নবম পে-স্কেলের প্রথম ধাপের বরাদ্দ থাকছে বাজেটে

নবম পে-স্কেলের প্রথম ধাপের বরাদ্দ থাকছে বাজেটে
ছবির ক্যাপশান, এআই ছবি

দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য নবম জাতীয় পে-স্কেল বাস্তবায়নের পথে এগোচ্ছে সরকার। আসন্ন ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেটে নতুন পে-স্কেলের প্রথম ধাপ বাস্তবায়নের জন্য ৩৫ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে।

মঙ্গলবার (৯ জুন) সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে, জাতীয় বেতন কমিশনের সুপারিশ ধাপে ধাপে বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে আগামী ১ জুলাই থেকে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরা নতুন বেতন কাঠামোর আওতায় প্রস্তাবিত মূল বেতনের ৫০ শতাংশ সুবিধা পেতে শুরু করবেন।

 

জুনেই গেজেট প্রকাশের প্রস্তুতি

অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী জানিয়েছেন, নবম জাতীয় পে-স্কেল কার্যকর করার লক্ষ্যে জুন মাসের মধ্যেই প্রয়োজনীয় গেজেট প্রকাশের প্রস্তুতি চলছে। তিনি বলেন, নতুন অর্থবছরের শুরু থেকেই বেতন কাঠামো বাস্তবায়নের জন্য প্রশাসনিক ও আর্থিক প্রস্তুতি এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে। সরকারের লক্ষ্য হচ্ছে ধাপে ধাপে নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়নের মাধ্যমে সরকারি চাকরিজীবীদের জীবনযাত্রার ব্যয় ও মূল্যস্ফীতির চাপ কিছুটা লাঘব করা।

 

তিন ধাপে বাস্তবায়নের পরিকল্পনা

অর্থ বিভাগের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের তথ্য অনুযায়ী, নতুন পে-স্কেল একবারে কার্যকর না করে তিন ধাপে বাস্তবায়নের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। প্রথম ধাপে ২০২৬-২৭ অর্থবছরে প্রস্তাবিত মূল বেতনের প্রায় ৫০ শতাংশ সমন্বয় করা হবে। দ্বিতীয় ধাপে ২০২৭-২৮ অর্থবছরে বাকি মূল বেতন বাস্তবায়ন করা হবে। আর তৃতীয় ধাপে বাড়িভাড়া, চিকিৎসা, যাতায়াতসহ বিভিন্ন ভাতা নতুন কাঠামোর আওতায় এনে পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন সম্পন্ন করার পরিকল্পনা রয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, নতুন পে-স্কেলের আওতায় নিম্ন গ্রেডের কর্মচারীরা তুলনামূলক বেশি সুবিধা পেতে পারেন। একই সঙ্গে বেতন বৈষম্য কমিয়ে আনার বিষয়টিও গুরুত্ব পাচ্ছে।

 

৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বাজেট

সরকার আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য প্রায় ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার জাতীয় বাজেট প্রণয়নের প্রস্তুতি নিয়েছে। এই বাজেটে মোট রাজস্ব আহরণের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) মাধ্যমে সংগ্রহের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে ৬ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা। অন্যদিকে সম্ভাব্য বাজেট ঘাটতি ধরা হয়েছে ২ লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকা। এই ঘাটতির প্রায় ৪৮ শতাংশ বৈদেশিক উৎস থেকে এবং বাকি ৫২ শতাংশ অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে অর্থায়নের পরিকল্পনা রয়েছে।

 

শিক্ষায় নতুন উদ্যোগ

আসন্ন বাজেটে শিক্ষা খাতে কয়েকটি নতুন কর্মসূচি যুক্ত করার পরিকল্পনা করা হয়েছে।

এর মধ্যে রয়েছে-

  • শিক্ষার্থীদের জন্য ‘মিড ডে মিল’ কর্মসূচি চালু,
  • ‘ওয়ান টিচার, ওয়ান ট্যাব’ উদ্যোগ,
  • প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষাদান সম্প্রসারণ,
  • বিদেশি ভাষা শিক্ষায় বিশেষ সহায়তা।

সরকার আন্তর্জাতিক কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়াতে বাংলা ও ইংরেজির পাশাপাশি একটি বিদেশি ভাষাকে তৃতীয় ভাষা হিসেবে শিক্ষাব্যবস্থায় গুরুত্ব দেওয়ার পরিকল্পনা করেছে। এ লক্ষ্যে বিদেশি ভাষা শেখার জন্য শিক্ষার্থীদের সর্বোচ্চ ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত ঋণ সুবিধা দেওয়ার প্রস্তাব রাখা হয়েছে।

 

কর ও ভ্যাটে আসছে পরিবর্তন

নতুন বাজেটে ব্যক্তি ও ব্যবসা খাতে বেশ কিছু কর-সুবিধা ও ভ্যাট সংশোধনের প্রস্তাব থাকছে।

এর মধ্যে-

  • ব্যাংক আমানত ও ঋণের ক্ষেত্রে ৪ লাখ টাকা পর্যন্ত আবগারি শুল্ক অব্যাহতি,
  • সামাজিক সুরক্ষা খাতে মোট বাজেটের প্রায় ৩০ শতাংশ বরাদ্দ,
  • ২০২৮ সাল পর্যন্ত মেট্রোরেল সেবায় ভ্যাট অব্যাহতি অব্যাহত রাখা,
  • স্বর্ণের প্রতি ভরিতে ২ হাজার ৫০০ টাকা ভ্যাট আরোপ,
  • দেশীয়ভাবে উৎপাদিত মদের ওপর লিটারপ্রতি ৫০০ টাকা ভ্যাট নির্ধারণ।
  • সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য বড় স্বস্তি

নবম জাতীয় পে-স্কেল বাস্তবায়নের উদ্যোগকে সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য সাম্প্রতিক সময়ের সবচেয়ে বড় আর্থিক সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখা হচ্ছে। দীর্ঘদিন ধরে বেতন কাঠামো পুনর্বিন্যাসের দাবি জানিয়ে আসছিলেন সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরা।অর্থনীতিবিদদের মতে, বেতন বৃদ্ধি সরকারি কর্মচারীদের ক্রয়ক্ষমতা বাড়াবে এবং অভ্যন্তরীণ বাজারে চাহিদা বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখতে পারে। তবে একই সঙ্গে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, রাজস্ব আয় বৃদ্ধি এবং বাজেট ঘাটতি ব্যবস্থাপনা সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে থাকবে।

 

সবকিছু ঠিক থাকলে আগামী ১ জুলাই থেকে নতুন পে-স্কেলের প্রথম ধাপ কার্যকর হওয়ার মাধ্যমে দেশের লাখো সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী ও পেনশনভোগীদের জন্য নতুন অধ্যায়ের সূচনা হবে।


সম্পর্কিত নিউজ