{{ news.section.title }}
গণভোটে ‘হ্যাঁ’ জয়ের মাধ্যমে রাষ্ট্র সংস্কারের নতুন অধ্যায় শুরু
- Author,
- Role, জাগরণ নিউজ বাংলা
-
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পাশাপাশি অনুষ্ঠিত ঐতিহাসিক গণভোটে বাংলাদেশের জনগণ রাষ্ট্র সংস্কারের পক্ষে তাদের রায় দিয়েছে। নির্বাচন কমিশনের ঘোষিত ফলাফল অনুযায়ী, গণভোটে বিপুল ব্যবধানে ‘হ্যাঁ’ ভোট জয়ী হয়েছে। এই ফলাফলকে দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি বড় মোড় হিসেবে দেখা হচ্ছে, যা ভবিষ্যতের রাষ্ট্র পরিচালনার কাঠামোতে মৌলিক পরিবর্তনের সূচনা করতে পারে।
নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, গণভোটে মোট ভোটার ছিলেন প্রায় ১২ কোটি ৭৭ লাখের বেশি। ভোট প্রদান করেছে প্রায় ৬০ শতাংশেরও বেশি ভোটার। এর মধ্যে ‘হ্যাঁ’ ভোট পেয়েছে প্রায় ৪ কোটি ৮০ লাখ থেকে ৪ কোটি ৮২ লাখের বেশি, অন্যদিকে ‘না’ ভোট পেয়েছে প্রায় ২ কোটি ২০ লাখ থেকে ২ কোটি ২৫ লাখের বেশি। বিপুল সংখ্যক ব্যালট বাতিল হলেও অধিকাংশ সংসদীয় আসনে ‘হ্যাঁ’ ভোটের আধিক্য দেখা গেছে।
এলাকাভিত্তিক ফলাফল পর্যালোচনায় দেখা যায়, রাজধানী ঢাকা ও বড় শহরগুলোতে ‘হ্যাঁ’ ভোটের হার তুলনামূলক বেশি। তবে পার্বত্য চট্টগ্রামের কয়েকটি আসনে ‘না’ ভোট জয়ী হয়েছে, যা অঞ্চলভেদে ভিন্ন রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গির ইঙ্গিত দেয়।
এই গণভোটের মাধ্যমে ‘জুলাই জাতীয় সনদ’-এর আওতায় সংবিধানের ৪৮টি গুরুত্বপূর্ণ সংস্কার প্রস্তাব বাস্তবায়নের পথ চূড়ান্তভাবে উন্মুক্ত হয়েছে। এর আগে অন্তর্বর্তী সরকার বিভিন্ন সংস্কার কমিশন গঠন করে রাষ্ট্রের বিভিন্ন খাতে সংস্কারের সুপারিশ তৈরি করে, যা রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলোচনা শেষে জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের মাধ্যমে চূড়ান্ত করা হয়।
কি ঘটেছে ও কী পরিবর্তন আসছে
গণভোটে জনগণের সম্মতির ফলে বাংলাদেশের রাষ্ট্র কাঠামোয় বেশ কয়েকটি মৌলিক ও কাঠামোগত পরিবর্তন আসতে যাচ্ছে, যা দেশের রাজনৈতিক ব্যবস্থায় নতুন অধ্যায়ের সূচনা করতে পারে।
ক্ষমতার ভারসাম্য ও নির্বাহী কাঠামোর পরিবর্তন
বাংলাদেশে দীর্ঘদিন ধরে প্রধানমন্ত্রীর হাতে নির্বাহী ক্ষমতার বড় অংশ কেন্দ্রীভূত ছিল। নতুন সংস্কার প্রস্তাব অনুযায়ী, প্রধানমন্ত্রীর কিছু ক্ষমতা সীমিত করে রাষ্ট্রপতির হাতে নির্দিষ্ট ক্ষমতা বাড়ানো হচ্ছে। এতে রাষ্ট্রের নির্বাহী কাঠামোয় চেক অ্যান্ড ব্যালান্স প্রতিষ্ঠা হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, ক্ষমতার এই ভারসাম্য রাজনৈতিক কর্তৃত্বের অতিরিক্ত কেন্দ্রীকরণ কমাতে সহায়ক হতে পারে এবং রাষ্ট্র পরিচালনায় প্রাতিষ্ঠানিক ভারসাম্য ফিরিয়ে আনতে পারে।
দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদ ব্যবস্থা
সংস্কার প্রস্তাব অনুযায়ী, বাংলাদেশের সংসদ হবে দ্বিকক্ষবিশিষ্ট। নিম্নকক্ষে থাকবেন জনগণের সরাসরি নির্বাচিত সংসদ সদস্যরা এবং উচ্চকক্ষে থাকবেন বুদ্ধিজীবী, বিজ্ঞানী, শিল্পী, গবেষক ও অভিজ্ঞ ব্যক্তিদের সমন্বয়ে গঠিত প্রতিনিধিরা।
আইন প্রণয়নের ক্ষেত্রে দুই কক্ষের অনুমোদন প্রয়োজন হবে। এতে আইন প্রণয়ন আরও যাচাই-বাছাই ও গবেষণাভিত্তিক হবে এবং দ্রুত ও ভুল সিদ্ধান্ত নেওয়ার ঝুঁকি কমবে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ সংশোধন
সংবিধানের বিতর্কিত ৭০ অনুচ্ছেদের কারণে সংসদ সদস্যরা দলের সিদ্ধান্তের বাইরে ভোট দিতে পারতেন না। নতুন সংস্কারে এই বিধান শিথিল করা হচ্ছে, ফলে সংসদ সদস্যরা জনগণের স্বার্থ বিবেচনায় স্বাধীনভাবে সংসদে মতামত ও ভোট দিতে পারবেন।
এটি সংসদীয় গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করার একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
সাংবিধানিক পদে নিয়োগে স্বচ্ছতা
নির্বাচন কমিশন, দুর্নীতি দমন কমিশন, মানবাধিকার কমিশনসহ গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানে নিয়োগের ক্ষেত্রে নিরপেক্ষ সার্চ কমিটি বা সংসদীয় কমিটির মাধ্যমে যোগ্য ও সৎ ব্যক্তিদের বাছাই করার প্রস্তাব রয়েছে।
এতে রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ কমে প্রশাসনিক স্বচ্ছতা বাড়বে এবং প্রতিষ্ঠানগুলো স্বাধীনভাবে কাজ করার সুযোগ পাবে বলে আশা করা হচ্ছে।
মৌলিক অধিকার শক্তিশালীকরণ
সংস্কার প্রস্তাব অনুযায়ী, বাকস্বাধীনতা, ইন্টারনেটের অধিকার এবং সভা-সমাবেশের স্বাধীনতা আরও দৃঢ়ভাবে সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করা হচ্ছে। ফলে কোনো সরকার সহজে নাগরিক অধিকার খর্ব করতে পারবে না এবং নাগরিক সমাজের ভূমিকা আরও শক্তিশালী হতে পারে।
এছাড়া, প্রধানমন্ত্রী পদে একজন ব্যক্তি সর্বোচ্চ ১০ বছর দায়িত্ব পালন করতে পারবেন এবং প্রধানমন্ত্রী একই সঙ্গে দলীয় প্রধানের দায়িত্ব পালন করবেন না - এমন বিধানও প্রস্তাব করা হয়েছে, যা ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ ও নেতৃত্বের ধারাবাহিক পরিবর্তন নিশ্চিত করতে পারে।
রাজনৈতিক, সামাজিক ও প্রশাসনিক প্রভাব
গণভোটে ‘হ্যাঁ’ জয়ী হওয়ায় বাংলাদেশের রাজনৈতিক, সামাজিক ও প্রশাসনিক ব্যবস্থায় বড় ধরনের পরিবর্তনের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
রাজনৈতিক প্রভাব
রাজনৈতিকভাবে, ক্ষমতার ভারসাম্য প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা আরও শক্তিশালী হতে পারে। নির্বাহী ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ কমলে রাজনৈতিক স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা বাড়বে।
দ্বিকক্ষ সংসদ চালু হলে আইন প্রণয়ন আরও অংশগ্রহণমূলক ও গবেষণাভিত্তিক হবে। সংসদ সদস্যদের স্বাধীনতা বাড়লে সংসদে বাস্তব বিতর্ক ও জনস্বার্থভিত্তিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ সৃষ্টি হবে।
সামাজিক প্রভাব
মৌলিক অধিকার শক্তিশালী হলে নাগরিক সমাজ, গণমাধ্যম এবং মানবাধিকার সংগঠনগুলোর কার্যক্রম আরও সক্রিয় হতে পারে। নাগরিকদের মতপ্রকাশের স্বাধীনতা বাড়লে গণতন্ত্রের সামাজিক ভিত্তি আরও সুদৃঢ় হবে।
প্রশাসনিক প্রভাব
সাংবিধানিক পদে নিয়োগে স্বচ্ছতা বাড়লে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর জনগণের আস্থা বাড়বে। দুর্নীতি কমানো এবং প্রশাসনিক দক্ষতা বৃদ্ধির সুযোগ তৈরি হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞ মত ও ভবিষ্যৎ ইঙ্গিত
রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও সাংবিধানিক বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, গণভোটে ‘হ্যাঁ’ জয় বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। দীর্ঘদিন ধরে ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ, রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিষ্ঠানগত দুর্বলতার অভিযোগ ছিল। এই সংস্কারগুলো বাস্তবায়িত হলে এসব সমস্যার সমাধানে সহায়ক হতে পারে।
তবে বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে চ্যালেঞ্জ রয়েছে। সংবিধান সংশোধনের জন্য দ্বিকক্ষ সংসদের সমর্থন প্রয়োজন হবে এবং রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে ঐকমত্য বজায় রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। রাজনৈতিক বিভাজন বাড়লে সংস্কার বাস্তবায়নে বিলম্ব বা জটিলতা সৃষ্টি হতে পারে।
এছাড়া, সংস্কার পরিষদের নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কাজ শেষ না হলে কী হবে - সে বিষয়ে বাস্তবায়ন আদেশে স্পষ্ট নির্দেশনা না থাকায় ভবিষ্যতে সাংবিধানিক জটিলতা তৈরি হতে পারে বলে বিশ্লেষকদের আশঙ্কা।
বিশেষজ্ঞরা আরও বলছেন, গণভোটে জনগণের সমর্থন থাকলেও রাজনৈতিক সদিচ্ছা ছাড়া সংস্কার বাস্তবায়ন সম্ভব নয়। তাই আগামী সংসদ, রাজনৈতিক দল এবং প্রশাসনিক কাঠামোর ভূমিকা হবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
হ্যাঁ জয়ে সাধারণ মানুষের লাভ
গণভোটে ‘হ্যাঁ’ জয়ী হওয়ার মাধ্যমে বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় কাঠামোতে এক নতুন যুগের সূচনা হচ্ছে। এই সংস্কারের ফলে সাধারণ মানুষ যে সুবিধা পেতে পারে তা হলো -
- সরকারের জবাবদিহিতা বাড়বে এবং ক্ষমতার অপব্যবহার কমবে
- নাগরিক অধিকার আরও সুরক্ষিত হবে
- সংসদ সদস্যরা জনগণের স্বার্থে স্বাধীনভাবে কথা বলতে পারবেন
- রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত হওয়ার সম্ভাবনা বাড়বে
- আইন প্রণয়ন আরও স্বচ্ছ, কার্যকর ও গবেষণাভিত্তিক হবে
- নেতৃত্বে পরিবর্তন ও ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ নিশ্চিত হবে
সব মিলিয়ে, জনগণের রায়ের মাধ্যমে বাংলাদেশ একটি ভারসাম্যপূর্ণ ও শক্তিশালী গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। তবে এই সংস্কারের বাস্তব প্রয়োগ, রাজনৈতিক ঐকমত্য এবং প্রশাসনিক সক্ষমতাই নির্ধারণ করবে এই পরিবর্তন সাধারণ মানুষের জীবনে কতটা বাস্তব প্রভাব ফেলতে পারবে।