{{ news.section.title }}
নবম পে স্কেলের বরাদ্দ নিয়ে বড় সুখবর
কৃচ্ছ্রসাধনের বার্তা দিলেও আসন্ন ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেটে পরিচালন ব্যয়ের লাগাম টেনে ধরা যাচ্ছে না। বরং সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য নবম জাতীয় পে-স্কেল বাস্তবায়নের প্রস্তুতির কারণে শেষ মুহূর্তে এই খাতে আরও বড় অঙ্কের অর্থ যোগ করতে হচ্ছে সরকারকে। ফলে পরিচালন ব্যয় বেড়ে প্রায় ৬ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকায় পৌঁছাতে যাচ্ছে, যা প্রস্তাবিত ৩ লাখ কোটি টাকার বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) তুলনায় দ্বিগুণেরও বেশি।
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, পরিচালন ব্যয়ের এই অস্বাভাবিক বৃদ্ধি শুধু বাজেটের ভারসাম্যের ওপর চাপ সৃষ্টি করবে না, একই সঙ্গে উন্নয়ন ব্যয় সংকুচিত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি করবে। পাশাপাশি উৎপাদন বৃদ্ধির সমান্তরাল উদ্যোগ ছাড়া সরকারি কর্মচারীদের হাতে অতিরিক্ত অর্থ গেলে বাজারে চাহিদা বাড়বে, যা মূল্যস্ফীতির ওপর নতুন চাপ সৃষ্টি করতে পারে।
শেষ মুহূর্তে বদলে গেল বাজেটের হিসাব
অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, চলতি বছরের মে মাসে বাজেটের প্রাথমিক কাঠামো তৈরির সময় পরিচালন ব্যয়ের জন্য প্রায় ৬ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দের পরিকল্পনা ছিল। একই সময়ে ৩ লাখ কোটি টাকার এডিপিও অনুমোদনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
কিন্তু নবম জাতীয় পে-স্কেল বাস্তবায়নের নীতিগত সিদ্ধান্ত সামনে আসার পর বাজেটের হিসাব-নিকাশে বড় ধরনের পরিবর্তন আসে। নতুন বেতন কাঠামোর প্রথম ধাপ কার্যকর করতে অতিরিক্ত প্রায় ৩৭ হাজার কোটি টাকার প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়। এরই অংশ হিসেবে পরিচালন ব্যয়ে আরও ৮ হাজার কোটি টাকা যোগ করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। ফলে সামগ্রিক বাজেটের আকার বেড়ে প্রায় ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকায় পৌঁছেছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে।
পে-স্কেলের প্রভাব: বাড়বে ক্রয়ক্ষমতা, বাড়তে পারে মূল্যস্ফীতিও
অর্থ বিভাগের কর্মকর্তাদের মতে, নতুন পে-স্কেল কার্যকর হলে সরকারি চাকরিজীবীদের আয় ও ক্রয়ক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পাবে। এতে বাজারে ভোগব্যয় বাড়বে এবং অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে কিছু ইতিবাচক গতি আসতে পারে। তবে অর্থনীতিবিদদের আশঙ্কা, উৎপাদন ও সরবরাহ ব্যবস্থায় সমপরিমাণ উন্নতি না হলে অতিরিক্ত চাহিদা মূল্যস্ফীতিকে আরও উসকে দিতে পারে। বর্তমানে খাদ্যপণ্য, জ্বালানি ও নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের বাজারে মূল্যচাপ পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আসেনি। এমন পরিস্থিতিতে বিপুলসংখ্যক সরকারি কর্মচারীর হাতে অতিরিক্ত অর্থ গেলে বাজারে নতুন চাপ সৃষ্টি হওয়ার সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
‘শুধু বেতন বাড়ালেই হবে না’
সাবেক অর্থ সচিব মাহবুব আহমেদ মনে করেন, দীর্ঘদিন ধরে সরকারি বেতন কাঠামোয় বড় ধরনের সমন্বয় হয়নি। জীবনযাত্রার ব্যয় ও মূল্যস্ফীতির বাস্তবতায় বেতন বাড়ানোর প্রয়োজন ছিল। তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, শুধু বেতন বৃদ্ধি করলেই কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া যাবে না। এর সঙ্গে প্রশাসনিক দক্ষতা, জবাবদিহি এবং সরকারি সেবার মানও বাড়াতে হবে। তার মতে, বর্তমানে সরকারের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে রাজস্ব আহরণ বৃদ্ধি। যদি কর আদায় উল্লেখযোগ্য হারে না বাড়ে, তাহলে বাড়তি ব্যয় মেটাতে সরকারকে আরও বেশি ঋণের ওপর নির্ভর করতে হবে। এতে বেসরকারি খাতের জন্য ঋণপ্রবাহ সংকুচিত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে, যা বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।
উন্নয়ন ব্যয় পিছিয়ে পড়ার শঙ্কা
বিশেষজ্ঞদের মতে, একটি উন্নয়নশীল দেশের বাজেটে পরিচালন ব্যয়ের তুলনায় উন্নয়ন ব্যয়ের গুরুত্ব বেশি হওয়া উচিত। কারণ অবকাঠামো নির্মাণ, শিল্পায়ন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি মূলত উন্নয়ন ব্যয়ের মাধ্যমেই ত্বরান্বিত হয়। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে পরিচালন ব্যয়ের অংশ ক্রমাগত বাড়ছে, আর উন্নয়ন ব্যয়ের অনুপাত তুলনামূলকভাবে কমে আসছে। এর ফলে নতুন অবকাঠামো প্রকল্প, সরকারি বিনিয়োগ এবং দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন পরিকল্পনার গতি কমে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
ব্যয় নিয়ন্ত্রণে কৃচ্ছ্রসাধনের পরামর্শ
অর্থনীতিবিদরা মনে করছেন, পরিচালন ও উন্নয়ন ব্যয়ের মধ্যে ভারসাম্য ফিরিয়ে আনতে হলে সরকারকে আরও কঠোর কৃচ্ছ্রসাধন নীতি অনুসরণ করতে হবে।
তাদের মতে-
- অপ্রয়োজনীয় বিদেশ সফর সীমিত করতে হবে,
- বিলাসবহুল যানবাহন ক্রয়ে নিয়ন্ত্রণ আনতে হবে,
- অনুৎপাদনশীল খাতে ব্যয় কমাতে হবে,
- ভর্তুকি ব্যবস্থায় সংস্কার আনতে হবে,
- রাজস্ব আহরণ বাড়াতে হবে,
- এডিপি বাস্তবায়নের দক্ষতা বৃদ্ধি করতে হবে,
- এবং উৎপাদনমুখী খাতে সরকারি বিনিয়োগ জোরদার করতে হবে।
- ‘বরাদ্দ নয়, ব্যয়ের গুণগত মান গুরুত্বপূর্ণ’
এম মাসরুর রিয়াজ বলেছেন, বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতায় সরকারি ব্যয়ের দক্ষতা নিশ্চিত করাই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। তার মতে, বাজেটের আকার বাড়ানোই মূল বিষয় নয়; বরং বরাদ্দকৃত অর্থ কতটা কার্যকরভাবে ব্যয় হচ্ছে, সেটিই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
তিনি বলেন, রাজস্ব ব্যবস্থার কাঠামোগত সংস্কার, অপচয় রোধ এবং বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ বজায় রাখতে সরকারকে আরও সতর্ক হতে হবে। একই সঙ্গে অপ্রয়োজনীয় পরিচালন ব্যয় কমিয়ে উৎপাদনশীল ও উন্নয়নমুখী খাতে বরাদ্দ বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিতে হবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, নবম জাতীয় পে-স্কেল বাস্তবায়ন সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য স্বস্তির খবর হলেও এর আর্থিক প্রভাব মোকাবিলায় সরকারের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ অপেক্ষা করছে। রাজস্ব আয় বাড়ানো, ব্যয়ের দক্ষতা নিশ্চিত করা এবং উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের গতি ধরে রাখতে না পারলে রেকর্ড আকারের এই বাজেট বাস্তবায়ন সহজ হবে না।