{{ news.section.title }}
জাপানের পর এবার নেপালেও নিষিদ্ধ ভারতের আম
বিশ্ববাজারে ব্যাপক জনপ্রিয়তা থাকা সত্ত্বেও ভারতীয় আমের গুণগত মান ও খাদ্য নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। সম্প্রতি নেপালের সীমান্তবর্তী কয়েকটি পরীক্ষাকেন্দ্রে ভারত থেকে আমদানি করা কিছু আমের চালানে অনুমোদিত মাত্রার চেয়ে বেশি কীটনাশকের অবশিষ্টাংশ শনাক্ত হওয়ার পর বিষয়টি নিয়ে কড়াকড়ি আরোপ করেছে দেশটির কর্তৃপক্ষ।
ভারতের একাধিক সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এপ্রিল ও মে মাসে পরিচালিত পরীক্ষায় কিছু আমের চালানে অতিরিক্ত রাসায়নিক উপাদানের উপস্থিতি ধরা পড়ে। এর পর সীমান্তে খাদ্য নিরাপত্তা পরীক্ষা জোরদার করা হয়েছে এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে কঠোর নজরদারির নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
নেপালের কৃষি ও প্রাণিসম্পদ উন্নয়ন মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ভোক্তাদের স্বাস্থ্য সুরক্ষা নিশ্চিত করাই সরকারের প্রধান লক্ষ্য। খাদ্য নিরাপত্তা ও মান নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে কোনো ধরনের ছাড় দেওয়া হবে না। মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের মতে, দেশের বাজারে প্রবেশের আগে আমদানিকৃত কৃষিপণ্যের গুণগত মান নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি।
গ্রীষ্ম মৌসুমে নেপালে আমের চাহিদা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পায়। স্থানীয় উৎপাদন থাকলেও তা চাহিদা পূরণের জন্য যথেষ্ট নয়। ফলে দীর্ঘদিন ধরেই দেশটির বাজার ভারতীয় আমের ওপর নির্ভরশীল। সীমান্তে অতিরিক্ত কড়াকড়ির ফলে বাজারে সরবরাহ ও মূল্য পরিস্থিতির ওপরও প্রভাব পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন ব্যবসায়ীরা।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আন্তর্জাতিক বাজারে খাদ্য নিরাপত্তা সংক্রান্ত বিধিনিষেধ অনেক কঠোর হয়েছে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন, জাপান, অস্ট্রেলিয়া এবং মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশ এখন আমদানিকৃত কৃষিপণ্যে কীটনাশকের অবশিষ্টাংশ, সংরক্ষণ পদ্ধতি এবং স্বাস্থ্যবিধি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে পর্যবেক্ষণ করছে। ফলে সামান্য অনিয়মও রপ্তানিকারকদের জন্য বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির কারণ হতে পারে।
ভারত বিশ্বের বৃহত্তম আম উৎপাদনকারী দেশগুলোর একটি। বিশ্বে উৎপাদিত মোট আমের প্রায় ৪০ শতাংশেরও বেশি আসে ভারত থেকে। দেশটি প্রতিবছর শতাধিক দেশে আম রপ্তানি করে থাকে। বিশেষ করে আলফানসো, কেশর, ল্যাংড়া, দশেহরি, চৌসা এবং বঙ্গনপল্লী জাতের আম আন্তর্জাতিক বাজারে ব্যাপক জনপ্রিয়।
তবে আন্তর্জাতিক বাজারে অবস্থান ধরে রাখতে এখন মান নিয়ন্ত্রণই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। কৃষি ও রপ্তানি বিশ্লেষকদের মতে, বিশ্ববাজারে প্রতিযোগিতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে আমদানিকারক দেশগুলো খাদ্য নিরাপত্তা পরীক্ষায় আরও কঠোর হচ্ছে। ফলে উৎপাদন থেকে সরবরাহ পর্যন্ত পুরো শৃঙ্খলে আন্তর্জাতিক মান বজায় রাখা ছাড়া বিকল্প নেই।
এদিকে এর আগেও বিভিন্ন সময়ে ভারতীয় কৃষিপণ্যের মান নিয়ে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রশ্ন উঠেছে। খাদ্যে কীটনাশকের অবশিষ্টাংশ, উদ্ভিদ স্বাস্থ্যবিধি (ফাইটোস্যানিটারি) এবং সংরক্ষণ পদ্ধতি নিয়ে একাধিক দেশ সতর্ক অবস্থান নিয়েছে। ফলে সাম্প্রতিক এই ঘটনা ভারতীয় ফল রপ্তানি খাতের জন্য নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
ভারতের ফল রপ্তানিকারক সংগঠনগুলোর আশঙ্কা, বিভিন্ন দেশে যদি খাদ্য নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়তে থাকে, তাহলে ভারতীয় আমের রপ্তানি আয় ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। তারা উৎপাদকদের আন্তর্জাতিক মানদণ্ড মেনে কীটনাশক ব্যবহার এবং ফসল সংগ্রহের আগে নির্ধারিত নিরাপত্তা সময়সীমা অনুসরণের আহ্বান জানিয়েছেন।
কৃষি বিশ্লেষকদের মতে, বিষয়টি শুধু ভারতের জন্য নয়, দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য কৃষিপণ্য রপ্তানিকারক দেশের জন্যও একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবার্তা। আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশ ও অবস্থান ধরে রাখতে হলে উৎপাদন পর্যায় থেকে রপ্তানি পর্যন্ত পুরো সরবরাহ ব্যবস্থায় মান নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করতে হবে। অন্যথায় বৈশ্বিক বাজারে প্রতিযোগিতা করা কঠিন হয়ে পড়বে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) এবং জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (FAO) দীর্ঘদিন ধরে খাদ্যে কীটনাশকের অবশিষ্টাংশ নিয়ন্ত্রণে জোর দিয়ে আসছে। বর্তমানে অধিকাংশ উন্নত দেশ আমদানিকৃত ফল ও কৃষিপণ্যের ক্ষেত্রে নির্ধারিত ‘ম্যাক্সিমাম রেসিডিউ লিমিট’ (MRL) কঠোরভাবে অনুসরণ করে। নির্ধারিত মাত্রা অতিক্রম করলে চালান ফেরত পাঠানো, ধ্বংস করা বা সাময়িক নিষেধাজ্ঞার মতো পদক্ষেপ নেওয়া হয়।
সংশ্লিষ্টদের মতে, বিশ্ববাজারে ভারতীয় আমের চাহিদা এখনও শক্তিশালী থাকলেও খাদ্য নিরাপত্তা ও গুণগত মানের বিষয়টি এখন রপ্তানিকারকদের জন্য সবচেয়ে বড় পরীক্ষা হয়ে দাঁড়িয়েছে। আগামী দিনগুলোতে এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে না পারলে গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক বাজারগুলোতে ভারতীয় আমের অবস্থান চাপে পড়তে পারে।