{{ news.section.title }}
আকাশে বিদ্যুৎ, কানে দেরিতে বাজে ধ্বনি! বজ্রপাতের শব্দ কেন পরে শোনা যায়?
কালো মেঘে ঢেকে গেছে আকাশ। হঠাৎ ঝলকে উঠল তীব্র সাদা আলো, মুহূর্তের মধ্যে চারপাশ হয়ে উঠলো আলোকিত। আর সেই আলোর কয়েক সেকেন্ড পর কাঁপিয়ে দেওয়া বজ্রধ্বনি এসে লাগলো কানে। প্রশ্নটা তাই স্বাভাবিক,একই ঘটনায় আলো আগে আর শব্দ পরে কেন?
এর উত্তর লুকিয়ে আছে গতি, তাপ, এবং বায়ুর ভেতরে সৃষ্ট তীব্র বিস্ফোরণের পদার্থবিজ্ঞানে।
বজ্রপাত আসলে কী?
বজ্রপাত হলো মেঘের ভেতরে বা মেঘ ও মাটির মধ্যে সৃষ্ট বিশাল বৈদ্যুতিক স্রাব। ঝড়ো মেঘের মধ্যে বরফকণা, জলকণা ও বায়ুর ঘর্ষণে বৈদ্যুতিক চার্জ জমে। একসময় এই চার্জের পার্থক্য এত বেশি হয়ে যায় যে বায়ু আর নিরোধক হিসেবে কাজ করতে পারে না। তখনই ঘটে আকস্মিক বিদ্যুৎ স্রাব, যাকে আমরা সাধারণত বজ্রপাত হিসেবে দেখি। এই স্রাবের সময় তাপমাত্রা কয়েক হাজার থেকে প্রায় ত্রিশ হাজার ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে, যা সূর্যের পৃষ্ঠের তাপমাত্রার প্রায় কাছাকাছি। এত তীব্র তাপে আশপাশের বায়ু হঠাৎ প্রসারিত হয়।
বজ্রধ্বনি কীভাবে তৈরি হয়?
বজ্রপাতের সময় বায়ু মুহূর্তে উত্তপ্ত হয়ে দ্রুত প্রসারিত হয়। এই আকস্মিক প্রসারণ আশপাশের বায়ুকে ধাক্কা দেয় এবং তৈরি করে শকওয়েভ বা চাপ তরঙ্গ। এই চাপ তরঙ্গই শব্দতরঙ্গ হিসেবে ছড়িয়ে পড়ে, যাকে আমরা বজ্রধ্বনি বলে থাকি। অর্থাৎ, বজ্রধ্বনি আলাদা কোনো ঘটনা নয়। এটি বজ্রপাতের তাপীয় বিস্ফোরণের সরাসরি ফল।
এখন আসল প্রশ্নে আসা যাক,আলো আগে আর শব্দ পরে কেন?
এর কারণ অত্যন্ত সরল, কিন্তু বৈজ্ঞানিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ। আলোর গতি প্রতি সেকেন্ডে প্রায় ৩ লাখ কিলোমিটার। পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলের ভেতরে এই গতি সামান্য কমলেও তা এখনও অবিশ্বাস্যভাবে দ্রুত। অন্যদিকে, শব্দের গতি বায়ুতে প্রতি সেকেন্ডে গড়ে প্রায় ৩৪০ মিটার। অর্থাৎ, আলোর গতি শব্দের তুলনায় প্রায় এক মিলিয়ন গুণ বেশি। যদি বজ্রপাত আপনার থেকে এক কিলোমিটার দূরে ঘটে, তবে আলো প্রায় তাৎক্ষণিকভাবে আপনার চোখে পৌঁছাবে। কিন্তু শব্দকে সেই এক কিলোমিটার পথ পাড়ি দিতে প্রায় ৩ সেকেন্ড সময় লাগবে। এই সময়ের ব্যবধানই আমাদের চোখে আগে আলো,আর পরে শব্দ হিসেবে ধরা পড়ে।
কীভাবে সময় গুনে দূরত্ব মাপা যায়?
বজ্রপাত দেখার পর থেকে বজ্রধ্বনি শোনা পর্যন্ত সেকেন্ড গুনে বজ্রপাত কত দূরে হয়েছে তা অনুমান করা যায়। সাধারণভাবে, প্রতি ৩ সেকেন্ডে শব্দ প্রায় ১ কিলোমিটার পথ অতিক্রম করে। ধরা যাক, আপনি আলো দেখার ৬ সেকেন্ড পরে শব্দ শুনতে পেলেন। তাহলে বজ্রপাত আনুমানিক ২ কিলোমিটার দূরে হয়েছে। এই পদ্ধতিটিনিখুঁত নয়, কারণ তাপমাত্রা ও বায়ুচাপের ওপর শব্দের গতি কিছুটা পরিবর্তিত হতে পারে। তবে এটি আনুমানিক ধারণা দেয়।
সব বজ্রধ্বনি একরকম নয় কেন?
কখনও বজ্রধ্বনি হয় তীব্র ও হঠাৎ। আবার কখনও দীর্ঘ গর্জনের মতো শোনা যায়। এর কারণ বজ্রপাতের দৈর্ঘ্য ও প্রতিফলন। বজ্রপাত সাধারণত সরলরেখা নয়। এটি আঁকা বাঁকা ও শাখাবিশিষ্ট হতে পারে। বজ্রধ্বনি এই পুরো দৈর্ঘ্য বরাবর তৈরি হয়। ফলে বিভিন্ন অংশের শব্দ বিভিন্ন সময় কানে পৌঁছায়। এর ফলে তৈরি হয় দীর্ঘ গর্জন। এছাড়া পাহাড়, ভবন বা মেঘ থেকে প্রতিফলিত হয়ে শব্দ আরও দেরিতে কানে পৌঁছাতে পারে, যা বজ্রধ্বনিকে আরও দীর্ঘায়িত করে।
বায়ুর অবস্থা ও শব্দের গতি:
শব্দের গতি তাপমাত্রার ওপর নির্ভর করে। উষ্ণ বায়ুতে শব্দ দ্রুত চলে, ঠান্ডা বায়ুতে ধীর। তাই শীতকালে ও গ্রীষ্মকালে বজ্রধ্বনির সময় ব্যবধান সামান্য ভিন্ন হতে পারে। বায়ুর আর্দ্রতা ও বাতাসের দিকও শব্দের পথকে প্রভাবিত করতে পারে। বাতাস যদি আপনার দিকেই বইতে থাকে, তাহলে শব্দ কিছুটা দ্রুত শোনা যেতে পারে।
আলো ও শব্দের গতির এই পার্থক্য শুধু বজ্রপাত বোঝার জন্যই নয়। এটি পদার্থবিজ্ঞানের মৌলিক নীতির অংশ। আলোর গতি হলো মহাবিশ্বের সর্বোচ্চ গতি সীমা। অন্যদিকে, শব্দ কোনো মাধ্যম ছাড়া চলতে পারে না। শূন্য মহাশূন্যে শব্দ নেই, কিন্তু আলো আছে। তাই বজ্রপাতের ক্ষেত্রে আমরা একই ঘটনার দুই ভিন্ন প্রকৃতির তরঙ্গের ফল দেখি। একটি তড়িৎচৌম্বক তরঙ্গ (আলো), অন্যটি যান্ত্রিক তরঙ্গ (শব্দ)।
নিরাপত্তা:
যদি আলো দেখার ৩০ সেকেন্ডের কম সময়ের মধ্যে বজ্রধ্বনি শোনা যায়, তবে বজ্রপাত ১০ কিলোমিটারের ভেতরে হয়েছে, এটি বিপজ্জনক দূরত্ব। এমন অবস্থায় খোলা মাঠ, উঁচু গাছ বা ধাতব বস্তু থেকে দূরে থাকা জরুরি। বজ্রপাতের শব্দ শোনা মানেই আপনি ঝড়ের ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় রয়েছেন।