জাতীয়

রাত পোহালেই মির্জা’পুর উপজে’লার ফতেপুর ইউনিয়নের গোবিন্দপুর ও বৈন্যাতলী গ্রামের ভোটাররা ঝুঁ’কি নিয়ে নৌকাযোগে প্রায় দেড় কিলোমিটার দূরে সুতানরি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে ভোট দেবেন। অবিশ্বা’স্য হলেও সত্য গত ৫০ বছর ধরে এই গ্রাম দুটির ভোটাররা শুধু ভোট দিয়েই যাচ্ছেন কিন্তু নাগরিক সুবিধা পাচ্ছেন না। গোবিন্দপুর ও বৈন্যাতলি গ্রাম দুটির অবস্থান উপজে’লার ফতেপুর ইউনিয়নের শেষ প্রান্তে। গ্রাম দুটির উত্তরে বাসাইল উপজে’লার কাঞ্চনপুর ইউনিয়নের মটেশ্বর ও সখিপুর উপজে’লার হাতিবান্দা গ্রাম।

সংখ্যালঘু অধ্যুষিত গ্রাম দুটিতে নেই কোনো প্রাথমিক বিদ্যালয়। কোমলমতি শি’শু-কি’শোরদের প্রাথমিক শিক্ষা গ্রহণের জন্য যেতে হয় পার্শ্ববর্তী তরফপুর ইউনিয়নের তরফপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। গ্রাম দুটির ৬০/৭০ জন শিক্ষার্থীকে প্রায় দুই কিলোমিটার দূরে জীবনের ঝুঁ’কি নিয়ে বংশাই নদী পার হয়ে তরফপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে গিয়ে লেখাপড়া করতে হচ্ছে। যাতায়াত ব্যবস্থা না থাকায় অনেক শিক্ষার্থী মাঝপথেই লেখাপড়া বন্ধ করে দেয় বলে গ্রামের লোকজন জানিয়েছেন।

গ্রামের লোকজন জানান, জাতীয় সংসদ, উপজে’লা পরিষদ এবং ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে আম’রা গত ৫০ বছর ধরে ভোট দিয়ে যাচ্ছি। কিন্তু নাগরিক সুবিধা বলতে যা বুঝায় তা আমাদের ভাগ্যে এখনো জোটেনি।অন্যদিকে হিন্দু অধ্যুষিত গ্রাম দুটিতে কেউ মা’রা গেলে বর্ষায় তাদের সৎকার করতে নানা সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়। কারণ বর্ষার সময় রাস্তা ও নিচু শ্মশান ঘাটটি পানিতে তলিয়ে যায়। বছরের প্রায় সাত মাস গ্রাম দুটির রাস্তা পানির নিচে থাকে। ৫ মাস রাস্তা শুকনো থাকলেও জমির আইল দিয়ে পায়ে হেঁটে চলাচল করতে হয়। রামপুর খেয়াঘাটে বংশাই নদীর ওপর এবং সুতানরি এলাকায় বারকাটি বিলে একটি সেতুসহ রাস্তা নির্মাণ হলে গ্রাম দুটির লোকজন ফতেপুর বাজার এবং রামপুর হয়ে বিভিন্ন গন্তব্যে চলাচল করতে পারবে।

ভৌগলিকভাবে নিচু এলাকা হওয়ায় জ্যৈষ্ঠ মাস থেকে অগ্রহায়ণ মাস পর্যন্ত গ্রাম দুটির শি’শু কি’শোরদের রাস্তার অভাবে পানি ভে’ঙে অথবা নৌকা ও ভেলাযোগে বিদ্যালয়ে যাতায়াত করে জীবনের ঝুঁ’কি নিয়ে।এ ছাড়া গ্রাম দুটিতে যাতায়াতের কোনো রাস্তা না থাকায় এলাকার কৃষকরা তাদের ফসলের নায্যমূল্যও পান না। ১৫ জুন ফতেপুর ইউনিয়নসহ এ উপজে’লার ৬টি ইউনিয়ন পরিষদের ভোট অনুষ্ঠিত হবে। বরাবরের মতো গ্রাম দুটির ভোটাররা তাদের পবিত্র দায়িত্ব পালনে ভোট দিতে কেন্দ্রে যাবেন বলে জানিয়েছেন।

গ্রাম দুটি সরেজমিন পরিদর্শনকালে গোবিন্দপুর গ্রামের ম’দন মন্ডল, নিরু মন্ডল, লালচান সরকার, বিজয় সরকার তাপস সরকার, বৈন্যাতলি গ্রামের হরিনাথ মন্ডল, সুবল মন্ডল, মহাদেব মন্ডল, যতিশ মন্ডল বলেন, আম’রা হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষ। স্বাধীনতার পর থেকে প্রতি নির্বাচনে আম’রা প্রার্থী দেখে নয়, নৌকা মা’র্কায় ভোট দেই। প্রতি নির্বাচনের আগে সবাই আসেন এবং নানা প্রতিশ্রুতি দেন। কিন্তু ভোট গেলে আর কারও দেখা মেলে না বলে তারা খেদোক্তি করেন।

গোবিন্দপুর গ্রামের উষা রানী মন্ডল, উজ্জল রানী মন্ডল, বৈন্যাতলি গ্রামের অর্চণা মন্ডল জানান, নৌকাযোগে ঝুঁ’কি নিয়ে কেন্দ্রে গিয়ে আম’রা আমাদের পবিত্র দায়িত্ব পালন করব। কিন্তু নির্বাচন শেষে বিজয়ী প্রার্থী আমাদের কথা মনে রাখবে না।

গোবিন্দপুর গ্রামের শুকলাল সরকার, স্বপ্না সরকার বৈন্যাতলী গ্রামের রবিন্দ্র মন্ডল, কৃষ্ণ মন্ডল ও পুষ্প মন্ডল বলেন, ফতেপুর ইউনিয়নের শুতানরী গ্রাম থেকে তাদের গ্রামের দূরত্ব প্রায় দেড় কিলোমিটার। এ ছাড়া রামপুর খেয়াঘাট থেকে প্রায় এক কিলোমিটার। গ্রামবাসীর যাতায়াতের জন্য সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান ম’রহু’ম হাসমত আলী রাস্তাটি নির্মাণ করেন। রাস্তাটি নিচু হওয়ায় বছরের প্রায় সাত মাস থাকে পানির নিচে। ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে তাদের নৌকায় করে দেড় কিলোমিটার শুতানরি ভোট কেন্দ্রে এবং জাতীয় নির্বাচনে প্রায় তিন কিলোমিটার ফতেপুর কেন্দ্রে গিয়ে ভোট দেন তারা। ভোটের সময় দুই গ্রামের ভোটাররা নিজেদের দায়িত্ব পালন করে থাকেন। কিন্তু নির্বাচনে জয়ী হবার পর কেউ তাদের খবর নিবে না বলে তারাও খেদোক্তি করেন।

বিজয় মন্ডল ও নিরু মন্ডল জানান, গ্রাম দুটির রাস্তা না থাকায় গোবিন্দপুর গ্রামের শি’ব মন্দিরটিও অবহেলায় পড়ে রয়েছে। শুধু তাই নয়, বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর আমলে দেশের আনাচে কানাচে উন্নয়নের ছোঁয়া লেগেছে। কিন্তু মির্জা’পুর উপজে’লার অবহেলিত এই গ্রাম দুটিতে উন্নয়নের ছোয়া লাগেনি বলে তারা জানান।

 

Back to top button