গণভোটে হ্যা জয়ী হওয়ায় আসতে পারে যেসকল পরিবর্তন

গণভোটে হ্যা জয়ী হওয়ায় আসতে পারে যেসকল পরিবর্তন
  • Author,
  • Role, জাগরণ নিউজ বাংলা

দেশে শেষ হলো বহুল কাঙ্ক্ষিত নির্বাচন।এবারের নির্বাচন ছিলো ভোটার এবং আয়োজক সকলের জন্যই এক নতুন অভিজ্ঞতা। প্রতিটি নির্বাচনের মতো আবহাওয়া থাকলে এবার ভিন্ন ছিলো গণভোট। সকলের মনে নানান প্রশ্ন কি এই গণভোট, কি আছে এটাতে, কি হবে গণভোট দিলে, কার লাভ হবে, কার ক্ষতি হবে এমনকি দেশ বিক্রি এবং দেশে ইসলাম নিষিদ্ধ হওয়ার মতো অবাস্তব কল্পনা মানুষের মনে জায়গা করে নিয়েছিলো গণভোট নিয়ে।

চলুন আমরা জেনে নেই দেশে অনুষ্ঠিত হওয়া এই গণভোট কি ছিলো: ফ্যাসিস্ট সরকার পতনের পর সরকার দেশের সংবিধান ও বিদ্যমান কিছু আইন ও নীতিমালা পরিবর্তনের সীদ্ধান্ত গ্রহণ করে। রাজনৈতিক দলগুলোর সাথে আলোচনা ও পরামর্শক্রমে এসকল সীদ্ধান্ত গ্রহণ করে সরকার।যে সীদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়েছে সেগুলোর প্রতি জনগণের সমর্থন আছে কি না সেটা যাচাইয়ের ভোটকেই মুলত আমরা এক কথায় গণভোট হিসেবে ধরতে পারি। চলুন যেনে নেই এই সরকার গণভোটে কি কি প্রস্তাবনা রেখেছিলো:

১. সরকারি দল ইচ্ছেমতো সংবিধান সংশোধন করতে পারবে না।

২. সংবিধানের গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের ক্ষেত্রে গণভোটের বিধান চালু হবে।

৩. বিরোধী দল থেকে ডেপুটি স্পিকার এবং গুরুত্বপূর্ণ সংসদীয় কমিটিসমূহের সভাপতি নির্বাচিত হবেন।

৪. যত মেয়াদই হোক, কেউ সর্বোচ্চ ১০ বছরের বেশি প্রধানমন্ত্রী থাকতে পারবেন না।

৫. সংসদে নারীর প্রতিনিধিত্ব পর্যায়ক্রমে বাড়বে।

৬. ক্ষমতার ভারসাম্য প্রতিষ্ঠার জন্য পার্লামেন্টে একটি উচ্চকক্ষ গঠিত হবে।

৭. দেশের বিচারব্যবস্থা স্বাধীনভাবে কাজ করবে।

৮. আপনার মৌলিক অধিকারের সংখ্যা (যেমন: ইন্টারনেট সেবা কখনও বন্ধ করা যাবে না) বাড়বে।

৯. দণ্ডপ্রাপ্ত অপরাধীকে রাষ্ট্রপতি ইচ্ছেমতো ক্ষমা করতে পারবেন না।

১০. রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতার মধ্যে ভারসাম্য থাকবে।

১১. রাষ্ট্রভাষা বাংলার মর্যাদার পাশাপাশি অন্যান্য জাতিগোষ্ঠীর ভাষারও সাংবিধানিক স্বীকৃতি হবে।

১২. তত্ত্বাবধায়ক সরকার, নির্বাচন কমিশন ও সরকারি কর্ম কমিশন (পিএসসি) গঠনে সরকারি দল ও বিরোধী দল একত্রে কাজ করবে।  

গণভোটে ‘হ্যাঁ’ জয়ী হওয়ায় জুলাই জাতীয় সনদের সংবিধান-সম্পর্কিত ৪৮টি সংস্কার প্রস্তাব বাস্তবায়নের তৃতীয় ধাপ শুরু হবে। এসব প্রস্তাবের মধ্যে ১৯টি মৌলিক সংস্কার হিসেবে চিহ্নিত। এক ব্যক্তি জীবনে সর্বোচ্চ ১০ বছরের বেশি প্রধানমন্ত্রী পদে থাকতে পারবেন না; একই ব্যক্তি প্রধানমন্ত্রী ও দলীয় প্রধানের দায়িত্ব একসঙ্গে পালন করতে পারবেন না এবং বর্তমানে সংবিধান অনুযায়ী নির্বাহী ক্ষমতার প্রায় সবটিই প্রধানমন্ত্রীর হাতে ন্যস্ত—সংস্কার প্রস্তাবনায় এমনটিই বলা আছে। সংস্কার প্রস্তাবনায় আরও উল্লেখ আছে, সংস্কার কার্যকর হলে রাষ্ট্রপতির ক্ষমতাও কিছু ক্ষেত্রে বাড়বে। মানবাধিকার কমিশন, তথ্য কমিশন, প্রেস কাউন্সিল, আইন কমিশন, বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর এবং এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনে নিয়োগ রাষ্ট্রপতি নিজ এখতিয়ারে দিতে পারবেন।

সংবিধান সংস্কার বাস্তবায়নে তিনটি ধাপ নির্ধারিত হয়েছে। প্রথম ধাপে আইনি ভিত্তি দিতে গত ১৩ নভেম্বর রাষ্ট্রপতি জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ, ২০২৫ জারি করেন। দ্বিতীয় ধাপে অনুষ্ঠিত হলো গণভোট। তৃতীয় ধাপে আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠন করা হবে। সংসদ সদস্যরা একই সঙ্গে সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন। প্রথম অধিবেশন শুরুর তারিখ থেকে ১৮০ কার্যদিবসের মধ্যে জুলাই জাতীয় সনদ ও গণভোটের ফলাফলের আলোকে সংস্কার সম্পন্ন করতে হবে। তবে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সংস্কার সম্পন্ন না হলে কী হবে, সে বিষয়ে আদেশে স্পষ্ট উল্লেখ নেই। পরিবর্তন আসবে যেসব আইনে: গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ- ইসির পূর্ণ স্বাধীনতা, ইসি আইন- সার্চ কমিটি ও সংসদীয় শুনানি, ভোটার তালিকা আইন- স্বচ্ছ ও অডিটযোগ্য, স্থানীয় সরকার নির্বাচন- দলীয় প্রভাবমুক্ত, প্রশাসনিক ট্রাইব্যুনাল আইন- দ্রুত বিচার, সরকারি সিদ্ধান্ত স্বচ্ছতা আইন, পুলিশ আইন ১৮৬১- আধুনিক ও জবাবদিহি, দুদক আইন- সম্পূর্ণ স্বাধীন তদন্ত ক্ষমতা, বিশেষ ক্ষমতা- বাতিল বা কঠোর সীমাবদ্ধতা, সাইবার আইন- মতপ্রকাশের সুরক্ষা, তথ্য অধিকার- তথ্য না দিলে শাস্তি, প্রেস কাউন্সিল- স্বাধীন নিয়ন্ত্রণ, সম্প্রচার আইন- সরকারি প্রভাবমুক্ত, ইউনিয়ন পরিষদ আইন-সরাসরি বাজেট, গণভোট ও অধিকার রক্ষায় হবে নতুন আইন।

এবার মোট ভোটার ছিলেন ১২ কোটি ৭৭ লাখ ১১ হাজার ৭৯৫। গণভোটে মতামত পড়েছে ৬০ দশমিক ২৬ শতাংশ। এর মধ্যে ‘হ্যাঁ’ ভোট দিয়েছেন ৪ কোটি ৮০ লাখ ৭৪ হাজার ৪২৯ জন এবং ‘না’ ভোট দিয়েছেন ২ কোটি ২৫ লাখ ৬৫ হাজার ৬২৭ জন। জনরায়ে বড় ব্যবধানে জয়ী হয়েছে ‘হ্যাঁ ভোট।’

প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস বলেছেন, গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোট জয়ী হওয়ায় দেশ পাল্টে যাবে এবং দেশে আর অপশাসন ফিরে আসবে না। গণভোট হ্যাঁ জয়ী হওয়ায় দেশের রাজনৈতিক কাঠামোয় এক অভূতপূর্ব পরিবর্তন নিয়ে আসবে।

আসুন দেখে নিই কেমন ছিলো গণভোটের ব্যালট: "আপনি কি জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংশোধন) বাস্তবায়ন আদেশ, ২০২৫ এবং জুলাই জাতীয় সনদে নিম্নলিখিত সাংবিধানিক সংস্কার সম্পর্কিত নিম্নলিখিত প্রস্তাবসমূহের প্রতি আপনার সম্মতি জ্ঞাপন করিতেছেন?" (হ্যাঁ/না):

(ক): নির্বাচনকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকার, নির্বাচন কমিশন এবং অন্যান্য সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান জুলাই সনদে বর্ণিত প্রক্রিয়ার আলোকে গঠন করা হইবে।

(খ): আগামী জাতীয় সংসদ হইবে দুই কক্ষ বিশিষ্ট ও জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দলগুলোর প্রাপ্ত ভোটের অনুপাতে ১০০ সদস্য বিশিষ্ট একটি উচ্চকক্ষ গঠিত হইবে এবং সংবিধান সংশোধন করিতে হইলে উচ্চকক্ষের সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যের অনুমোদন দরকার হইবে।

(গ): সংসদে নারী প্রতিনিধি বৃদ্ধি, বিরোধী দল হইতে ডেপুটি স্পীকার ও সংসদীয় কমিটির সভাপতি নির্বাচন, মৌলিক অধিকার, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, স্থানীয় সরকার, প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদ, রাষ্ট্রপতির ক্ষমতাসহ তফসিলে বর্ণিত যে ৩০টি বিষয়ে জুলাই জাতীয় সনদে একমতো হইয়াছে- সেগুলো বাস্তবায়ন জাতীয় সংসদ নিশ্চিত করিতে বিজয়ী রাজনৈতিক দলগুলো বাধ্য থাকিবে।

(ঘ): জুলাই জাতীয় সনদে বর্ণিত অপরাপর সংস্কার রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতিশ্রুতি অনুসারে বাস্তবায়ন করা হইবে। এই ৪টি প্রশ্নের পরেই হ্যাঁ এবং না বক্স ছিলো। সেখানে সীল মেরেই ভোটাররা ভোট দিয়েছেন। 

 

 

 

 

 

 

 


সম্পর্কিত নিউজ