{{ news.section.title }}
কেন ভয়ের সময় হাত ধরলে হৃদস্পন্দন শান্ত হয়? কম্পানিয়ন বাফারিং এফেক্ট জানুন!
অপারেশন থিয়েটারের বাইর অস্থির প্রতীক্ষা, কোনো প্রিয়জনের দুর্ঘটনার খবর, কিংবা জীবনের সবচেয়ে কঠিন ইন্টারভিউ!-এমন মুহূর্তে আমরা প্রায়ই কারো হাত শক্ত করে ধরে রাখতে চাই। আশ্চর্যের বিষয় হলো, শুধুমাত্র সেই হাতের স্পর্শেই অবিশ্বাস্যভাবে কমে আসে বুকের ধড়ফড়ানি, স্থির হয়ে আসে বিক্ষিপ্ত মন। এটি শুধুমাত্র কোনো আবেগীয় সান্ত্বনা নয়। চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় এর নাম কম্প্যানিয়ন বাফারিং ইফেক্ট। আমাদের প্রিয় মানুষের উপস্থিতি কীভাবে শরীরের ভেতরে এক অদৃশ্য বর্ম তৈরি করে স্ট্রেসের ঢেউ রুখে দেয়, তা সত্যিই খুবই বিস্ময়কর।
মস্তিষ্কের অদৃশ্য বর্ম, অ্যামিগডালার শান্ত হওয়া!
মস্তিষ্কের স্ক্যানিং প্রযুক্তি (fMRI) ব্যবহার করে দেখা গেছে, মানুষ যখন কোনো বড় হুমকির সম্মুখীন হয়, তখন তার মস্তিষ্কের অ্যামিগডালা,যা মূলত ভয়ের কেন্দ্র সেটি অতি-সক্রিয় হয়ে ওঠে। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হলো, সেই মুহূর্তে প্রিয় কেউ পাশে থাকলে, তার হাত স্পর্শ করলে অ্যামিগডালার এই সক্রিয়তা নাটকীয়ভাবে কমতে শুরু করে। অর্থাৎ, মস্তিষ্ক সেই হুমকিকে তখন কম বিপজ্জনক বলে মনে করে।
প্রিয় মানুষের স্পর্শে শরীরে নিঃসৃত হয় অক্সিটোসিন, যা লাভ হরমোন নামেও বেশ পরিচিত। এই হরমোন ভয়ের প্রতিক্রিয়া কমিয়ে দেয় এবং শরীরের প্যারাসিমপ্যাথেটিক স্নায়ুতন্ত্রকে সক্রিয় করে। এটি হৃৎস্পন্দন কমায়, রক্তচাপ স্বাভাবিক করে এবং শরীরকে দ্রুত শান্ত অবস্থায় ফিরিয়ে নিয়ে আসে।
সোশ্যাল বেসলাইন থিওরি:
বিবর্তনীয় তত্ত্ব অনুযায়ী, আমাদের মস্তিষ্ক সামাজিক উপস্থিতিকে স্বাভাবিক অবস্থা বা বেসলাইন হিসেবে ধরে নেয়। দলগতভাবে থাকা আমাদের টিকে থাকার মূলমন্ত্র ছিল। তাই যখন আমরা একা থাকি, মস্তিষ্ক বাড়তি শক্তি ব্যয় করে সম্ভাব্য বিপদ মোকাবিলায়। আর যখন কেউ পাশে থাকে, মস্তিষ্ক সেই চাপ ভাগ করে নেয়, যা মানসিক স্থিতিস্থাপকতা বা Resilience বাড়ায়।
সব সম্পর্ক কি সমান কার্যকর?
এখানে রয়েছে একটি সূক্ষ্ম এবং গুরুত্বপূর্ণ শর্ত। বাফারিং ইফেক্ট কেবল তখনই কাজ করে যখন সম্পর্কের মধ্যে বিশ্বাস ও নিরাপত্তা থাকে। যদি সম্পর্কের মধ্যে দ্বন্দ্ব বা অবিশ্বাস থাকে, তবে সেই ব্যক্তির উপস্থিতি হিতে বিপরীত হতে পারে, যাকে বলা হয় স্ট্রেস অ্যামপ্লিফিকেশন। অর্থাৎ, অশান্তির সম্পর্ক চাপ না কমিয়ে উল্টো আরো বাড়িয়ে দেয়।
ডিজিটাল উপস্থিতি নাকি শারীরিক স্পর্শ!
বর্তমান যুগে আমরা ফোন কল বা ভিডিও কলেই সব কথা সেরে ফেলি। কিছু ক্ষেত্রে প্রিয় কণ্ঠস্বর শোনা কর্টিসল কমাতে সাহায্য করলেও, শারীরিক স্পর্শের, যেমন হাত ধরা বা আলিঙ্গনের নেই কোনে বিকল্প। স্পর্শের স্নায়ুবৈজ্ঞানিক পথ সরাসরি মস্তিষ্কের আবেগকেন্দ্রের সঙ্গে সংযুক্ত, যা অক্সিটোসিন নিঃসরণে অধিক কার্যকর।
একটি শিশু যখন ভয় পায়, তার অভিভাবকের স্পর্শ তার স্নায়ুতন্ত্রকে স্থিতিশীল করতে শেখায়। একে বলা হয় সিকিউর অ্যাটাচমেন্ট। যেসব শিশু নিয়মিত এমন নিরাপত্তা পায়, ভবিষ্যতে তারা বড় ধরনের মানসিক চাপ মোকাবিলায় অন্যদের চেয়ে বেশি দক্ষ হয়ে বেড়ে ওঠে।
বিজ্ঞান যত এগোচ্ছে, দিন দিন ততই স্পষ্ট হচ্ছে যে সুস্থ সম্পর্কের ভেতরেই লুকিয়ে আছে মানুষের সুস্থতার চাবিকাঠি। হাত ধরা বা একটি নীরব উপস্থিতি কেবল সান্ত্বনাই নয়, এটি আমাদের কোষ, হরমোন এবং স্নায়ুতন্ত্রকে একটি ভরসার বার্তা দেয়।