ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোনের বড় হামলায় কাঁপল কিয়েভ, নিহত অন্তত ১

ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোনের বড় হামলায় কাঁপল কিয়েভ, নিহত অন্তত ১
ছবির ক্যাপশান, ছবি : রয়টার্স

রাশিয়ার ব্যাপক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলায় রোববার ভোররাতে কেঁপে উঠেছে ইউক্রেনের রাজধানী কিয়েভ। হামলায় আবাসিক ভবন, অফিস, দোকান, স্কুল এবং একটি মেট্রো স্টেশনের অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ইউক্রেনীয় কর্মকর্তাদের প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, হামলায় অন্তত একজন নিহত এবং ২১ জন আহত হয়েছেন। আহতদের মধ্যে ১৩ জনকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে, তাদের মধ্যে তিনজনের অবস্থা গুরুতর।

রাত ১টার কিছু পর কিয়েভজুড়ে একের পর এক বিস্ফোরণের শব্দ শোনা যায়। এর আগেই ইউক্রেনের বিমানবাহিনী টেলিগ্রামে সতর্ক করে জানিয়েছিল, রাশিয়া হয়তো হাইপারসনিক ‘ওরেশনিক’ ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করতে পারে। তবে এই হামলায় ওরেশনিক ক্ষেপণাস্ত্র সত্যিই ব্যবহার করা হয়েছে কি না, তা তাৎক্ষণিকভাবে নিশ্চিত করেনি ইউক্রেনীয় বিমানবাহিনী।

 

শেভচেঙ্কো জেলায় আবাসিক ভবনে আঘাত

কিয়েভের মেয়র ভিতালি ক্লিচকো জানিয়েছেন, রাজধানীর কেন্দ্রীয় শেভচেঙ্কো জেলায় একটি ৯ তলা আবাসিক ভবনে হামলা হয়। সেখানে একজনের মৃত্যু হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। জরুরি সেবার কর্মীরা ঘটনাস্থলে আগুন নেভানো ও উদ্ধারকাজ চালান। একই এলাকায় একটি পাঁচতলা আবাসিক ভবনের সামনের অংশ ধসে পড়েছে বলেও দেখা গেছে।

 

মেয়র আরও জানান, শহরের বিভিন্ন স্থানে আগুন লাগে এবং উদ্ধারকর্মীরা আহতদের নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেন। ভোরের আলো ফুটতেই কিয়েভের আকাশে কালো ধোঁয়া ছড়িয়ে পড়তে দেখা যায়। রয়টার্সের ছবিতে দেখা গেছে, ক্ষতিগ্রস্ত ভবনে দমকলকর্মীরা পানি ছিটাচ্ছেন এবং উদ্ধারকর্মীরা ধ্বংসস্তূপের ভেতর থেকে মানুষ সরিয়ে নিচ্ছেন।

 

আশ্রয়কেন্দ্রেও আটকা পড়েন মানুষ

হামলার সময় কিয়েভের বহু বাসিন্দা মেট্রো স্টেশনে আশ্রয় নেন। ৬২ বছর বয়সী নাতালিয়া জভারিচ রয়টার্সকে বলেন, বিস্ফোরণ শুরু হতেই তিনি দ্রুত স্থানীয় মেট্রো স্টেশনে ছুটে যান। তার ভাষায়, “এটা ছিল ভয়ংকর, খুব ভয়ের। আমরা তিন ঘণ্টার বেশি সময় ধরে এখানে বসে আছি, ওপরে বিস্ফোরণের শব্দ শুনছি।”

 

শেভচেঙ্কো জেলায় একটি স্কুলের বিমান হামলা আশ্রয়কেন্দ্রের প্রবেশপথ ধ্বংসাবশেষে বন্ধ হয়ে গেলে কয়েকজন ভেতরে আটকা পড়েন বলে মেয়র ক্লিচকো জানান। একই এলাকার একটি ব্যবসাকেন্দ্রের আশ্রয়কেন্দ্রেও আরও কিছু মানুষ আটকা পড়ে থাকতে পারেন বলে শহরের সামরিক প্রশাসনের প্রধান জানিয়েছেন। তার ভাষ্য অনুযায়ী, কিয়েভের ৪০টির বেশি স্থানে ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে।

 

স্বাধীনতা চত্বরেও ক্ষয়ক্ষতি

কিয়েভের ঐতিহাসিক স্বাধীনতা চত্বরেও বিস্ফোরণের ধাক্কায় একটি পোস্ট অফিস ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, অফিস, দোকান এবং একটি মেট্রো স্টেশনের ফোয়ার অংশও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। হামলার পর সূর্য ওঠার পরও রাজধানীতে আবার বিমান হামলার সাইরেন বাজে, যা বাসিন্দাদের মধ্যে নতুন আতঙ্ক তৈরি করে। কিয়েভ অঞ্চলের গভর্নর মাইকোলা কালাশনিক জানিয়েছেন, রাজধানীর বাইরে বৃহত্তর কিয়েভ অঞ্চলেও হামলার ঘটনা ঘটেছে। সেখানে আরও তিনজন আহত হয়েছেন।

 

ওরেশনিক ক্ষেপণাস্ত্র নিয়ে কেন এত উদ্বেগ

হামলার কয়েক ঘণ্টা আগে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি সতর্ক করেছিলেন, রাশিয়া ইউক্রেনের বিরুদ্ধে ওরেশনিক হাইপারসনিক ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করে হামলার প্রস্তুতি নিচ্ছে। তিনি বলেন, ইউক্রেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে এই সতর্কতা দেওয়া হয়েছে।

 

রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন দাবি করে আসছেন, ওরেশনিক ক্ষেপণাস্ত্র ঘণ্টায় শব্দের গতির ১০ গুণেরও বেশি বেগে চলতে পারে এবং এটি আটকানো প্রায় অসম্ভব। রয়টার্সের তথ্য অনুযায়ী, রাশিয়া এর আগেও দুইবার ইউক্রেনে ওরেশনিক ব্যবহার করেছে- ২০২৪ সালের নভেম্বরে ডামি ওয়ারহেড দিয়ে এবং ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে লভিভে আরেক হামলায়।

 

তবে রোববারের কিয়েভ হামলায় ওই ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার হয়েছে কি না, তা এখনো নিশ্চিত নয়। ইউক্রেনীয় কর্তৃপক্ষ বিষয়টি যাচাই করছে। অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসও জানিয়েছে, ইউক্রেনীয় কর্মকর্তারা হামলায় ওরেশনিক ব্যবহারের সম্ভাবনা খতিয়ে দেখছেন।

 

লুহানস্ক হামলার পাল্টা প্রতিশোধ?

এই হামলার আগে রুশ-অধিকৃত পূর্ব ইউক্রেনের লুহানস্ক অঞ্চলে একটি ছাত্রাবাসে ড্রোন হামলার অভিযোগ তোলে মস্কো। রুশ কর্মকর্তারা দাবি করেন, ওই হামলায় ১৮ জন নিহত হয়েছেন। প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন এরপর ইউক্রেনের বিরুদ্ধে প্রতিশোধমূলক পদক্ষেপের বিকল্প প্রস্তুত করতে সামরিক বাহিনীকে নির্দেশ দেন। ইউক্রেন অবশ্য বেসামরিক স্থাপনায় হামলার অভিযোগ অস্বীকার করেছে। কিয়েভের দাবি, তারা একটি রুশ ড্রোন কমান্ড ইউনিটকে লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছে এবং আন্তর্জাতিক আইন মেনে সামরিক লক্ষ্যবস্তুতেই আঘাত করেছে।

 

পোল্যান্ডের সামরিক বিমান সক্রিয়

রাশিয়ার বড় আকারের হামলার সময় প্রতিবেশী পোল্যান্ড সতর্কতামূলকভাবে সামরিক বিমান সক্রিয় করে। পোলিশ সেনাবাহিনী জানিয়েছে, ইউক্রেনে রুশ হামলার প্রেক্ষাপটে তাদের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ও সামরিক বিমান প্রস্তুত রাখা হয়। তবে পোল্যান্ডের আকাশসীমা লঙ্ঘনের কোনো ঘটনা শনাক্ত হয়নি।

 

পোল্যান্ড ন্যাটোর সদস্য হওয়ায় ইউক্রেনের ওপর রাশিয়ার বড় ক্ষেপণাস্ত্র হামলা হলে দেশটি প্রায়ই সতর্কতামূলক পদক্ষেপ নেয়। বিশেষ করে সীমান্তবর্তী অঞ্চলে ক্ষেপণাস্ত্র বা ড্রোন ভূপাতিত হওয়ার ঝুঁকি থাকায় পোলিশ সামরিক বাহিনী নিয়মিত নজরদারি বাড়ায়।

 

কিয়েভে হামলা বাড়ছে

রোববারের হামলাটি এমন সময় হলো, যখন রাশিয়া সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে ইউক্রেনের রাজধানীসহ বিভিন্ন অঞ্চলে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা জোরদার করেছে। গত সপ্তাহেও রাশিয়ার ব্যাপক ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় ইউক্রেনের একাধিক শহরে অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয়। রয়টার্সের আরেক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মে মাসের মাঝামাঝি রাশিয়া দুই দিনে যুদ্ধের অন্যতম বড় ড্রোন হামলা চালায়, যাতে কিয়েভসহ কয়েকটি শহর ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

 

ইউক্রেনও সাম্প্রতিক সময়ে রাশিয়ার অভ্যন্তরে ড্রোন হামলা বাড়িয়েছে। গত সপ্তাহে মস্কো অঞ্চলে ইউক্রেনীয় ড্রোন হামলায় চারজন নিহতের দাবি করেছে রাশিয়া। ইউক্রেন বলছে, তারা রুশ সামরিক ও জ্বালানি অবকাঠামোকে লক্ষ্য করে হামলা চালাচ্ছে, কারণ রাশিয়া নিয়মিত ইউক্রেনের শহর ও জ্বালানি স্থাপনায় আঘাত করছে।

 

যুদ্ধের নতুন ঝুঁকি

বিশ্লেষকদের মতে, কিয়েভে রোববারের হামলা শুধু আরেকটি রাতের বিমান হামলা নয়; বরং যুদ্ধের ঝুঁকিপূর্ণ নতুন ধাপের ইঙ্গিত। একদিকে রাশিয়া হাইপারসনিক ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহারের হুমকি দিচ্ছে, অন্যদিকে ইউক্রেন রাশিয়ার গভীরে ড্রোন হামলা চালাচ্ছে। এতে পাল্টাপাল্টি প্রতিশোধের চক্র আরও তীব্র হওয়ার আশঙ্কা বাড়ছে।

 

যদি ওরেশনিক ক্ষেপণাস্ত্র সত্যিই ব্যবহার হয়ে থাকে, তবে তা ইউক্রেনের বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করবে। আর ব্যবহার না হলেও, এমন সতর্কতা নিজেই কিয়েভের বেসামরিক মানুষের মধ্যে ভয় ও অনিশ্চয়তা বাড়াচ্ছে। রাতভর মেট্রো স্টেশনে আশ্রয় নেওয়া মানুষের অভিজ্ঞতা দেখিয়ে দিচ্ছে, তিন বছরের বেশি সময়ের যুদ্ধের পরও ইউক্রেনের রাজধানী এখনো নিরাপদ নয়।

 

তথ্যসূত্র: রয়টার্স


সম্পর্কিত নিউজ