{{ news.section.title }}
হাওলাদার থেকে হাসনাত, ৫৩ বছর পর সংসদে পুণরায় ড্রেসকোড বিতর্ক!
❝লুঙ্গি পড়ি এটা জেনেই তো আমাকে নমিনেশন দেওয়া হয়েছে। এখন এমপি হওয়ার পর আমাকে কেন প্যান্ট পরতে হবে? আমার শ্রমিকেরা যতোদিন প্যান্ট পরার উপযুক্ত না হবেন ততোদিন আমি লুঙ্গি ছাড়ছিনা❞
উপরের উক্তিটি থেকে এতোক্ষণে বুঝতে পেরেছেন কি বিষয়ে আমরা জানতে চলেছি। চলুন আগে পরিচয় জেনে আসি হাওলাদার ও হাসনাতের। মোকিম হোসাইন হাওলাদার, বরিশালের ঝালকাঠি জেলার নলছিটি উপজেলার মোল্লারহাট ইউনিয়নে জন্মগ্রহণ করেন।মোকিম হোসাইন হাওলাদার বাংলাদেশের ঝালকাঠি জেলার রাজনীতিবিদ, মুক্তিযুদ্ধা ও তৎকালীন বরিশাল-৬ (বাকেরগঞ্জ-৬) আসনের সাবেক সংসদ সদস্য।১৯৭৩ থেকে ১৯৭৫ সাল পর্যন্ত সংসদ সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন তিনি।
আসুন এবার পরিচয় হই গণঅভ্যুত্থানের পরিচিত মুখ, স্বৈরাচার হাসিনার পতন ঘটানোর অন্যতম নায়কদের একজন হাসনাত আব্দুল্লাহ।মোঃ আবুল হাসনাত যিনি হাসনাত আবদুল্লাহ নামে পরিচিত। হলেন একজন বাংলাদেশি ছাত্রনেতা ও ২০২৪ কোটা সংস্কার- বৈষম্য বিরোধী ছাত্র আন্দোলনে নেতৃত্ব দেওয়া ছাত্রনেতা।ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে কুমিল্লা-৪ আসনে ভূমিধ্বস বিজয় অর্জনকারী ছাত্রনেতা হাসনাত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের মেধাবী শিক্ষার্থী। পরিচয় শেষে এবার চলুন মুল আলোচনায় ফেরা যাক।ত্রয়োদশ নির্বাচনে হাসনাত আব্দুল্লাহ কুমিল্লা থেকে জয়লাভ করে আজ শপথ গ্রহণ করেছেন সংসদ সদস্য হিসেবে।বাকী ২৯৬ জন সংসদ সদস্য গতানুগতিকভাবে আসলেও হাসনাত আব্দুল্লাহ শপথপাঠের অনুষ্ঠানে হাজির হন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের লোগো সমেত এলটি টিশার্ট গায়ে।টিশার্টে লেখা 'ENGLISH'। সচারাচর সংসদে সবাইকে অফিসিয়াল ড্রেসকোডেই দেখা যায়।ভিন্ন এক ড্রেসকোডে শপথ গ্রহণ করার বিষয়টি আজ দিনভর সোশাল মিডিয়ায় আলোচনার বিষয়ছিলো।নেটিজেনরা বিষয়টি সুন্দরভাবেই দেখছে আজ,হয়নি কোনো নেগেটিভ আলোচনা-সমালোচনা।
এই টিশার্ট পড়েই কেনো সংসদে এলো হাসনাত আব্দুল্লাহ? জুলাই অভ্যুত্থান চলাকালীন সময়ে পুরোটা সময়ে হাসনাত আব্দুল্লাহকে এই একটি টিশার্ট গায়ে দেখা যায় ২০২৪ সালের সেইসময়কার সকল ফুটেজে।

স্বৈরাচার হাসিনা পালিয়ে যাওয়ার পর হাসনাত আব্দুল্লাহর এই টিশার্টটি দেশব্যাপী জনপ্রিয় হয়ে উঠে।সরকার পতনের পর রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ অনেক আয়োজনে গতানুগতিক পোশাকের বাহিরে হাসনাত আব্দুল্লাহকে এই টিশার্ট গায়ে উপস্থিত হতে দেখা যায়।ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংলিশ ডিপার্টমেন্টের যারা এই টিশার্টটি পূর্বে বানিয়েছিলো, তারা পরবর্তীতে এটির রিমেক করতে থাকে জনগণের চাহিদা অনুযায়ী।তরুণ এই ছাত্রনেতার সংসদে যাওয়ার ইতিহাসের সাথে এই টিশার্টটি জড়িয়ে আছে গভীরভাবে।গতোকাল শপথগ্রহণের পূর্বে থেকেই সোশাল মিডিয়ায় আলোচনা হতে থাকে হাসনাত আব্দুল্লাহ আগামীকাল কোন পোশাক পড়ে সংসদে শপথগ্রহণ অনুষ্ঠানে উপস্থিত হবেন? নেটিজেন,সহপাঠী, সহযোদ্ধারা সোশাল মিডিয়াতে লিখতে থাকে এবং হাসনাত আব্দুল্লাহকে আহবান জানান যে আলোচিত সেই টিশার্টটি পড়েই যাতে তিনি সংসদে শপথগ্রহণে উপস্থিত হয়! সকলের চাওয়া পুরণে হাসনাত আব্দুল্লাহ আজ সেই বিখ্যাত টিশার্ট পড়েই শপথগ্রহণ করেন।

চলুন আজ থেকে আরো ৫৩ বছর আগের একজনের সংসদে লুঙ্গি গেঞ্জি পড়ার বর্ণনা জেনে আসি। মোকিম হোসাইন হাওলাদার ১৯৭৩ সালে বরিশাল-৬ আসনে বাংলাদেশ আওয়ামিলীগ থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়ে সংসদে আসেন।মোকিম হোসাইন হাওলাদার ছিলেন শ্রমিক নেতা,পাটকল শ্রমিক নেতা।হাওলাদার ছিলেন খুলনা অঞ্চলের পাটকলের শ্রমিক। মুক্তিযুদ্ধও করেছেন। নিজেকে পরিচয় দিতেন ‘আলহা’ হিসেবে। আলহা মানে নিরক্ষর। এটা নিয়ে তার কোন অস্বস্তি ছিল না। কোন রকমে ‘মকিম’ লিখে স্বাক্ষর করতে পারতেন, সেটাও তার স্ত্রী ঘষে ঘষে শিখিয়েছিলেন। নির্বাচনে বিজয়লাভ করার পরে বিশালদেহী হাওলাদার সংসদে লুঙ্গি আর গেঞ্জি পড়ে যাওয়া শুরু করলেন।প্রথমে বিষয়টি কেও আমলে না নিলেও ধীরে ধীরে কিছু সংসদ সদস্য বিষয়টি নিয়ে আপত্তি জানাতে শুরু করলেন কানাঘুষাও করতে আড়ালে।
এক পর্যায়ে বিষয়টি সংসদে অফিসিয়ালি আলোচিত হল। একজন এমপি পয়েন্ট অব অর্ডারে দাঁড়িয়ে সংসদে ড্রেসকোডের বিষয়টি তুললেন, সংসদের মতো রাাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় লুঙ্গি পরে আসা যায় কী না সেই প্রশ্নও রাখলেন।সংসদ নেতা তখন শেখ মুজিবুর রহমান।লুঙ্গির বিষয়টি নিয়ে অফিসিয়ালি প্রশ্ন ওঠার পর মকিম হাওলাদারও ছেড়ে কথা বললেন না। সংসদ নেতার উদ্দেশ্যে মকিম হাওলাদার বললেন, তিনি লুঙ্গি পড়েন এটা জেনেই তো তাকে নমিনেশন দেওয়া হয়েছে। এখন এমপি হওয়ার পর তাকে কেন প্যান্ট পরতে হবে? তার শ্রমিকেরা যতোদিন প্যান্ট পরার উপযুক্ত না হবেন ততোদিন তিনি লুঙ্গি ছাড়ছেন না বলেও সাফ জানিয়ে দেন। মকিম হোসেনের জবাব মেনে নিয়ে সংসদে লুঙ্গি পরে যাওয়ার বিষয়ে কোন বাধা নিষেধ না রাখার সিদ্ধান্ত হয়। শেখ মুজিবুর রহমান হত্যাকাণ্ডের পরের বছর নলছিটির গরুহাটে গরু কিনতে গিয়ে সর্বহারাদের হাতে খুন হন মকিম হাওলাদার। মোকিম হাওলাদার শ্রমিক নেতা হিসেবে খুলনা অঞ্চলে পরিচিতি মুখ হলেও আজ থেকে ৫৩ বছর আগে মোকিম হাওলাদার দেশব্যাপী জনপ্রিয় হয়ে উঠেন সংসদে লুঙ্গি গেঞ্জি পড়ে যাওয়ার কারনে।
হাসনাত আব্দুল্লাহ ও মোকিম হাওলাদার পোশাক দিয়ে নয়, দেশের মানুষের কাছে পরিচিত মুখ হয়েছেন তাদের কর্মে, তাদের দেশপ্রেমে, তাদের সংগ্রামে লড়াইয়ে।