশ পরিণত হয়েছে শান্তি, প্রগতি আর সম্প্রীতির এক মিলনমেলায়। একের পর এক রচিত হচ্ছে উন্নয়নের সাফল্যগাথা।’প্রধানমন্ত্রীর অসীম সাহসী নেতৃত্ব, দেশপ্রে’ম, দেশের মানুষের প্রতি দায়বদ্ধতা ও দূরদর্শী অর্থনৈতিক দর্শনের কারণে বাংলাদেশ আজ বিশ্বের দরবারে সুমহান উচ্চতায় অধিষ্ঠিত উল্লেখ করেন অর্থমন্ত্রী।

তিনি বলেন, ‘একসময়ের বিশ্বের দরিদ্রতম দশটি দেশের অন্যতম বাংলাদেশ আজ বিশ্বের ৪১তম বৃহৎ অর্থনীতির দেশ। ব্রিটেনের অর্থনৈতিক গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর ইকোনমিক অ্যান্ড বিজনেস রিসার্চ (সিইবিআর)-এর মতে, অর্থনৈতিক বিকাশ অব্যাহত থাকলে ২০৩৫ সাল নাগাদ বিশ্বের ২৫তম বৃহৎ অর্থনীতির দেশে পরিণত হবে বাংলাদেশ। উন্নয়ন ও সমৃদ্ধির পথে আজ বিশ্বের বিস্ময় বাংলাদেশ। বিশ্ব নেতাদের মুখে শোনা যায় আজ বাংলাদেশের ভূয়সী প্রশংসা। সম্ভাবনার এ স্বর্ণদুয়ার উন্মোচনে আওয়ামী লীগ ও জননেত্রী শেখ হাসিনা হয়ে ওঠেন অ’তীতের ঐতিহ্য সুরক্ষা, বর্তমানের সফল পথচলা এবং ভবিষ্যতে সুখী-সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ার অকুতোভয় ও বিশ্বস্ত কা’ন্ডারি। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর সুযোগ্য কন্যা জননেত্রী শেখ হাসিনা এক ফিনিক্স পাখি। বাবা-মা, ভাইসহ আপন আত্মীয়দের হারিয়েধ্বং,সস্তূপ থেকে উঠে এসে তিনি তার জীবনকে উৎসর্গ করেছেন এই বাংলার আপাম’র মানুষের কল্যাণে। এ দেশকে জাতির পিতার স্বপ্নের সোনার বাংলাদেশে পরিণত করতে, প্রধানমন্ত্রী উন্নয়ন অ’ভিযাত্রায় একের পর এক লক্ষ্য অর্জনে যেন কবিগুরুর ভাষায় বলতে হয়, আলোর নৌকা ভাসিয়ে দিয়েছেন আকাশপানে চেয়ে। সবকিছুই সম্ভব হয়েছে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বাংলাদেশের হাল ধরেছেন বলে।’

শেখ হাসিনা আছেন বলেই বাংলাদেশ আজ শান্তি, সাম্য আর সম্প্রীতির দেশ। শেখ হাসিনা আছেন বলেই তলাবিহীন ঝুড়ির বাংলাদেশ আজ উন্নয়নশীল দেশ। শেখ হাসিনা আছেন বলেই বাংলাদেশ আজ হতে যাচ্ছে উন্নত এক দেশ।এ সময় দেশবাসীর পক্ষে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু ও প্রধানমন্ত্রীর প্রতি বিনম্র কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন অর্থমন্ত্রী।

Back to top button