চাকরি পেতে লাগে IQ, কিন্তু প্রমোশন পেতে লাগে EQ!

চাকরি পেতে লাগে IQ, কিন্তু প্রমোশন পেতে লাগে EQ!
  • Author,
  • Role, জাগরণ নিউজ বাংলা
  • লেখক, Md Ibrahim Sakib

আমরা যখন সাফল্যের কথা বলি, তখন আমাদের চোখের সামনে ভেসে ওঠে গণিত বা বিজ্ঞানের জটিল জটিল সব সমস্যা সমাধানের দক্ষতা, যাকে আমরা বলি IQ। কিন্তু আমাদের বাস্তব জীবন যখন সম্পর্কের টানাপোড়েন, কর্মক্ষেত্রের রাজনীতি কিংবা নেতৃত্বের কঠিন পরীক্ষার মুখোমুখি দাঁড় করায়, তখন তথাকথিত বুদ্ধি বেশিরভাগ সময়ই হার মেনে যায়। সেখানে জিতে যায় সেই মানুষটি, যিনি নিজের রাগ নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন এবং অন্যের নীরবতার ভাষা পড়তে পারেন। এটি কেবলমাত্র ভালো মানুষ হওয়ার গুণ নয়, এটি জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে টিকে থাকার এবং এগিয়ে যাওয়ার এক শক্তিশালী হাতিয়ারও বটে।

আবেগীয় বুদ্ধিমত্তা কী?
আবেগীয় বুদ্ধিমত্তা (Emotional Intelligence) হলো এমন এক মানসিক সক্ষমতা, যার মাধ্যমে একজন ব্যক্তি নিজের আবেগ চিনতে ও নাম দিতে পারে। আবার সেই আবেগের উৎস ও প্রভাব বুঝতে পারে। আবেগকে নিয়ন্ত্রণ বা গঠনমূলকভাবে ব্যবহারও করতে পারে। অন্যের আবেগ শনাক্ত করে সহমর্মিতার সঙ্গে প্রতিক্রিয়াও জানাতে পারে। অর্থাৎ, EI মানে হলো আবেগকে বুঝে সচেতনভাবে পরিচালনা করা।

মানুষের মস্তিষ্কের ভিতর আবেগ ও যুক্তির জন্য রয়েছে আলাদা আলাদা অঞ্চল। অ্যামিগডালা মূলত ভয় ও হুমকির প্রতিক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত, আর প্রিফ্রন্টাল কর্টেক্স সিদ্ধান্ত নেওয়া, পরিকল্পনা ও আত্মনিয়ন্ত্রণের সঙ্গে সম্পর্কিত। যখন কেউ রাগে হঠাৎ চিৎকার করে ফেলে, তখন অনেক সময় অ্যামিগডালার প্রতিক্রিয়া প্রিফ্রন্টাল কর্টেক্সের নিয়ন্ত্রণকে ছাপিয়ে যায়। একে বলে অ্যামিগডালা হাইজ্যাক।

উচ্চ আবেগীয় বুদ্ধিমত্তাসম্পন্ন ব্যক্তি এই হাইজ্যাকের মুহূর্তে থেমে যেতে পারে। সে বুঝতে পারে,সে রেগে আছে, বা কথাটি তাকে আঘাত করেছে, সে বুঝতে পারে যে সে প্রতিক্রিয়া দিলে, পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে পারে। এই সচেতন বিরতি নেওয়ার ক্ষমতা মূলত প্রিফ্রন্টাল কর্টেক্সের কার্যকর সক্রিয়তার ফল। অর্থাৎ EI হলো মস্তিষ্কের আবেগকেন্দ্র ও যুক্তিকেন্দ্রের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষার দক্ষতা।

Emotional Intelligence-এর প্রধান উপাদান:
মনোবিজ্ঞানের আলোচনায় EI সাধারণত পাঁচটি মূল উপাদানে ভাগ করা হয়ে থাকে। যেমন:

১. আত্ম-সচেতনতা :নিজের আবেগ, শক্তি, দুর্বলতা ও মানসিক প্রবণতা সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা থাকা। এটি EI-এর ভিত্তি।

২. আত্ম-নিয়ন্ত্রণ: হঠাৎ আবেগের বশে সিদ্ধান্ত না নেওয়া, ধৈর্য ধরে প্রতিক্রিয়া দেওয়া।

৩.অভ্যন্তরীণ প্রেরণা: বাহ্যিক পুরস্কারের চেয়ে ভেতরের লক্ষ্য ও মূল্যবোধ দ্বারা চালিত হওয়া।

৪.সহমর্মিতা: শুধু কথায় নয়, অঙ্গভঙ্গি ও আচরণেও অন্যের অনুভূতি উপলব্ধি করা।

৫. সামাজিক দক্ষতা: সম্পর্ক গড়ে তোলা, দ্বন্দ্ব মেটানো, দল পরিচালনা করা।

এই পাঁচটি উপাদান মিলেই গড়ে ওঠে পূর্ণাঙ্গ Emotional Intelligence।

কর্মক্ষেত্রে EI:

আধুনিক কর্মক্ষেত্রে দেখা গেছে, শুধুমাত্র প্রযুক্তিগত দক্ষতাই যথেষ্ট নয়। একজন দক্ষ নেতা দলের সদস্যদের আবেগ বুঝতে পারে, চাপের সময় স্থির থাকে, মতভেদে সংলাপ তৈরি করতে পারে। গবেষণায় দেখা যায়, যেসব সংগঠনে নেতাদের EI উচ্চ, সেখানে কর্মীদের সন্তুষ্টি ও উৎপাদনশীলতা বেশি। কারণ, আবেগ সংক্রামক। নেতার শান্ত মনোভাব দলকে স্থিতিশীল করে, আর নেতার উত্তেজনা পুরো পরিবেশকে অস্থির করে তুলতে পারে। Emotional Intelligence সেখানে একটি প্রাতিষ্ঠানিক সম্পদে পরিণত হয়।

শিক্ষা ও পরিবারে EI:
শিশুরা জন্মগতভাবে আবেগ নিয়ে জন্মালেও, সেগুলো চেনা ও প্রকাশের ভাষা শেখে পরিবার ও পরিবেশ থেকে। যদি কোনো শিশুকে বলা হয়,!কাঁদবে না”, "জেদ করা ভালো নয়", বা “রাগ করা খারাপ”! তবে সে আবেগ দমন করতে শেখে, কিন্তু বুঝতে শেখে না। বিপরীতে, যদি বলা হয়,“তুমি রেগে গেছ, ঠিক আছে, কিন্তু আমরা শান্তভাবে কথা বলব”,তবে সে আবেগ নিয়ন্ত্রণের স্বাস্থ্যকর পদ্ধতি শেখে। স্কুল পর্যায়ে EI উন্নয়নের উদ্যোগ শিশুদের সামাজিক দক্ষতা, আত্মবিশ্বাস ও মানসিক স্থিতিশীলতা বাড়াতে সাহায্য করতে পারে।

EI কি জন্মগত, নাকি শেখা যায়?
একসময় মনে করা হতো বুদ্ধিমত্তা মূলত স্থির। কিন্তু এখন বোঝা গেছে, Emotional Intelligence অনেকাংশেই অনুশীলনযোগ্য। আত্ম-পর্যবেক্ষণ, সচেতন শ্বাসপ্রশ্বাস, প্রতিক্রিয়ার আগে বিরতি নেওয়া, সহমর্মিতার চর্চা ইত্যাদির মাধ্যমে EI উন্নত করা সম্ভব। মস্তিষ্কের নিউরোপ্লাস্টিসিটি অর্থাৎ অভিজ্ঞতার মাধ্যমে স্নায়ুবিক সংযোগ বদলানোর ক্ষমতা এখানে গুরুত্বপূর্ণ। নিয়মিত সচেতন অনুশীলনে আবেগ নিয়ন্ত্রণের সঙ্গে যুক্ত স্নায়ুপথ শক্তিশালী হয়।

EI-এর অভাব:  
নিম্ন Emotional Intelligence থাকলে ব্যক্তি সহজেই উত্তেজিত হয়ে যেতে পারে, সম্পর্ক টিকিয়ে রাখতে সমস্যা হতে পারে, কর্মক্ষেত্রে দ্বন্দ্ব বাড়তে পারে। দীর্ঘমেয়াদে এটি মানসিক চাপ ও একাকিত্বের ঝুঁকিও বাড়াতে পারে। তবে এটি কোনো স্থায়ী লেবেল নয়। সচেতন চর্চার মাধ্যমে পরিবর্তন সম্ভব।

ডিজিটাল যুগে EI-এর নতুন চ্যালেঞ্জ!
ডিজিটাল যোগাযোগে মুখের অভিব্যক্তি, কণ্ঠের ওঠানামা অনুপস্থিত থাকে। ফলে সহজেই ভুল বোঝাবুঝি হয়। ইমোজি দিয়ে আবেগ প্রকাশের চেষ্টা হলেও তা বাস্তব সহমর্মিতার বিকল্প নয়। তাই অনলাইন যুগে Emotional Intelligence আরও বেশি প্রয়োজন। কথা লেখার আগে ভাবা, অন্যের অবস্থান বোঝার চেষ্টা করা, দ্রুত প্রতিক্রিয়া না দেওয়া।

Emotional Intelligence কোনো বিলাসিতা নয়। এটি মানসিক সুস্থতা ও সামাজিক সাফল্যের ভিত্তি। আবেগকে অস্বীকার করা নয়, বরং তাকে স্বীকৃতি দিয়ে সচেতনভাবে পরিচালনা করাই এর মূল কথা। একজন উচ্চ EI-সম্পন্ন মানুষ রাগ অনুভব করেও সম্পর্ক ভাঙে না, দুঃখ পেয়ে নিজেকে গুটিয়ে নেয় না, আনন্দে আত্মহারা হয়ে দায়িত্ব ভুলে যায় না। সে জানে সঠিকভাবে ব্যবহার করলে আবেগই হয়ে উঠতে পারে প্রজ্ঞার পথপ্রদর্শক।


সম্পর্কিত নিউজ