{{ news.section.title }}
ফ্রান্সে প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা পেলেন ইসরায়েলি মন্ত্রী বেন-গভির
গাজামুখী ত্রাণবহরের কর্মীদের সঙ্গে আচরণ নিয়ে আন্তর্জাতিক ক্ষোভের মুখে ইসরায়েলের কট্টর ডানপন্থী জাতীয় নিরাপত্তামন্ত্রী ইতামার বেন-গভিরকে ফরাসি ভূখণ্ডে প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে ফ্রান্স। শনিবার ফ্রান্সের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জ্যঁ-নোয়েল বারো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে এ সিদ্ধান্তের কথা জানান। তিনি বলেন, “আজ থেকে ইতামার বেন-গভির ফরাসি ভূখণ্ডে প্রবেশ করতে পারবেন না।”
ফরাসি পররাষ্ট্রমন্ত্রী আরও জানিয়েছেন, ইতালির পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে যৌথভাবে তিনি ইউরোপীয় ইউনিয়নের কাছেও বেন-গভিরের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা আরোপের অনুরোধ জানাচ্ছেন। প্যারিসের ভাষ্য, গাজায় মানবিক সহায়তা পৌঁছে দিতে যাওয়া ইউরোপীয় ও ফরাসি নাগরিকসহ আন্তর্জাতিক কর্মীদের প্রতি বেন-গভিরের আচরণ “অগ্রহণযোগ্য” ও “নিন্দনীয়”।
যে ভিডিও ঘিরে ক্ষোভ
বিতর্কের শুরু হয় বেন-গভিরের পোস্ট করা একটি ভিডিও ঘিরে। ওই ভিডিওতে দেখা যায়, গাজায় মানবিক সহায়তা নিয়ে যেতে চাওয়া ফ্লোটিলার আটক কর্মীদের মাটিতে বসানো বা আটকে রাখা হয়েছে, আর বেন-গভির তাদের সামনে দাঁড়িয়ে বিদ্রূপাত্মক ভঙ্গিতে কথা বলছেন। অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ভিডিওতে বেন-গভিরকে বাঁধা অবস্থায় থাকা আটক কর্মীদের সামনে ইসরায়েলি পতাকা নাড়াতে এবং তাদের উদ্দেশে কটূক্তি করতে দেখা যায়। এই ভিডিও প্রকাশের পর শুধু ফ্রান্স নয়, পশ্চিমা একাধিক সরকারও ক্ষোভ প্রকাশ করে। আটক কর্মীদের কয়েকজন পরে দাবি করেন, ইসরায়েলি হেফাজতে তারা শারীরিক নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। তবে ইসরায়েলের কারা কর্তৃপক্ষ এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছে।
নেতানিয়াহু ও যুক্তরাষ্ট্রেরও সমালোচনা
ঘটনাটি এতটাই বিতর্ক তৈরি করে যে, ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুও বেন-গভিরের আচরণের সমালোচনা করেন। নেতানিয়াহু বলেন, ফ্লোটিলা ঠেকানোর অধিকার ইসরায়েলের আছে, তবে আটক কর্মীদের সঙ্গে বেন-গভিরের আচরণ “ইসরায়েলের মূল্যবোধ ও নিয়মের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।”
ইসরায়েলের ঘনিষ্ঠ মিত্র যুক্তরাষ্ট্রও বেন-গভিরের আচরণ নিয়ে আপত্তি জানায়। ইসরায়েলের পররাষ্ট্রমন্ত্রী গিদিওন সারও ভিডিওটির সমালোচনা করে বলেন, এ ধরনের আচরণ আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ইসরায়েলের ভাবমূর্তিকে ক্ষতিগ্রস্ত করে।
ফ্লোটিলা আটক হয়েছিল আন্তর্জাতিক জলসীমায়
গাজায় মানবিক সহায়তা পৌঁছে দেওয়ার উদ্দেশ্যে যাত্রা করা গ্লোবাল সুমুদ ফ্লোটিলার নৌযানগুলো চলতি সপ্তাহে পূর্ব ভূমধ্যসাগরে ইসরায়েলি নৌবাহিনীর হাতে আটক হয়। আয়োজকদের দাবি, বহরে থাকা ৫০টি নৌযানই আটক করা হয়েছে এবং ৪০টির বেশি দেশের শত শত কর্মীকে ইসরায়েলি বাহিনী আটক করে। ইসরায়েল বলেছে, তাদের নৌ অবরোধ “আইনসম্মত” এবং গাজার দিকে কোনো নৌযান যেতে দেওয়া হবে না।
আটক কর্মীদের পরে ইসরায়েল থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে বলে জানানো হয়েছে। ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষ বলেছে, কর্মীদের কনস্যুলার প্রতিনিধিদের সঙ্গে দেখা করার সুযোগ দেওয়া হয়েছে। তবে ফ্লোটিলা আয়োজক, মানবাধিকার কর্মী ও কয়েকটি দেশের সরকার আটক প্রক্রিয়া এবং বন্দিদের সঙ্গে আচরণ নিয়ে আপত্তি জানিয়েছে।
ইতালিও ইইউ নিষেধাজ্ঞা চাইছে
ফ্রান্সের আগে ইতালিও বেন-গভিরের বিরুদ্ধে ইউরোপীয় ইউনিয়ন পর্যায়ে নিষেধাজ্ঞার দাবি তোলে। ইতালির পররাষ্ট্রমন্ত্রী আন্তোনিও তাজানি বলেন, এ ঘটনায় “একটি লাল রেখা অতিক্রম করা হয়েছে।” তিনি ইইউ পররাষ্ট্রনীতি প্রধান কাজা কালাসের কাছে পরবর্তী ইইউ পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের বৈঠকে বেন-গভিরের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা আলোচনায় আনার অনুরোধ জানিয়েছেন।
ফ্রান্স ও ইতালির এই অবস্থান দেখাচ্ছে, গাজা যুদ্ধ ও অবরোধ ইস্যুতে ইসরায়েলের ঘনিষ্ঠ পশ্চিমা অংশীদারদের মধ্যেও অসন্তোষ বাড়ছে। বিশেষ করে আটক কর্মীদের মধ্যে ইউরোপীয় নাগরিক থাকায় বিষয়টি এখন শুধু গাজা বা ইসরায়েল-ফিলিস্তিন সংঘাতের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; এটি ইউরোপীয় নাগরিক সুরক্ষা ও আন্তর্জাতিক আইনের প্রশ্নেও রূপ নিচ্ছে।
পোল্যান্ডেরও নিষেধাজ্ঞা
অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস জানিয়েছে, ফ্রান্সের পাশাপাশি পোল্যান্ডও বেন-গভিরের ওপর পাঁচ বছরের প্রবেশ নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে। পোলিশ কর্মকর্তারা বলেছেন, আটক কর্মীদের সঙ্গে তার আচরণ গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। এই পদক্ষেপগুলো ইঙ্গিত দিচ্ছে, বেন-গভিরের বিরুদ্ধে ইউরোপের বিভিন্ন রাজধানীতে রাজনৈতিক চাপ বাড়ছে। ইইউ পর্যায়ে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হলে তা হবে ইসরায়েলের একজন দায়িত্বশীল মন্ত্রীর বিরুদ্ধে ইউরোপীয় কূটনৈতিক ব্যবস্থার বিরল উদাহরণ।
বেন-গভির কে এবং কেন তিনি বিতর্কিত
ইতামার বেন-গভির ইসরায়েলের জাতীয় নিরাপত্তামন্ত্রী এবং দেশটির কট্টর ডানপন্থী রাজনীতির অন্যতম আলোচিত মুখ। তিনি দীর্ঘদিন ধরে ফিলিস্তিনি বন্দি, গাজা, পশ্চিম তীর এবং ইসরায়েলের নিরাপত্তা নীতি নিয়ে কঠোর অবস্থানের জন্য পরিচিত। দ্য গার্ডিয়ানের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বেন-গভির ইসরায়েলি কারাগারকে আরও কঠোর ও শাস্তিমূলক জায়গায় পরিণত করার নীতি নিয়ে প্রকাশ্যে গর্ব করেছেন, যা মানবাধিকার সংগঠনগুলোর উদ্বেগের কারণ হয়েছে।
সমালোচকদের মতে, ফ্লোটিলা কর্মীদের সামনে তার ভিডিওটি শুধু একটি আলাদা ঘটনা নয়; বরং বন্দিদের প্রতি অপমানজনক আচরণকে রাজনৈতিক বার্তা হিসেবে ব্যবহার করার একটি উদাহরণ। তবে ইসরায়েলি কারা কর্তৃপক্ষ আটক কর্মীদের নির্যাতনের অভিযোগ অস্বীকার করেছে এবং বেন-গভিরের কার্যালয় ফ্রান্সের নিষেধাজ্ঞা নিয়ে তাৎক্ষণিক কোনো মন্তব্য করেনি।
গাজার মানবিক সংকট ও ফ্লোটিলা রাজনীতি
গাজায় দীর্ঘদিনের অবরোধ, যুদ্ধ এবং খাদ্য-ওষুধ সংকটের প্রেক্ষাপটে আন্তর্জাতিক কর্মীরা বারবার সমুদ্রপথে মানবিক সহায়তা পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা করেছেন। ইসরায়েল এসব উদ্যোগকে নিরাপত্তা ঝুঁকি এবং অবরোধ ভাঙার প্রচেষ্টা হিসেবে দেখে। অন্যদিকে ফ্লোটিলা আয়োজকরা বলছেন, তাদের উদ্দেশ্য গাজার বেসামরিক মানুষের কাছে সহায়তা পৌঁছানো এবং অবরোধের মানবিক প্রভাব বিশ্ববাসীর সামনে তুলে ধরা।
গাজামুখী ফ্লোটিলা নিয়ে বিতর্ক নতুন নয়। ২০১০ সাল থেকেই বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ফ্লোটিলা গাজার নৌ অবরোধ ভাঙার চেষ্টা করে আসছে। এসব উদ্যোগ বহুবার ইসরায়েলি বাহিনীর হাতে আটক হয়েছে এবং প্রতিবারই আন্তর্জাতিক আইনের প্রশ্ন, মানবিক সহায়তার অধিকার ও ইসরায়েলের নিরাপত্তা যুক্তি নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়েছে।
আন্তর্জাতিক চাপ বাড়ছে
ফ্লোটিলা আটক ও বেন-গভিরের ভিডিও প্রকাশের পর যুক্তরাজ্য, ইতালি, কানাডা, তুরস্ক ও গ্রিসসহ কয়েকটি দেশ ইসরায়েলের কাছে ব্যাখ্যা চেয়েছে বা নিন্দা জানিয়েছে বলে অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস জানিয়েছে। কয়েকটি দেশ ইসরায়েলি রাষ্ট্রদূতদের তলব করেছে।
দক্ষিণ আফ্রিকা, আয়ারল্যান্ড ও চিলির কর্মীরাও দেশে ফিরে ইসরায়েলি হেফাজতে দুর্ব্যবহারের অভিযোগ করেছেন। দক্ষিণ আফ্রিকার কয়েকজন কর্মী দাবি করেছেন, তাদের বিদ্যুৎ শক দেওয়া হয়েছে, পানি ও খাবার থেকে বঞ্চিত করা হয়েছে এবং অপমানজনক পরিবেশে রাখা হয়েছে। ইসরায়েল এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছে।
ফ্রান্সের নিষেধাজ্ঞা তাৎক্ষণিকভাবে বেন-গভিরের ওপর কূটনৈতিক চাপ বাড়ালেও সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো- ইউরোপীয় ইউনিয়ন যৌথভাবে কোনো ব্যবস্থা নেয় কি না। ইইউ সদস্য দেশগুলোর মধ্যে ইসরায়েল নীতিতে মতভেদ আছে। ফলে বেন-গভিরের বিরুদ্ধে যৌথ নিষেধাজ্ঞা আনতে হলে রাজনৈতিক ঐকমত্য দরকার হবে।
তবে ফ্রান্স, ইতালি ও পোল্যান্ডের পদক্ষেপ ইঙ্গিত দিচ্ছে, গাজা ইস্যুতে ইউরোপীয় সহনশীলতা দ্রুত কমছে। বিশেষ করে বিদেশি মানবিক কর্মীদের সঙ্গে আচরণ, আটক প্রক্রিয়া এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একজন মন্ত্রীর প্রকাশ্য বিদ্রূপ- এসব বিষয় ইসরায়েলের মিত্র দেশগুলোর কাছেও অস্বস্তিকর হয়ে উঠেছে।
তথ্যসূত্র: রয়টার্স