জাতীয়

বাবার হাত ধরে লা’শ কা’টা পেশায় ৩ ভাই

আলী, মোবারক ও চন্দন ছদ্মনামের এ তিন ব্যক্তি পরস্পর ভাই। তাদের বাবার নাম শংকর।১৮ থেকে ২০ বছর আগে তার মৃ’ত্যু হয়। পেশা ছিল লা’শ কা’টা। ময়নাত’দ’ন্তের জন্য আসা লা’শ কাটতেন তিনি। তার হাত ধরেই আলী, মোবারক ও চন্দন আসেন লা’শ কা’টা পেশায়।

শংকরের মৃ’ত্যুর পর ই’স’লা’ম ধ’র্মগ্রহণ করেন আলী ও মোবারক। চন্দন তার বাবার ধ’র্মেরই অনুসারী।আলী ও মোবারক বাবার ধ’র্ম ত্যাগ করলেও তার পেশা ত্যাগ করতে পারেননি। ছোট থেকে বাবার লা’শ কা’টা দেখতে দেখতে বড় হওয়া তিন ভাইও এখন লা’শ কাটেন। ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ (ঢামেক) ম’র্গে সরকারিভাবে নিয়োগপ্রাপ্ত চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী তারা। তিন ভাইয়ের মধ্যে আলীর চাকরির মেয়াদ প্রায় শেষ। মোবারক ও চন্দন এখনও ঢামেকে লা’শ কাটেন। থাকেন ম’র্গের পাশে কোয়ার্টারে।

জানা গেছে, শংকরের মৃ’ত্যুর পর তার বড় ছে’লে আলীর কাঁধে পড়ে লা’শ কা’টার দায়িত্ব। বছরের পর বছর ধরে ফরেনসিক চিকিৎসকদের উপস্থিতিতে পালা করে লা’শ কে’টে যাচ্ছেন তিন ভাই। তাদের ছোট আরেক ভাই আছেন। অবশ্য তিনি লা’শ কা’টার কাজ করেন না।

বৃহস্পতিবার (১৬ জুন) দুপুরে ঢাকা মেডিকেল ম’র্গে গিয়ে কথা হয় আলীর সঙ্গে। জানা যায় নানা তথ্য। তিনি জানান, বাবা ছাড়াও তার দাদা ও দুই চাচা রবি ও মিন্টু লা’শ কা’টার কাজ করতেন। অনেকটা বংশ পরম্পরায় তারা এই পেশায় এসেছেন। দাদা-বাবা-চাচারা কেউ বেঁচে নেই।

আলী বলেন, ছোটবেলা থেকেই লা’শ কা’টার কাজ শিখেছি বাবার কাছ থেকে। আম’রা এখন সরকারি চাকরি করি। আম’রা মানুষের সেবায় নিয়োজিত। সমাজের লোকজন আমাদের ডোম বলে ডাকে।

এই ডোম শব্দ নিয়ে মহা আক্ষেপ রয়েছে আলীর মনে। তিনি বলেন, আম’রা সরকারি কাগজ-কলমে ম’র্গ অ্যাসিস্ট্যান্ট হিসেবে পদপ্রাপ্ত। কিন্তু আমাদের ডোম বলে ডাকে। এই শব্দে সরকারি খাতায় কোনো পদ নেই। মানুষের মুখে মুখে শব্দটি ছড়িয়ে পড়েছে। সমাজের মানুষ আমাদের দেখে আড় চোখে তাকায়। কিন্তু আম’রা তো মানুষ, আমাদের পরিবার আছে। সন্তানরা লেখা পড়া করে, স্কুল-কলেজে যায়।

আলীর সন্তানরা বিয়ে করেছেন। তিনি এখন নানা-দাদা দুটোই। তার ছোট ভাই মোবারক-চন্দনের চেলে মে’য়েরা স্কুল-কলেজে লেখা পড়া করে।

লা’শ কা’টার কাজকে সমাজের কিছু শ্রেণি অসম্মান করলেও আলী, মোবারক, চন্দন কাজটিকে ভালোবেসে ফেলেছেন। কাজটিকে সম্মানও করেন তারা। পাশাপাশি দেশ ও সমাজের মানুষকেও ভালোবাসেন।

৪০ বছর ধরে লা’শ কে’টে আসছেন আলী। দেশের বড় বড় ট্র্যাজেডিতে নি’হ’ত মানুষের লা’শ কে’টেছেন তিনি। তালিকায় আছে তাজ’রিন, রানা প্লাজা, পুরান ঢাকায় আ’গু’নের ঘটনায় নি’হ’তদের লা’শ কা’টার অ’ভিজ্ঞতা। আর কয়েকদিন পর অবসরে যাবেন। তিনি বলেন, চাকরির মেয়াদ আছে আর কয়েকবছর। শেষ হলে ছোট ভাইদের হাতে দায়িত্ব বুঝিয়ে দিয়ে যাবো। এখন তারা আমা’র তত্ত্বাবধায়নে এ কাজ করে।

তিনি আরও জানান, বাংলাদেশের যত সরকারি হাসপাতা’লের ফরেনসিক বিভাগ আছে, প্রায় সবগুলোতেই সরকারিভাবে নিয়োগপ্রাপ্ত লা’শ কা’টার লোকজন রয়েছে। কিন্তু তারা কোনোদিন কোনো দাবি নিয়ে আ’ন্দোলন করেননি। আলী বলেন, কত মানুষের লা’শ মা’র্গে পাঠায় পু’লিশ। নি’হ’তদের আত্মীয়রা উদ্বিগ্ন থাকেন; কখন ময়নাত’দ’ন্ত শেষ হবে। কখন লা’শ নিয়ে ফিরবেন, কখন দাফন করবেন। কখনও কখনও তাদের আচার ব্যবহারে ক’ষ্ট পাই। কিন্তু আম’রা কখনও তাদের ক’ষ্ট দেই না। ময়নাত’দ’ন্ত দ্রুত শেষ করি, লা’শ নিয়ে তারা চলে যান।

পচা-গলা লা’শ ম’র্গে আসে, পোকা ধ’রা থাকে, প্রচণ্ড দুর্গন্ধ ছড়ায়। আমাদের কিন্তু কোনো সমস্যা হয় না। নিয়ম অনুযায়ী ফরেনসিক চিকিৎসকের উপস্থিতিতে এসব লা’শ কাটি। চিকিৎসকরা পরীক্ষা করেন। হতে পারে লা’শগুলো কারও বাবার, কারও মায়ের বা ভাই-বোন অথবা কাছের আত্মীয়ের। তারা কিন্তু পচা-গলা লা’শ নেন না। কারণ, শরিয়া অনুযায়ী আম’রা এসব ম’রদেহের গোসল করাই, কাফন পরিয়ে দিই। অথচ মানুষ আমাদের ডোম বলে যাকে। আমাদের গুরুত্ব দেয় না। ডোম বলতে কোনো পদ নেই, কোথা থেকে এসেছে তাও জানি না।

আক্ষেপ করে তিনি আরও বলেন, সন্তানদের স্কুলে নিয়ে যাওয়া সময় অথবা পরিবারের লোকদের নিয়ে ঘুরতে বের হলে বিভিন্ন লোকজনের সঙ্গে দেখা হয়। তারা অন্যদের দেখিয়ে বলে ‘ওই যে ডোম’। পথচারী, এলাকার মানুষ ডোম শব্দ শুনে আমাদের দিকে অন্য নজরে তাকায়। এতে আমাদের পরিবার, সদস্য সন্তানরা ক’ষ্ট পায়। আম’রা সরকারি চাকরি করি, নিজেদের দায়িত্ব পালন করি। আম’রাও মানুষ, মনে দুঃখ-ক’ষ্ট আছে। আম’রা এ সমাজের অংশ, আমাদের মানসম্মান আছে। আমাদের ডোম বলে ডাকবে না।

ঢামেকের ফরেনসিক বিভাগের প্রভাষক ডা. প্রদীপ বিশ্বা’স বলেন, সরকারি নথিতে ডোম বলে কোনো পদ নেই। যারা ম’র্গে কাজ করেন তারা ম’র্গ সহকারী হিসেবে পদপ্রাপ্ত। সরকারি নথিতে লেখা আছে ম’র্গ অ্যাসিস্ট্যান্ট।

আলী, মোবারক ও চন্দনের ব্যাপারে তিনি বলেন, তাদের তিন ভাইয়ের মধ্যে আলী সরাসরি ঢামেক ম’র্গে নিয়োগপ্রাপ্ত। বাকি দুজনের মধ্যে একজন এনাটমি, অন্যজন ম’র্গ অফিসে নিয়োগপ্রাপ্ত। তিন ভাই-ই সরকারিভাবে নিয়োগ পেয়েছেন। লোকবল কম থাকায় তিনজনই লা’শ কা’টার কাজ করেন।

Back to top button