{{ news.section.title }}
১৭৯ আসনে লড়ে কি–২০০ আসনে জেতা যায়! জামায়াত নিয়ে সায়েরের বিস্ফোরক মন্তব্য!
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বিভিন্ন প্রচার-প্রোপাগান্ডা দেখে মনে হয়, 'জামায়াতে ইসলামী যেন ২০০ আসনে জিতবে অথবা ১৫১ আসনে জিতে সরকার গঠন করবে।'
কিন্তু বাস্তবে কি তা সম্ভব? বাস্তবতা হলো, ৩০০ আসনের সংসদ নির্বাচনে জামায়াত প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছে ১৭৯ আসনে। বাকি ১২১ আসনে তাদের দলীয় কোন প্রার্থীই নাই। ১৭৯ আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে ২০০ আসনে জিততে হলে দেখাতে হবে- 'বার হাত কাকুড়ের তের হাত বিঁচি'। আর ১৭৯ আসনে লড়ে ১৫১টি পেতে হলে সাফল্য আনতে হবে ৮৪%-এর বেশি আসনে। বাস্তবতায় হয়তো এর ৫০-৭০% পর্যন্ত অর্জন করা সম্ভব, তবে এটাও বিবেচনায় রাখা উচিত যে যারা ১২.৭ কোটি ভোটারের মাঝে অর্ধেক ভোটারদের প্রতিনিধিত্ব করা নারী ভোটারদের একজনকেও কোন একটি আসনে মনোনয়ন দেয়নি, তাঁদের পক্ষে ঐ ৫০-৭০ এচিভ করাও সৌভাগ্যের ব্যাপার হবে। আর যারা ৩০০ আসনের সবগুলোতেই প্রার্থী দিয়েছেন, তাঁরাও যখন ৫০-৭০% এর মতো অর্জন করবেন, তখন কি হবে? আর প্লাস পয়েন্ট হিসেবে কয়েকজন নারী প্রার্থী তো তাদের আছেই, আর নিকট অতীতে দলটির নারী নেতৃত্বের প্রতিও ভোটারদের সম্মান ও সমর্থন সকলের তুলনায় বেশ এগিয়ে।
জামায়াতের কর্মী-সমর্থকরা হয়তো বলবেন, 'জোট সঙ্গীরা তো লড়ছে আরো ৭২ আসনে।' কিন্তু তাদের মধ্যে ১০ জনও যে জিতবে না, এটা বোঝার জন্য বিশেষজ্ঞ বা বিশ্লেষক হওয়ার কোন দরকার নেই; ন্যূনতম রাজনৈতিক প্রজ্ঞাই যথেষ্ট। এমন বাস্তবতার বিপরিতে দাঁড়িয়ে জামায়াতের যে কর্মী-সমর্থকরা রাষ্ট্রক্ষমতার অবাস্তব স্বপ্ন দেখছেন, তাদের যেসকল কল্পজগতের বাসিন্দা বানিয়েছে কয়েকটি ইউটিউব বিশ্ববিদ্যালয়। ইউটিউব বিশ্ববিদ্যালয় হতে মাস্টার্স-পিএইচডি করা এসকল সমর্থকদের প্রতি পরামর্শ — আশার বেলুন ফুটো হওয়ার কষ্ট সইবার শক্তি অর্জন করুন। তবে প্রশ্ন হলো, ৩০০ আসনের নির্বাচনে জামায়াত কেন মাত্র ১৭৯ আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছে? বাকি ১২১ আসনে তারা প্রার্থী দিল না কেন? জামায়াতের নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোট কেন ৪৯টি আসনে প্রার্থী দিল না? উত্তরটা অনেকের চোখ এড়িয়ে যাচ্ছে বা ইচ্ছে করেই যেন এড্রেস করতে চাইছেন না! বাস্তবতা হলো, প্রায় পাঁচ দশকের দ্বি-দলীয় রাজনৈতিক ব্যবস্থায় জামায়াত কখনোই মূল প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে উঠতে পারেনি। সেই চেষ্টাও তারা করেনি। বটবৃক্ষের মতো বিশাল বিএনপির ছায়ায় থাকতে চেয়েছে। এর পাশাপাশি ১৭ বছর আওয়ামী আঁচলের নিচে সুপ্ত-গুপ্ত রাজনীতি করেছে। তাতে তারা ৩০০ আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতার শক্তি অর্জনে ব্যর্থ হয়েছে।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাস সাক্ষী- জামায়াত '৯১, '৯৬ (জুন) ও ২০০১-এর নির্বাচনে যথাক্রমে ১৮, ৩ ও ১৭ আসনে জিতেছিলো। তার মধ্যে '৯১-এ কিছু আসনে বিএনপির পরোক্ষ সহায়তা নিয়ে এবং ২০০১-এ বিএনপি নেতৃত্বাধীন চার দলীয় জোটের শরিক হয়ে তারা লড়েছিল। এককভাবে নির্বাচন করে '৯৬-এ তাদের অর্জন মাত্র ৩টি আসন। সেখান থেকে এগিয়ে এসে তারা যদি এবার ৫০-৭০টি আসন পায়, সেটাও হবে তাদের বিশাল সাফল্য। এর চেয়ে বেশি কিছুর স্বপ্ন দেখা অলীক কল্পনা ছাড়া কিছু হবে না। কারণ এপর্যন্ত জামায়াত যতগুলো নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেছেন, সবগুলো নির্বাচনে তাদের জয় করা আসন সংখ্যা এক করলেও সেটা ৭০-৭২টির বেশি হবেনা। যাচাই করে দেখতে পারেন। আরো একটি বিষয় নজরে আনতে চাই, ৩০০ আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতার কোন রেকর্ড জামায়াতের ইতিহাসে নেই। '৯১-এর নির্বাচনে তারা লড়েছিল ২২২টি আসনে, যা তাদের ইতিহাসে সর্বোচ্চ। সেবার কিছু আসনে বিএনপির পরোক্ষ সমর্থন পেয়েও তারা জয়ী হয় মাত্র ১৮টি আসনে। আর প্রায় ২০০ আসনে জামায়াতের প্রার্থীদের জামানত বাজেয়াপ্ত হয়। জামায়াতে ইসলামী '৯৬ (জুন)-এর নির্বাচনে এককভাবে ৩৯টি এবং বিএনপি নেতৃত্বাধীন চার দলীয় জোটের শরিক হয়ে ২০০১-এর নির্বাচনে ৩১টি ও ২০০৮-এ ৩৮টি আসনে প্রার্থী দেয়। ২০১৮-এর নির্বাচনে বিএনপির ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে ২৫টি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে। হার-জিত যা-ই হোক, নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতার বিষয়টির আলাদা গুরুত্ব আছে। ভোটে লড়লে নির্বাচনী এলাকায় দল সংগঠিত হয়; কর্মী-সমর্থক বাড়ে।
৩৫ বছর আগে '৯১-এর ব্যর্থ অভিজ্ঞতা ছাড়া কোন নির্বাচনে ৪০টি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতার রেকর্ডও জামায়াতের নেই। আর সে কারণে দেশের বিস্তীর্ণ এলাকায় জামায়াতের শক্তিশালী সংগঠন গড়ে ওঠেনি। কর্মী-সমর্থক তৈরি হয়নি। ভোটারদের কাছেও জামায়াত এবং তার দাঁড়িপাল্লা মার্কার গ্রহণযোগ্যতা তৈরি হয়নি। দুই যুগের বেশি সময় ধরে বিশাল বিএনপির ছায়াতলে থেকে এবং এর পাশাপাশি ১৭ বছর সুপ্ত-গুপ্ত রাজনীতি করায় জামায়াতে ইসলামী একক রাজনৈতিক দল হিসাবে নিজেকে উপস্থাপনে ব্যর্থ হয়েছে। প্রবল এই দুর্বলতার কারণেই তারা এবার ১৭৯টির বেশি আসনে প্রার্থী দিতে পারেনি- যা তাদেরকে রাষ্ট্রক্ষমতা অর্জনের সম্ভাবনা থেকে দূরে ছিটকে ফেলেছে। এবারের ভোটের লড়াইয়ে জামায়াতে ইসলামী মুখোমুখি হয়েছে আরেকটা বড় চ্যালেঞ্জের- তাদের আমীরসহ শীর্ষ নেতাদের জয় নিশ্চিত করা। এই চ্যালেঞ্জ পেরুতে তারা তাদের সারা দেশের উল্লেখযোগ্য সংখ্যক ভোটারকে ২৫টি আসনে মাইগ্রেট করে নিবন্ধিত করেছে। তাতে অবস্থা এমন দাঁড়িয়েছে যে, এই নেতাদের কেউ কেউ নির্বাচনী বৈতরণি পেরুতে পারবেন, কেউবা জামানত বাঁচিয়ে সম্মানজনক অবস্থানে থাকবেন। কিন্তু সেটা করতে গিয়ে জোট শরিকদের আসনে জামায়াতের ভোটার অনেক কমে গেছে। আর তাতেই তীব্র হয়ে উঠেছে জামায়াতের জোট সঙ্গীদের শোচনীয় পরাজয়ের প্রবল শংকা।
সব কিছুর পরও জামায়াতে ইসলামী এবং তাদের প্রচার দলকে ধন্যবাদ। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ব্যাপক প্রোপাগাণ্ডা চালিয়ে তারা এই নির্বাচনকে দৃশ্যতঃ প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ করে তুলেছেন। একপেশে লড়াইয়ের আশংকা দূর করে গ্রহণযোগ্যতা বাড়িয়েছেন। শেষ কথা বলতেই হয়, ফেসবুক-ইউটিউবের লড়াই আর ব্যালটের লড়াইয়ের মাঝে দূস্তর ফারাক। ভোটের ফলাফলে সেটা দৃশ্যমান হয়ে উঠলে মেনে নেয়ার মানসিকতা সবার থাকুক। বিজয়ী ও বিজিত দল পারস্পরিক সহযোগিতায় গণতন্ত্র ও গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে শক্তিশালী করুক। শান্তি ও স্থিতিশীলতা স্থায়ী হোক। দৃঢ়তার সাথে সামনে এগিয়ে যাক প্রিয় বাংলাদেশ।