দেশের বাজারে কমলো জেট ফুয়েলের দাম

দেশের বাজারে কমলো জেট ফুয়েলের দাম
ছবির ক্যাপশান, ছবি: এআই

দেশে উড়োজাহাজে ব্যবহৃত জ্বালানি জেট ফুয়েলের দাম আবারও কমিয়েছে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন-বিইআরসি। নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, অভ্যন্তরীণ ফ্লাইট পরিচালনার ক্ষেত্রে প্রতি লিটার জেট ফুয়েলের দাম ৩৯ টাকা ৫৭ পয়সা কমিয়ে ১৬৫ টাকা ৮৮ পয়সা নির্ধারণ করা হয়েছে। এর আগে এই দাম ছিল লিটারপ্রতি ২০৫ টাকা ৪৫ পয়সা।

গতকাল শনিবার (২৩ মে) মধ্যরাত থেকে নতুন এ দাম কার্যকর হয়েছে। বিইআরসির বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, নতুন মূল্যহার পরবর্তী নির্দেশনা না দেওয়া পর্যন্ত বহাল থাকবে। বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা বাসস জানিয়েছে, উড়োজাহাজে ব্যবহৃত জেট ফুয়েলের দাম প্রায় ৪০ টাকা কমিয়ে অভ্যন্তরীণ ফ্লাইটের জন্য নতুন দর ১৬৫ টাকা ৮৮ পয়সা নির্ধারণ করা হয়েছে।

 

আন্তর্জাতিক ফ্লাইটের ক্ষেত্রেও জ্বালানির মূল্য কমানো হয়েছে। দেশি ও বিদেশি এয়ারলাইন্সের আন্তর্জাতিক ফ্লাইট পরিচালনার জন্য প্রতি লিটার জেট ফুয়েলের দাম ১ দশমিক ৩৩৮৫ মার্কিন ডলার থেকে কমিয়ে ১ দশমিক ০৮২৩ ডলার নির্ধারণ করা হয়েছে। অর্থাৎ আন্তর্জাতিক ফ্লাইটের ক্ষেত্রে লিটারপ্রতি দাম কমেছে প্রায় শূন্য দশমিক ২৫৬ ডলার। বাসসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আন্তর্জাতিক ফ্লাইটের নতুন দাম নির্ধারণ করা হয়েছে প্রতি লিটার ১ দশমিক ০৮২৩ ডলার।

 

বিইআরসি জানায়, আন্তর্জাতিক বাজারে জেট এ-১ জ্বালানির দামের উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন, বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের এলসি সেটেলমেন্টে ব্যবহৃত মার্কিন ডলারের বিনিময় হার এবং দেশের বাজারে ডিজেলের বিদ্যমান মূল্য বিবেচনায় নিয়ে নতুন মূল্যহার নির্ধারণ করা হয়েছে। দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ৫ মে থেকে ২১ মে পর্যন্ত আন্তর্জাতিক বাজারে Jet A-1 fuel-এর গড় Platts rate, বিপিসির এলসি সেটেলমেন্টে ডলারের বিনিময় হার, স্থানীয় ডিজেলের দাম এবং উপকূলীয় ট্যাংকার ও পাইপলাইন পরিবহন চার্জ বিবেচনায় কমিশন নতুন দর চূড়ান্ত করেছে।

 

বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, ২৩ মে কমিশনে এ বিষয়ে শুনানি অনুষ্ঠিত হয়। শুনানি শেষে মে মাসের মধ্যবর্তী সময়ের জন্য এই মূল্য সমন্বয়ের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। বিইআরসির ভাষ্য, বাজারভিত্তিক মূল্য সমন্বয় পদ্ধতির অংশ হিসেবে আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে জেট ফুয়েলের দাম সমন্বয় করা হচ্ছে। দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড জানিয়েছে, বিইআরসি মাসভিত্তিক বাজারভিত্তিক মূল্য নির্ধারণ পদ্ধতির আওতায় জেট ফুয়েলের দাম পর্যালোচনা করে।

 

মে মাসেই দ্বিতীয়বার কমল দাম

এ নিয়ে মে মাসে দ্বিতীয়বারের মতো জেট ফুয়েলের দাম কমানো হলো। এর আগে গত ৭ মে প্রতি লিটার জেট ফুয়েলের দাম ২২ টাকা ৩৫ পয়সা কমানো হয়েছিল। তখন অভ্যন্তরীণ ফ্লাইটের জন্য প্রতি লিটার জেট ফুয়েলের দাম ২২৭ টাকা ৮ পয়সা থেকে কমিয়ে ২০৫ টাকা ৪৫ পয়সা নির্ধারণ করা হয়। একই সময়ে আন্তর্জাতিক ফ্লাইটের জন্য দাম ১ দশমিক ৪৮০৬ ডলার থেকে কমিয়ে ১ দশমিক ৩৩৮৫ ডলার করা হয়েছিল।

 

তার আগে গত ৭ এপ্রিল প্রায় ২৫ টাকা দাম বাড়ানো হয়। ওই সময়ে অভ্যন্তরীণ রুটে জেট ফুয়েলের দাম ২০২ টাকা ২৯ পয়সা থেকে বাড়িয়ে ২২৭ টাকা ৮ পয়সা করা হয়েছিল। আন্তর্জাতিক রুটে দাম বাড়িয়ে করা হয়েছিল প্রায় ১ দশমিক ৪৮ ডলার। ফিন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেস জানিয়েছে, ৭ এপ্রিল দাম বাড়ানোর আগে মার্চ মাসে জেট ফুয়েলের দামে বড় উল্লম্ফন দেখা যায়।

 

গত ২৪ মার্চ এক দফায় জেট ফুয়েলের দাম প্রায় ৯০ টাকা বাড়ানো হয়েছিল। ইত্তেফাকের ইংরেজি সংস্করণের প্রতিবেদনে বলা হয়, ওই সিদ্ধান্তে অভ্যন্তরীণ ফ্লাইটে জেট ফুয়েলের দাম ১১২ টাকা ৪১ পয়সা থেকে বাড়িয়ে ২০২ টাকা ২৯ পয়সা করা হয়। আন্তর্জাতিক ফ্লাইটের দামও ০.৭৩৮৫ ডলার থেকে বাড়িয়ে ১.৩২১৬ ডলার নির্ধারণ করা হয়।

 

কেন এত ঘনঘন দাম পরিবর্তন হচ্ছে

বিমান জ্বালানির দাম মূলত আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কিত। আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম, Jet A-1 fuel-এর Platts rate, ডলারের বিনিময় হার, আমদানি ব্যয়, পরিবহন খরচ এবং স্থানীয় কর কাঠামোর ওপর নির্ভর করে দেশে জেট ফুয়েলের দাম ওঠানামা করে।

 

সম্প্রতি মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা, হরমুজ প্রণালি ঘিরে সরবরাহ শঙ্কা এবং বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারের অস্থিরতার কারণে দেশে জেট ফুয়েলের দামে বড় পরিবর্তন দেখা যায়। ফিন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিইআরসি আগের অস্থিরতার কারণ হিসেবে মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা এবং হরমুজ প্রণালি ঘিরে সরবরাহ উদ্বেগকে উল্লেখ করেছিল। তবে মে মাসে আন্তর্জাতিক বাজারের কিছুটা নিম্নমুখী প্রবণতা এবং হিসাব-নিকাশের নতুন গড় দরের কারণে দেশে জেট ফুয়েলের দাম কমানো হয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন। এতে বিমান সংস্থাগুলোর পরিচালন ব্যয় কিছুটা কমতে পারে।

 

ভাড়া কমবে কি?

জেট ফুয়েলের দাম কমলেও তাৎক্ষণিকভাবে বিমান ভাড়া কমবে-এমন নিশ্চয়তা নেই। কারণ বিমান ভাড়ার সঙ্গে শুধু জ্বালানির দাম নয়, বিমান রক্ষণাবেক্ষণ, লিজ, ডলার ব্যয়, বিমানবন্দর চার্জ, ক্রু খরচ, যাত্রীচাহিদা, রুটের প্রতিযোগিতা এবং মৌসুমি চাপও জড়িত।

 

তবে জ্বালানি ব্যয় বিমান সংস্থাগুলোর পরিচালন খরচের বড় অংশ। আন্তর্জাতিক বিমান পরিবহন সংস্থা আইএটিএর তথ্য অনুযায়ী, জেট ফুয়েল সাধারণত এয়ারলাইন্সের পরিচালন ব্যয়ের প্রায় ৩০ শতাংশ পর্যন্ত হতে পারে। তাই জেট ফুয়েলের দাম কমলে এয়ারলাইন্সগুলোর ওপর ব্যয়চাপ কমার সুযোগ তৈরি হয়।

 

বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রুটে জ্বালানি ব্যয় তুলনামূলকভাবে বেশি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, সিলেট, যশোর, সৈয়দপুর, বরিশাল বা রাজশাহীর মতো রুটে যাত্রীভাড়ার বড় অংশ পরিচালন ব্যয়ের সঙ্গে সম্পর্কিত। ফলে জেট ফুয়েলের ধারাবাহিক মূল্যহ্রাস দীর্ঘমেয়াদে টিকিটের মূল্য, ফ্লাইট ফ্রিকোয়েন্সি ও এয়ারলাইন্সের ব্যবসায়িক পরিকল্পনায় প্রভাব ফেলতে পারে।

 

অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক দামে পার্থক্য কেন

অভ্যন্তরীণ ফ্লাইটের জন্য জেট ফুয়েলের দাম টাকা হিসেবে নির্ধারণ করা হয় এবং এতে শুল্ক ও ভ্যাট অন্তর্ভুক্ত থাকে। দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড জানিয়েছে, অভ্যন্তরীণ ফ্লাইটের জন্য ১৬৫ টাকা ৮৮ পয়সা দরটি duty ও VAT-সহ নির্ধারিত। অন্যদিকে আন্তর্জাতিক ফ্লাইটের ক্ষেত্রে দেশি ও বিদেশি এয়ারলাইন্সের জন্য দাম নির্ধারণ করা হয় মার্কিন ডলারে এবং সেটি duty ও VAT ছাড়া। এই কারণে অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক রুটের জ্বালানির মূল্য কাঠামো সরাসরি একভাবে তুলনা করা যায় না। আন্তর্জাতিক রুটে ডলারভিত্তিক মূল্য নির্ধারণের ফলে ডলারের বিনিময় হারও এয়ারলাইন্সগুলোর ব্যয়ে প্রভাব ফেলে।

 

কোন কোন বিমানবন্দরে প্রযোজ্য

ইত্তেফাকের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অভ্যন্তরীণ ফ্লাইটে বাংলাদেশি ক্রেতা এবং আন্তর্জাতিক ফ্লাইটে দেশি-বিদেশি ক্রেতাদের জন্য ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর, চট্টগ্রামের হযরত শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর, সিলেটের ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর, কক্সবাজার বিমানবন্দর, যশোর বিমানবন্দর এবং ভবিষ্যতে চালু হতে যাওয়া বিমানবন্দরে এই মূল্য কাঠামো প্রযোজ্য হবে।

 

জেট ফুয়েল বা Jet A-1 হলো বাণিজ্যিক উড়োজাহাজে ব্যবহৃত বিশেষ ধরনের এভিয়েশন টারবাইন ফুয়েল। সাধারণ ডিজেল বা অকটেনের মতো নয়; উচ্চ উচ্চতায় কম তাপমাত্রা, ইঞ্জিনের নিরাপত্তা এবং আন্তর্জাতিক মান বিবেচনায় জেট ফুয়েলের মান ও সরবরাহ ব্যবস্থা আলাদা করে নিয়ন্ত্রিত হয়।

 

এভিয়েশন খাতে স্বস্তি, তবে অস্থিরতা কাটেনি

মার্চের বড় মূল্যবৃদ্ধির পর দেশের এভিয়েশন খাতের উদ্যোক্তারা উদ্বেগ জানিয়েছিলেন। ইত্তেফাকের ইংরেজি প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, Aviation Operators Association of Bangladesh-AOAB তখন প্রায় ৮০ শতাংশ মূল্যবৃদ্ধিকে অযৌক্তিক বলে মন্তব্য করে এবং সতর্ক করেছিল যে এতে এয়ারলাইন্সগুলোর ওপর বড় আর্থিক চাপ তৈরি হবে ও যাত্রীভাড়া বাড়ার আশঙ্কা থাকবে।

 

সেই প্রেক্ষাপটে মে মাসে দুই দফা দাম কমানো এয়ারলাইন্সগুলোর জন্য স্বস্তির খবর। তবে এক মাসের মধ্যেই বড় বৃদ্ধি ও পরপর দুই দফা কমানোর ঘটনা দেখাচ্ছে, জ্বালানি বাজার এখনও অস্থির। বিশেষ করে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম, ডলারের বিনিময় হার এবং ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতি পরিবর্তিত হলে আবারও মূল্য সমন্বয় হতে পারে।


সম্পর্কিত নিউজ