{{ news.section.title }}
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর সবচেয়ে রক্তক্ষয়ী বছর ২০২৫
বিশ্বব্যাপী যুদ্ধ, রাজনৈতিক সহিংসতা ও আন্তঃরাষ্ট্রীয় সংঘাত উদ্বেগজনকভাবে বেড়ে যাওয়ায় ২০২৫ সালকে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী সবচেয়ে সংঘাতপূর্ণ বছরগুলোর একটি হিসেবে চিহ্নিত করেছে নরওয়েভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান পিস রিসার্চ ইনস্টিটিউট অসলো (PRIO)। সংস্থাটির সর্বশেষ ‘কনফ্লিক্ট ট্রেন্ডস’ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত বছর বিশ্বজুড়ে সংঘাত ও সহিংসতায় প্রায় ২ লাখ ৪৫ হাজার মানুষ নিহত হয়েছেন, যা শীতল যুদ্ধ-পরবর্তী সময়ের তৃতীয় সর্বোচ্চ প্রাণহানির ঘটনা।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫ সালে অন্তত ৬৫টি সক্রিয় রাষ্ট্র-সংশ্লিষ্ট সংঘাত ৩৫টি দেশে চলমান ছিল। এটি ১৯৪৬ সালের পর থেকে সর্বোচ্চ সংখ্যক সক্রিয় সংঘাতের রেকর্ড। একই সময়ে আন্তঃরাষ্ট্রীয় সংঘাতের সংখ্যাও উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে, যা বৈশ্বিক নিরাপত্তা ব্যবস্থার জন্য নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে।
পিআরআইওর গবেষক সিরি আস রুস্তাদ বলেন, গত পাঁচ থেকে ছয় বছরে একের পর এক বড় যুদ্ধ শুরু হয়েছে এবং কোনো সংঘাত শেষ হওয়ার আগেই আরেকটি সংঘাত নতুন করে ছড়িয়ে পড়ছে। ফলে বিশ্ব কার্যত সংঘাতমুক্ত কোনো সময় পাচ্ছে না। উচ্চমাত্রার সহিংসতা এখন বৈশ্বিক বাস্তবতায় পরিণত হয়েছে।
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, ইউক্রেনে রাশিয়ার যুদ্ধ, সুদানের গৃহযুদ্ধ, গাজায় চলমান যুদ্ধ, ভারত-পাকিস্তান সীমান্ত উত্তেজনা, আফগানিস্তান-পাকিস্তান সংঘাত, কম্বোডিয়া-থাইল্যান্ড সীমান্ত বিরোধ এবং সিরিয়ায় ইসরায়েলের সামরিক অভিযান ২০২৫ সালের প্রধান সংঘাতগুলোর মধ্যে ছিল।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো বেসামরিক নাগরিকদের প্রাণহানি। গত বছর প্রায় ৭৬ হাজার ৫০০ বেসামরিক মানুষ সরাসরি হামলার লক্ষ্যবস্তু হয়ে নিহত হয়েছেন, যেখানে ২০২৪ সালে এ সংখ্যা ছিল মাত্র ১৪ হাজার ২০০। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে বেসামরিক মৃত্যুর হার কয়েক গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই ভয়াবহ বৃদ্ধির অন্যতম কারণ সুদানের সংঘাত। দেশটির দারফুর অঞ্চলের এল-ফাশের শহরে অবরোধ, গণহত্যা ও ব্যাপক সহিংসতার ঘটনায় প্রায় ৬০ হাজার মানুষের মৃত্যু হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। সংঘাতটি বর্তমানে আফ্রিকার অন্যতম বড় মানবিক সংকটে পরিণত হয়েছে।
পিআরআইওর তথ্য বলছে, ১৯৯৪ সালের রুয়ান্ডা গণহত্যা এবং ২০২১ সালের ইথিওপিয়ার টিগ্রে যুদ্ধের পর ২০২৫ সালই সবচেয়ে প্রাণঘাতী বছরগুলোর একটি। গবেষকরা সতর্ক করে বলেছেন, সাম্প্রতিক চার থেকে পাঁচ বছরে সংঘাতে নিহত মানুষের সংখ্যা আগের দুই দশকের সম্মিলিত অনেক সময়ের তুলনায়ও বেশি।
অঞ্চলভিত্তিক পরিসংখ্যানে আফ্রিকায় সবচেয়ে বেশি সংঘাত নথিভুক্ত হয়েছে। মহাদেশটিতে ২৯টি সংঘাত সক্রিয় ছিল। এরপর রয়েছে এশিয়া, মধ্যপ্রাচ্য, আমেরিকা এবং ইউরোপ। বিশেষজ্ঞদের মতে, আফ্রিকার বিভিন্ন দেশে রাষ্ট্রীয় দুর্বলতা, সশস্ত্র গোষ্ঠীর বিস্তার এবং দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক অস্থিরতা সংঘাত বৃদ্ধির বড় কারণ।
গবেষণায় আরও বলা হয়েছে, বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে একযোগে বড় যুদ্ধ চলতে থাকায় শান্তি প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টা ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠছে। আন্তর্জাতিক সহযোগিতা দুর্বল হওয়া, জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন এবং বিশ্ব রাজনীতিতে বাড়তে থাকা মেরুকরণ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে।
প্রতিবেদনটি উপসালা কনফ্লিক্ট ডেটা প্রোগ্রাম (UCDP)-এর তথ্যের ভিত্তিতে তৈরি করা হয়েছে। এতে সহিংসতাকে তিনটি ভাগে বিভক্ত করা হয়েছে-রাষ্ট্র-সংশ্লিষ্ট সংঘাত, অ-রাষ্ট্রীয় সশস্ত্র গোষ্ঠীর মধ্যে সংঘাত এবং বেসামরিক মানুষের বিরুদ্ধে একতরফা সহিংসতা।
বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান প্রবণতা অব্যাহত থাকলে ২০২৬ সালেও ইউক্রেন, সুদান, গাজা, মধ্যপ্রাচ্য এবং দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন অঞ্চলে সংঘাত অব্যাহত থাকার ঝুঁকি রয়েছে, যা বৈশ্বিক স্থিতিশীলতার জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতে পারে।