নির্বাসন থেকে নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান!

নির্বাসন থেকে নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান!
  • Author,
  • Role, জাগরণ নিউজ বাংলা
  • লেখক, Showanur Rahman

লন্ডনে দীর্ঘ ১৭ বছরের নির্বাসিত জীবন কাটিয়ে দেশে ফিরে মাত্র দুই মাসের মাথায় নির্বাচনে ভূমিধস জয় নিয়ে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নিতে যাচ্ছেন বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এটি শুধু ব্যক্তিগত প্রত্যাবর্তন নয় - বরং বাংলাদেশের রাজনীতির ইতিহাসে অন্যতম নাটকীয় ও গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক উত্থান।

তারেক রহমানের রাজনৈতিক উত্তরাধিকার একটি পারিবারিক ইতিহাসের ধারাবাহিকতা। তাঁর বাবা জিয়াউর রহমান ছিলেন বাংলাদেশের সেনাপ্রধান ও রাষ্ট্রপতি, যিনি ১৯৭৮ সালে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) প্রতিষ্ঠা করেন। আর তাঁর মা খালেদা জিয়া তিনবার দেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করে চার দশকের বেশি সময় ধরে বিএনপির নেতৃত্ব দিয়েছেন। সেই রাজনৈতিক উত্তরাধিকার বহন করে এবার ক্ষমতার শীর্ষে উঠছেন তাঁদের সন্তান।

নির্বাসন থেকে রাষ্ট্রক্ষমতার পথে প্রত্যাবর্তন

২০০৭ সালে সেনা-সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় দুর্নীতির অভিযোগে গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে যেতে হয় তারেক রহমানকে। প্রায় ১৮ মাস কারাভোগের পর ২০০৮ সালে মুক্তি পান তিনি। এরপর চিকিৎসার অজুহাতে দেশ ছাড়েন এবং যুক্তরাজ্যে চলে যান। সেই থেকেই শুরু হয় দীর্ঘ নির্বাসিত জীবন।

ওই বছর অনুষ্ঠিত নবম সংসদ নির্বাচনে বিএনপি পরাজিত হয়। এরপরের দেড় দশক বিএনপির জন্য ছিল রাজনৈতিক দুঃসময়ের অধ্যায়। দলীয় নেতাকর্মীরা গ্রেপ্তার, নির্যাতন, গুম এবং মামলার মুখে পড়েছেন; দলীয় কার্যালয় বন্ধ, আন্দোলনে দমন-পীড়ন এবং সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার কারাবাস - সবই বিএনপির ইতিহাসে গভীর সংকটের সময় হিসেবে বিবেচিত হয়।

লন্ডনে নির্বাসিত জীবন কাটানো তারেক রহমান দূরে বসে এসব পরিস্থিতি প্রত্যক্ষ করেছেন এবং দলীয় নেতৃত্বের ভার সামলানোর চেষ্টা করেছেন। প্রবাসে থেকেও তিনি দলীয় নীতি ও কৌশল নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন এবং আন্দোলনের নেতৃত্ব দেন।

দেশে প্রত্যাবর্তন ও রাজনৈতিক পুনর্জাগরণ

২০২৫ সালের ২৫ ডিসেম্বর দীর্ঘ ১৭ বছর পর দেশে ফেরেন তারেক রহমান। ঢাকায় তাঁর প্রত্যাবর্তন উপলক্ষে আয়োজিত জনসমাবেশে লাখো মানুষ অংশ নেয়। সেই জনসমুদ্রে দাঁড়িয়ে তিনি ঘোষণা করেন, “আই হ্যাভ আ প্ল্যান” - মার্টিন লুথার কিং জুনিয়রের ঐতিহাসিক উক্তির আদলে ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার কথা জানান তিনি।

দেশে ফেরার মাত্র পাঁচ দিনের মাথায় তাঁর মা খালেদা জিয়ার মৃত্যু হয়, যা তাঁর ব্যক্তিগত জীবনে বড় ধাক্কা। কিন্তু শোকের মধ্যেই তিনি দলের নেতৃত্বের ভার নেন এবং রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে সক্রিয় হন।

গত ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি দুই-তৃতীয়াংশের বেশি আসনে জয় নিশ্চিত করে। এই নির্বাচনে তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি যে জয় পেয়েছে, তা সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ইতিহাসে অন্যতম বড় প্রত্যাবর্তন হিসেবে দেখা হচ্ছে।

পারিবারিক উত্তরাধিকার ও রাজনৈতিক শেকড়

তারেক রহমানের রাজনৈতিক উত্তরাধিকার তাঁর পরিবারের ইতিহাসের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। তাঁর বাবা জিয়াউর রহমান ছিলেন মুক্তিযুদ্ধে একজন গুরুত্বপূর্ণ সামরিক কমান্ডার এবং স্বাধীনতা ঘোষণার অন্যতম ঘোষক। পরবর্তী সময়ে তিনি রাষ্ট্রপতি হন এবং বিএনপি প্রতিষ্ঠা করেন।

১৯৮১ সালে এক সামরিক অভ্যুত্থানে জিয়াউর রহমান নিহত হওয়ার পর রাজনীতিতে আসেন তাঁর স্ত্রী খালেদা জিয়া। ১৯৯১, ১৯৯৬ ও ২০০১ সালে তিনি সরকার গঠন করেন এবং দীর্ঘদিন বিএনপির নেতৃত্ব দেন।

তারেক রহমান জন্মগ্রহণ করেন ১৯৬৭ সালের ২০ নভেম্বর। শৈশব ও কৈশোর কাটে ঢাকায়। ঢাকার বিএএফ শাহীন কলেজে পড়াশোনা শেষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগে ভর্তি হন, তবে ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ডে যুক্ত হওয়ায় পড়াশোনা শেষ করেননি।

১৯৮৮ সালে তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে বিএনপির সদস্য হন এবং পরবর্তীতে ধীরে ধীরে দলীয় রাজনীতিতে সক্রিয় হয়ে ওঠেন। এরশাদবিরোধী আন্দোলনে মায়ের সঙ্গে রাজপথে অংশগ্রহণ করেন এবং ২০০১ সালের পর দলের কেন্দ্রীয় নেতৃত্বে উঠে আসেন।

হাওয়া ভবন, বিতর্ক ও অভিযোগ

২০০১ সালে বিএনপি ক্ষমতায় এলে তারেক রহমান দলের সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব হন এবং রাজনীতিতে প্রভাবশালী নেতা হিসেবে পরিচিতি লাভ করেন। ঢাকার ‘হাওয়া ভবন’ থেকে দলীয় সিদ্ধান্ত ও প্রশাসনিক কর্মকাণ্ডে প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ ওঠে তাঁর বিরুদ্ধে।

বিরোধী দলগুলো অভিযোগ করে যে, সে সময় ‘সমান্তরাল সরকার’ পরিচালিত হয়েছিল এবং দুর্নীতির বিস্তার ঘটেছিল। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনালের দুর্নীতি সূচকে বাংলাদেশের অবস্থানও সে সময় সমালোচনার মুখে পড়ে।

তবে তারেক রহমান এসব অভিযোগ বরাবরই অস্বীকার করেছেন এবং আদালতে কোনো অভিযোগ প্রমাণিত হয়নি বলে দাবি করেন।

গ্রেপ্তার, মামলা ও নির্বাসিত জীবন

২০০৭ সালের ৭ মার্চ সেনা নিয়ন্ত্রিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় জরুরি অবস্থার মধ্যে যৌথ বাহিনী তারেক রহমানকে গ্রেপ্তার করে। তাঁর বিরুদ্ধে একাধিক মামলা দায়ের করা হয় এবং নির্যাতনের অভিযোগ ওঠে।

কারাগারে গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়লে তাঁকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। পরে জামিনে মুক্তি পেয়ে ২০০৮ সালে লন্ডনে চলে যান।

পরবর্তী সময়ে তাঁর বিরুদ্ধে আরও বহু মামলা ও সাজা হয়। গ্রেনেড হামলার মামলায় যাবজ্জীবন কারাদণ্ডসহ একাধিক রায় হয় তাঁর বিরুদ্ধে। হাইকোর্ট তাঁর বক্তব্য প্রচারে নিষেধাজ্ঞাও দেয়।

কিন্তু ২০২৪ সালে রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর এসব মামলায় তিনি খালাস পান, যা দেশে ফেরার পথ খুলে দেয়।

নতুন রাজনৈতিক কৌশল ও নেতৃত্বের রূপান্তর

লন্ডনে দীর্ঘ নির্বাসন তারেক রহমানকে রাজনৈতিকভাবে আরও ধীরস্থির ও সহনশীল করেছে বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা। দেশে ফেরার পর তিনি নিজেকে একজন রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা করেন।

তিনি প্রতিশোধের রাজনীতি থেকে সরে এসে শান্তি ও স্থিতিশীলতার আহ্বান জানান। নির্বাচনি প্রচারে তরুণদের সঙ্গে সংলাপ করেন এবং গণতন্ত্র, জবাবদিহিতা ও অন্তর্ভুক্তিমূলক রাজনীতির ওপর গুরুত্ব দেন।

তার নির্বাচনি স্লোগান ছিল “সবার আগে বাংলাদেশ।” নির্বাচনি প্রচারে তাঁর পোশাক ও স্টাইল সামাজিক মাধ্যমে আলোচিত হয়।

ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা ও প্রতিশ্রুতি

নির্বাচনি ইশতেহারে তিনি দুর্নীতি দমন, আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণ, অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও গণতান্ত্রিক সংস্কারের প্রতিশ্রুতি দেন।

নির্বাচনের পর প্রথম সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, শান্তি ও শৃঙ্খলা বজায় রাখা হবে সরকারের প্রধান অগ্রাধিকার। দল-মত নির্বিশেষে দুর্বলদের ওপর অন্যায় মেনে নেওয়া হবে না।

তিনি আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার ওপর গুরুত্ব দিয়ে বলেন, সরকারি দল কিংবা বিরোধী দল - সব নাগরিকের জন্য আইন সমান হতে হবে।

বাংলাদেশের রাজনীতিতে নতুন অধ্যায়

বিশ্লেষকদের মতে, তারেক রহমানের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ বাংলাদেশের রাজনীতিতে দ্বিমেরুকরণের দীর্ঘ ইতিহাসে নতুন অধ্যায়ের সূচনা করতে পারে।

একদিকে তাঁর সামনে রয়েছে দীর্ঘদিনের বিতর্ক ও অভিযোগের ছায়া, অন্যদিকে রয়েছে গণতন্ত্র, উন্নয়ন ও স্থিতিশীলতার প্রত্যাশা।

নির্বাসন থেকে ক্ষমতার শীর্ষে পৌঁছানো তারেক রহমানের এই যাত্রা শুধু একটি রাজনৈতিক পরিবারের গল্প নয় - এটি বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়, যা আগামী বছরগুলোতে দেশের ভবিষ্যৎ রাজনীতির গতিপথ নির্ধারণে বড় ভূমিকা রাখবে।


সম্পর্কিত নিউজ