সুরা হাশরের শেষ তিন আয়াতের ফজিলত

সুরা হাশরের শেষ তিন আয়াতের ফজিলত
ছবির ক্যাপশান, ছবি: সংগৃহীত

পবিত্র কোরআনের ৫৯তম সুরা ‘আল-হাশর’ মুসলিম উম্মাহর কাছে বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। ২৪ আয়াত ও ৩ রুকুবিশিষ্ট এই মাদানি সুরাটি মূলত মদিনার ইহুদি গোত্র বনু নাযিরের ঘটনা, মুসলিম সমাজের জন্য শিক্ষণীয় বিভিন্ন বিষয় এবং আল্লাহ তাআলার মহিমা ও ক্ষমতার বর্ণনা নিয়ে অবতীর্ণ হয়েছে। তবে সুরাটির শেষ তিন আয়াত এমন এক বিশেষ মর্যাদা লাভ করেছে, যা যুগে যুগে মুসলমানদের হৃদয়ে গভীর প্রভাব বিস্তার করে আসছে।

ইসলামী স্কলারদের মতে, সুরা হাশরের শেষ তিন আয়াত শুধু তিলাওয়াতের জন্য নয়; বরং আল্লাহ তাআলাকে সঠিকভাবে চেনা, তাঁর গুণাবলি উপলব্ধি করা এবং তাওহিদের ওপর দৃঢ় বিশ্বাস স্থাপনের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই আয়াতগুলোতে মহান আল্লাহ নিজের পরিচয় এমনভাবে তুলে ধরেছেন, যা একজন মুমিনকে তাঁর রবের মহিমা, দয়া, ক্ষমতা ও কর্তৃত্ব সম্পর্কে গভীর উপলব্ধি প্রদান করে।

 

সুরা আল-হাশরের পটভূমিতে রয়েছে বনু নাযির গোত্রের ঘটনা। তারা রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ থাকা সত্ত্বেও বিশ্বাসঘাতকতায় লিপ্ত হয় এবং নবী করিম (সা.)-এর বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করে। ঐতিহাসিক বর্ণনা অনুযায়ী, রাসুলুল্লাহ (সা.) একবার তাদের এলাকায় গেলে তারা গোপনে তাঁকে হত্যার পরিকল্পনা করে। আল্লাহ তাআলা ওহির মাধ্যমে বিষয়টি জানিয়ে দিলে নবীজি (সা.) নিরাপদে সেখান থেকে চলে আসেন। পরে তাদের চুক্তিভঙ্গের কারণে মদিনা ত্যাগের নির্দেশ দেওয়া হয়। প্রথমে তারা অস্বীকৃতি জানালেও শেষ পর্যন্ত মুসলিম বাহিনীর অবরোধের মুখে এলাকা ছেড়ে যেতে বাধ্য হয়। কেউ খাইবারে এবং কেউ সিরিয়ার দিকে চলে যায়।

 

তাফসিরবিদদের মতে, এই ঘটনার মাধ্যমে আল্লাহ তাআলা মুসলমানদের শিক্ষা দিয়েছেন যে, বাহ্যিক শক্তি, সম্পদ বা দুর্গ কোনো জাতিকে রক্ষা করতে পারে না, যদি তারা সত্য ও ন্যায়ের পথ থেকে বিচ্যুত হয়। প্রকৃত ক্ষমতা ও সাহায্য কেবল আল্লাহর কাছ থেকেই আসে।

 

সুরার শেষ অংশে এসে আল্লাহ তাআলা নিজের পরিচয় বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন, “তিনি আল্লাহ, তিনি ছাড়া কোনো সত্য উপাস্য নেই। তিনি দৃশ্য ও অদৃশ্য সবকিছুর জ্ঞান রাখেন। তিনি পরম করুণাময়, অসীম দয়ালু।” এরপর ধারাবাহিকভাবে আল্লাহর বহু মহান গুণবাচক নাম উল্লেখ করা হয়েছে, যা ইসলামে ‘আসমাউল হুসনা’ নামে পরিচিত।

 

এই আয়াতগুলোতে উল্লেখিত নামগুলোর মধ্যে রয়েছে- আল-মালিক (সর্বময় অধিপতি), আল-কুদ্দুস (পরম পবিত্র), আস-সালাম (শান্তির উৎস), আল-মুমিন (নিরাপত্তাদানকারী), আল-মুহাইমিন (রক্ষণাবেক্ষণকারী), আল-আজিজ (পরাক্রমশালী), আল-জাব্বার (মহাশক্তিধর), আল-মুতাকাব্বির (মহিমান্বিত), আল-খালিক (সৃষ্টিকর্তা), আল-বারি (উদ্ভাবনকারী) এবং আল-মুসাওয়ির (রূপদাতা)। আলেমরা বলেন, এসব নাম শুধু মুখস্থ করার জন্য নয়; বরং এগুলোর অর্থ বোঝা এবং জীবনে তার প্রভাব গ্রহণ করাই একজন মুমিনের দায়িত্ব।

 

কোরআনের ২১ নম্বর আয়াতে আল্লাহ তাআলা একটি গভীর উপমা দিয়েছেন। তিনি বলেন, যদি এই কোরআন কোনো পাহাড়ের ওপর অবতীর্ণ করা হতো, তাহলে আল্লাহর ভয়ে সেই পাহাড়ও বিনীত ও বিদীর্ণ হয়ে যেত। মুফাসসিরগণ বলেন, এর মাধ্যমে মানুষের হৃদয়কে সতর্ক করা হয়েছে, যাতে তারা কোরআনের শিক্ষা নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করে এবং আল্লাহর সামনে নিজেদের জবাবদিহিতার কথা স্মরণ রাখে।

 

সুরা হাশরের শেষ তিন আয়াত পাঠের ফজিলত

সুরা হাশরের শেষ তিন আয়াতের গুরুত্ব সম্পর্কে একটি প্রসিদ্ধ হাদিসে মাকাল ইবনে ইয়াসার (রা.) থেকে বর্ণিত হয়েছে, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন,

“যে ব্যক্তি সকালে তিনবার ‘আউযু বিল্লাহিস সামিইল আলিমি মিনাশ শাইতানির রাজিম’ পাঠ করবে, এরপর সুরা হাশরের শেষ তিন আয়াত তিলাওয়াত করবে, আল্লাহ তাআলা তার জন্য ৭০ হাজার ফেরেশতা নিয়োজিত করবেন। তারা সন্ধ্যা পর্যন্ত তার জন্য মাগফিরাতের দোয়া করতে থাকবে। আর সে যদি ওই সময়ের মধ্যে মৃত্যুবরণ করে, তাহলে শহীদের মর্যাদা লাভ করবে। একইভাবে যে ব্যক্তি সন্ধ্যায় এটি পাঠ করবে, তার জন্যও অনুরূপ মর্যাদা রয়েছে।” (জামে তিরমিজি, হাদিস: ২৯২২; মুসনাদ আহমাদ)

 

হাদিসবিশারদদের একটি অংশ এই বর্ণনার সনদ নিয়ে আলোচনা করেছেন এবং কেউ কেউ এটিকে দুর্বল (দাঈফ) বলেছেন। তবে কোরআনের আয়াত তিলাওয়াত, আল্লাহর প্রশংসা করা এবং তাঁর গুণাবলি স্মরণ করা ইসলামের দৃষ্টিতে অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ আমল। এ কারণে বহু আলেম ও দাঈ সুরা হাশরের শেষ তিন আয়াত নিয়মিত পাঠ করার প্রতি উৎসাহ প্রদান করেছেন। এ প্রসঙ্গে আরেকটি প্রসিদ্ধ হাদিসে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, “আল্লাহর নিরানব্বইটি নাম রয়েছে। যে ব্যক্তি সেগুলো সংরক্ষণ করবে, বুঝবে এবং তার আলোকে জীবন পরিচালনা করবে, সে জান্নাতে প্রবেশ করবে।” (সহিহ বুখারি, সহিহ মুসলিম)

 

ইসলামী গবেষকদের মতে, সুরা হাশরের শেষ তিন আয়াতের অন্যতম বিশেষত্ব হলো এখানে আল্লাহর বহু সুন্দর নাম একত্রে উল্লেখ করা হয়েছে। ফলে এসব আয়াত পাঠের মাধ্যমে একজন মুসলমান আল্লাহর পরিচয় সম্পর্কে গভীর জ্ঞান অর্জনের সুযোগ পায়।

 

বর্তমান সময়ে মানুষ যখন নানা উদ্বেগ, হতাশা, ভয় এবং অনিশ্চয়তার মধ্যে জীবনযাপন করছে, তখন এই আয়াতগুলো তাকে স্মরণ করিয়ে দেয় যে সমগ্র বিশ্বজগতের নিয়ন্ত্রণ একমাত্র আল্লাহর হাতে। তিনি মানুষের প্রকাশ্য ও গোপন সব বিষয় সম্পর্কে অবগত। মানুষের অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যৎ তাঁর জ্ঞানের বাইরে নয়।

 

আলেমদের মতে, একজন মুসলমান যখন ‘আল-মালিক’ নামটি উপলব্ধি করে, তখন সে বুঝতে পারে যে প্রকৃত মালিকানা কেবল আল্লাহর। যখন ‘আস-সালাম’ নামটি উপলব্ধি করে, তখন সে বুঝতে পারে প্রকৃত শান্তি ও নিরাপত্তা আল্লাহর পক্ষ থেকেই আসে। আবার ‘আল-আজিজ’ নামটি তাকে শেখায় যে প্রকৃত সম্মান ও মর্যাদা মানুষের হাতে নয়, বরং আল্লাহর কাছেই নিহিত।

 

তাফসিরে ইবনে কাসির, তাফসিরে তাবারি এবং অন্যান্য ক্লাসিক তাফসিরগ্রন্থে উল্লেখ করা হয়েছে, এই আয়াতগুলো মানুষের অন্তরে আল্লাহর ভয়, ভালোবাসা ও আনুগত্য সৃষ্টি করে। একজন মুমিন যখন এসব আয়াতের অর্থ নিয়ে চিন্তা করে, তখন তার হৃদয়ে তাওহিদের বোধ আরও দৃঢ় হয় এবং সে আল্লাহর ওপর ভরসা করতে শেখে।

 

ইসলামী শিক্ষায় কেবল ইবাদত নয়, আল্লাহকে সঠিকভাবে চেনার ওপরও বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। কারণ মানুষ যত বেশি তার স্রষ্টাকে চিনবে, তত বেশি তাঁর আনুগত্যে আগ্রহী হবে। সুরা হাশরের শেষ তিন আয়াত সেই পরিচয়কে অত্যন্ত সুন্দরভাবে তুলে ধরে। এই আয়াতগুলো আরও ঘোষণা করে যে আকাশ ও পৃথিবীর সবকিছু আল্লাহর পবিত্রতা বর্ণনা করে। সমগ্র সৃষ্টি তাঁর আনুগত্যে পরিচালিত হচ্ছে। মানুষের উচিত সেই মহাসত্য উপলব্ধি করা এবং নিজের জীবনকে আল্লাহর নির্দেশনার আলোকে পরিচালিত করা।

 

ইসলামী চিন্তাবিদদের মতে, সুরা হাশরের শেষ তিন আয়াত কেবল একটি তিলাওয়াতযোগ্য অংশ নয়; বরং এটি তাওহিদ, আল্লাহর পরিচয়, আসমাউল হুসনা এবং ঈমানি চেতনার এক সংক্ষিপ্ত কিন্তু পূর্ণাঙ্গ পাঠ। একজন মুসলমান যদি এর অর্থ ও শিক্ষা হৃদয়ে ধারণ করতে পারে, তাহলে তার ঈমান দৃঢ় হবে, আল্লাহর প্রতি ভালোবাসা বৃদ্ধি পাবে এবং দুনিয়ার নানা ভয় ও সংকটের মাঝেও সে আত্মিক প্রশান্তি খুঁজে পাবে।

 

এ কারণেই যুগে যুগে মুসলিম আলেমরা সুরা হাশরের শেষ তিন আয়াতকে কোরআনের অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ অংশ হিসেবে বিবেচনা করেছেন। এসব আয়াত মানুষের হৃদয়কে আল্লাহমুখী করে, তাঁর মহিমা স্মরণ করিয়ে দেয় এবং মনে করিয়ে দেয়- প্রকৃত শক্তি, সম্মান, নিরাপত্তা ও সফলতা একমাত্র মহান আল্লাহর কাছেই রয়েছে।

 

সুরা হাশরের শেষ তিন আয়াত

هُوَ اللَّهُ الَّذِي لَا إِلَهَ إِلَّا هُوَ عَالِمُ الْغَيْبِ وَالشَّهَادَةِ هُوَ الرَّحْمَنُ الرَّحِيمُ (22) هُوَ اللَّهُ الَّذِي لَا إِلَهَ إِلَّا هُوَ الْمَلِكُ الْقُدُّوسُ السَّلَامُ الْمُؤْمِنُ الْمُهَيْمِنُ الْعَزِيزُ الْجَبَّارُ الْمُتَكَبِّرُ سُبْحَانَ اللَّهِ عَمَّا يُشْرِكُونَ (23) هُوَ اللَّهُ الْخَالِقُ الْبَارِئُ الْمُصَوِّرُ لَهُ الْأَسْمَاءُ الْحُسْنَى يُسَبِّحُ لَهُ مَا فِي السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ وَهُوَ الْعَزِيزُ الْحَكِيمُ [الحشر:22-24]

 

উচ্চারণ : হুআল্লা হুল্লাজি লা ইলাহা ইল্লা হুয়া, আলিমুল গাইবী ওয়াশ শাহাদাদি, হুয়ার রাহমানুর রাহিম। হুআল্লা হুল্লাজি লা ইলাহা ইল্লা হুয়াল মালিকুল কুদ্দুসুস সালামুল মু’মিনুল মুহাইমিনুল আজিজুল জাব্বারুল মুতাকাব্বির। ছুবহানাল্লাহি আম্মা য়ুশরিকুন। হুআল্লাহুল খালিকুল বা-রিউল মুছাওয়িরু লাহুল আসমাউল হুসনা। ইউছাব্বিহু লাহু মা ফিস-সামাওয়াতি ওয়াল আরদ্; ওয়া হুয়াল আজিজুল হাকিম।

 

অর্থ : তিনিই আল্লাহ তাআলা, যিনি ব্যতীত কোনো উপাস্য নেই; তিনি দৃশ্য ও অদৃশ্যকে জানেন, তিনি পরম দয়ালু, অসীম দাতা।’ (২২) ‘তিনিই আল্লাহ তিনি ব্যতিত কোনো উপাস্য নেই। তিনিই একমাত্র মালিক, পবিত্র, শান্তি ও নিরাপত্তাদাতা, আশ্রয়দাতা, পরাক্রান্ত, প্রতাপান্বিত, মাহাত্মশীল। তারা যাকে অংশীদার করে আল্লাহ তা' আলা তা থেকে পবিত্র।’ (২৩) ‘তিনিই আল্লাহ তাআলা, স্রষ্টা, উদ্ভাবক, রূপদাতা, উত্তম নামগুলো তারই। নভোমণ্ডলে ও ভূমণ্ডলে যা কিছু আছে, সবই তার পবিত্রতা ঘোষণা করে। তিনি পরাক্রান্ত প্রজ্ঞাময়। (সুরা হাশর, আয়াত : ২৪)


সম্পর্কিত নিউজ