হরমুজ প্রণালীতে সেনা পাঠাতে জাপানের তিন শর্ত

হরমুজ প্রণালীতে সেনা পাঠাতে জাপানের তিন শর্ত
ছবির ক্যাপশান, ছবি: সংগৃহীত

মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতা এবং হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে বৈশ্বিক উত্তেজনার মধ্যে জাপান স্পষ্ট করে দিয়েছে যে, পারস্য উপসাগরের গুরুত্বপূর্ণ এই নৌপথে নিজেদের সেলফ-ডিফেন্স ফোর্সেস (এসডিএফ) মোতায়েনের আগে তিনটি গুরুত্বপূর্ণ শর্ত পূরণ হতে হবে। জাপানের সরকারি সূত্রের বরাতে কিয়োদো নিউজ জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে কার্যকর যুদ্ধবিরতি, তেহরানের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগের নিশ্চয়তা এবং হরমুজ প্রণালিতে নিরাপত্তা ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসা ছাড়া টোকিও কোনো সামরিক পদক্ষেপ বিবেচনা করবে না।

জাপানি সূত্রগুলোর মতে, এই শর্তগুলো পূরণ হলে এসডিএফ মূলত পরিত্যক্ত নৌ-মাইন অপসারণ, বাণিজ্যিক জাহাজের নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ এবং আন্তর্জাতিক নৌপরিবহন সচল রাখতে সহায়ক ভূমিকা পালন করবে। সরাসরি যুদ্ধ বা আক্রমণাত্মক সামরিক অভিযানে অংশ নেওয়ার কোনো পরিকল্পনা নেই।

 

বিষয়টি শুধু নিরাপত্তার নয়, বরং জাপানের অর্থনীতি ও জ্বালানি নিরাপত্তার সঙ্গেও সরাসরি জড়িত। বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ জ্বালানি আমদানিকারক দেশ জাপান তার তেলের প্রায় ৯০ শতাংশ মধ্যপ্রাচ্য থেকে সংগ্রহ করে এবং এর বড় অংশই হরমুজ প্রণালি দিয়ে পরিবাহিত হয়। ফলে প্রণালিটি বন্ধ হয়ে গেলে বা ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠলে জাপানের জ্বালানি সরবরাহ, শিল্প উৎপাদন এবং অর্থনীতির ওপর সরাসরি প্রভাব পড়ে।

 

মার্চ মাসে ইরান-সংকট ঘিরে হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হওয়ার পর জাপান জরুরি তেল মজুত থেকে তেল ছাড়তে বাধ্য হয়। পরে পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হওয়ায় আরও প্রায় ২০ দিনের সমপরিমাণ তেল বাজারে ছাড়ার বিষয়ও বিবেচনা করে টোকিও। রয়টার্সের তথ্য অনুযায়ী, জাপানের কাছে বর্তমানে প্রায় ২৩০ দিনের সমপরিমাণ কৌশলগত তেল মজুত রয়েছে।

 

জাপানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী তোশিমিৎসু মোতেগি আগেই ইঙ্গিত দিয়েছিলেন, যদি যুদ্ধবিরতি প্রতিষ্ঠিত হয় এবং হরমুজে নৌ-মাইন ছড়িয়ে থাকার ঝুঁকি দেখা দেয়, তাহলে জাপান মাইন অপসারণ অভিযানে অংশ নেওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করতে পারে। তবে সেটি সম্পূর্ণরূপে পরিস্থিতিনির্ভর এবং জাপানের আইনগত সীমাবদ্ধতার মধ্যে হতে হবে।

 

জাপানের সংবিধান দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে দেশটির সামরিক কর্মকাণ্ডের ওপর কঠোর সীমাবদ্ধতা আরোপ করেছে। ফলে বিদেশে সেনা মোতায়েনের ক্ষেত্রে টোকিওকে রাজনৈতিক, সাংবিধানিক এবং কূটনৈতিক সব দিক বিবেচনা করতে হয়। যদিও ২০১৫ সালের নিরাপত্তা আইন কিছু ক্ষেত্রে বিদেশে সীমিত সামরিক ভূমিকার সুযোগ তৈরি করেছে, তবুও সরাসরি সংঘাতে জড়ানো এখনো অত্যন্ত স্পর্শকাতর বিষয়।

 

এদিকে যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘদিন ধরেই মিত্র দেশগুলোকে হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আরও সক্রিয় ভূমিকা নেওয়ার আহ্বান জানিয়ে আসছে। ওয়াশিংটন চায়, জাপানসহ প্রধান মিত্ররা আন্তর্জাতিক নৌ-অভিযানে অংশ নিয়ে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি করিডোরকে সচল রাখতে সহায়তা করুক। তবে টোকিও এখন পর্যন্ত সতর্ক অবস্থান বজায় রেখেছে।

 

বিশ্লেষকদের মতে, জাপানের ঘোষিত তিন শর্ত আসলে একটি ভারসাম্যপূর্ণ কৌশল। একদিকে তারা যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র হিসেবে দায়িত্বশীল ভূমিকা রাখতে চায়, অন্যদিকে ইরানের সঙ্গে দীর্ঘদিনের কূটনৈতিক সম্পর্কও বজায় রাখতে আগ্রহী। বিশেষ করে প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচি এবং ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানের মধ্যে একাধিকবার টেলিফোনে আলোচনা হওয়ার বিষয়টি টোকিওর মধ্যস্থতামূলক অবস্থানের ইঙ্গিত দেয়।

 

বর্তমানে হরমুজ প্রণালি দিয়ে বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ তেল পরিবাহিত হয়। ফলে এই নৌপথে যেকোনো সামরিক উত্তেজনা শুধু মধ্যপ্রাচ্য নয়, বিশ্ব অর্থনীতি, জ্বালানি বাজার এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের ওপরও ব্যাপক প্রভাব ফেলতে পারে। সেই কারণেই জাপান সামরিক পদক্ষেপের আগে যুদ্ধবিরতি, কূটনৈতিক যোগাযোগ এবং ঝুঁকি হ্রাস-এই তিনটি বিষয়কে অপরিহার্য শর্ত হিসেবে বিবেচনা করছে।


সম্পর্কিত নিউজ