গণভোটে ‘হ্যাঁ’ জয়: দ্বিকক্ষ সংসদে নতুন পথে বাংলাদেশ

গণভোটে ‘হ্যাঁ’ জয়: দ্বিকক্ষ সংসদে নতুন পথে বাংলাদেশ
  • Author,
  • Role, জাগরণ নিউজ বাংলা

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পাশাপাশি অনুষ্ঠিত ঐতিহাসিক গণভোটে বাংলাদেশের জনগণ রাষ্ট্র সংস্কারের পক্ষে স্পষ্ট রায় দিয়েছে। নির্বাচন কমিশনের ঘোষিত ফলাফলে দেখা যায়, বিপুল ব্যবধানে ‘হ্যাঁ’ ভোট জয়ী হয়েছে, যা দেশের রাজনৈতিক কাঠামোয় বড় ধরনের পরিবর্তনের দ্বার উন্মোচন করেছে।

গণভোটে মোট ভোটার ছিল ১২ কোটি ৭৭ লাখের বেশি, যার মধ্যে ভোট প্রদান করেছেন প্রায় ৬০ শতাংশ ভোটার। ‘হ্যাঁ’ ভোট পেয়েছে প্রায় ৪ কোটি ৮০ লাখের বেশি, যেখানে ‘না’ ভোট পড়েছে প্রায় ২ কোটি ২৫ লাখের কিছু বেশি। এই ফলাফল জুলাই জাতীয় সনদের আওতায় সংবিধানের ৪৮টি গুরুত্বপূর্ণ সংস্কার প্রস্তাব বাস্তবায়নের রাজনৈতিক ও আইনগত বৈধতা দিয়েছে।

বিশ্লেষকরা বলছেন, এটি কেবল একটি সাধারণ গণভোট নয়; বরং বাংলাদেশের রাষ্ট্রব্যবস্থার ইতিহাসে সবচেয়ে বড় কাঠামোগত রূপান্তরের সূচনা। ২০২৪ সালের জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার রাষ্ট্র সংস্কারের যে অঙ্গীকার করেছিল, এই গণভোট তারই বাস্তব প্রতিফলন।

গণভোটে ‘হ্যাঁ’ জয় মানে কী পরিবর্তন আসছে

গণভোটে জনগণের সম্মতির ফলে বাংলাদেশের রাষ্ট্র কাঠামোয় বেশ কয়েকটি মৌলিক ও কাঠামোগত পরিবর্তন আসতে যাচ্ছে, যা দেশের রাজনৈতিক ব্যবস্থায় নতুন অধ্যায়ের সূচনা করতে পারে।

ক্ষমতার ভারসাম্য: প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতা কমবে

বাংলাদেশে দীর্ঘদিন ধরে প্রধানমন্ত্রীর হাতে বিপুল ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত ছিল। বর্তমান সংবিধানে রাষ্ট্রপতির অধিকাংশ সিদ্ধান্ত প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শের ওপর নির্ভরশীল। নতুন সংস্কারে এই কাঠামো পরিবর্তনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

গণভোটের মাধ্যমে জনগণের সমর্থন পাওয়ায় প্রধানমন্ত্রী ও রাষ্ট্রপতির মধ্যে ক্ষমতার ভারসাম্য তৈরি হবে। রাষ্ট্রপতির কিছু স্বাধীন নির্বাহী ক্ষমতা বাড়বে এবং প্রধানমন্ত্রীকে সংসদ ও অন্যান্য সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের কাছে আরও জবাবদিহিতার আওতায় আসতে হবে।

দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদ: নতুন আইন প্রণয়নে দুই স্তরের যাচাই

গণভোটের অন্যতম বড় পরিবর্তন হলো দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদ প্রতিষ্ঠা। এতদিন বাংলাদেশের সংসদ ছিল এককক্ষবিশিষ্ট। নতুন ব্যবস্থায় থাকবে নিম্নকক্ষ (সরাসরি নির্বাচিত এমপি) এবং উচ্চকক্ষ (বিশিষ্ট নাগরিক ও বিশেষজ্ঞদের প্রতিনিধিত্ব)।

এই ব্যবস্থা চালু হলে যেকোনো আইন পাসের আগে দুই কক্ষের অনুমোদন লাগবে, ফলে তড়িঘড়ি আইন পাস করার সুযোগ কমবে।

ভারত ও পাকিস্তানের সংসদীয় কাঠামো এর একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ। ভারতে লোকসভা ও রাজ্যসভা এবং পাকিস্তানে ন্যাশনাল অ্যাসেম্বলি ও সিনেট রয়েছে, যা ফেডারেল কাঠামোতে ক্ষমতার ভারসাম্য বজায় রাখতে ভূমিকা রাখে।


সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ সংশোধন: এমপিদের স্বাধীনতা

বাংলাদেশের রাজনীতিতে সবচেয়ে বিতর্কিত বিধান ছিল সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ। এই বিধানের কারণে সংসদ সদস্যরা দলের বিপক্ষে ভোট দিতে পারতেন না, ফলে সংসদ কার্যত দলীয় সিদ্ধান্তের রাবার স্ট্যাম্পে পরিণত হয়েছিল।

নতুন সংস্কারে এই বিধান শিথিল করা হচ্ছে। এর ফলে এমপিরা তাদের এলাকার জনগণের স্বার্থ অনুযায়ী ভোট দিতে পারবেন, যা সংসদের গণতান্ত্রিক চরিত্রকে শক্তিশালী করবে।


সাংবিধানিক নিয়োগে স্বচ্ছতা

নির্বাচন কমিশন, দুর্নীতি দমন কমিশন, মানবাধিকার কমিশনসহ গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানে নিয়োগে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার প্রস্তাবও গণভোটে অনুমোদিত হয়েছে।

নতুন ব্যবস্থায় সার্চ কমিটি বা সংসদীয় কমিটির মাধ্যমে নিয়োগ দেওয়া হবে, যাতে দলীয় পক্ষপাত কমে এবং প্রতিষ্ঠানগুলোর স্বাধীনতা বাড়ে।


মৌলিক অধিকার শক্তিশালীকরণ

সংস্কার প্রস্তাব অনুযায়ী বাকস্বাধীনতা, ইন্টারনেট অধিকার এবং সভা-সমাবেশের অধিকার আরও সুস্পষ্টভাবে সংবিধানে সুরক্ষিত হবে। কোনো সরকার সহজে নাগরিক অধিকার সীমিত করতে পারবে না—এমন সাংবিধানিক গ্যারান্টি দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

 

রাষ্ট্র ও রাজনীতিতে সম্ভাব্য পরিবর্তন

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গণভোটের ফলাফল বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশের রাজনীতিতে তিনটি বড় পরিবর্তন ঘটতে পারে।

প্রথমত, নির্বাহী ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ কমবে এবং প্রতিষ্ঠানভিত্তিক শাসনব্যবস্থা গড়ে উঠবে। দ্বিতীয়ত, সংসদে বিতর্ক ও বিরোধী মতের গুরুত্ব বাড়বে, যা গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করবে। তৃতীয়ত, সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলো রাজনৈতিক প্রভাব থেকে কিছুটা হলেও মুক্ত হবে।

এ ছাড়া দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদ চালু হলে আইন প্রণয়নের মান বাড়বে এবং হঠাৎ আইন পাসের প্রবণতা কমবে।


ভারত ও পাকিস্তানের দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদ ব্যবস্থা: বাংলাদেশে সম্ভাব্য মডেল

বাংলাদেশে দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদ প্রবর্তনের পরিকল্পনা দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রগুলোর সংসদীয় কাঠামোর সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। বিশেষ করে ভারত ও পাকিস্তানের সংসদীয় কাঠামো বাংলাদেশি সংস্কার পরিকল্পনার জন্য গুরুত্বপূর্ণ তুলনামূলক উদাহরণ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।


ভারত: লোকসভা ও রাজ্যসভা - ফেডারেল ভারসাম্যের মডেল

ভারতের সংসদ ব্যবস্থা বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ গণতান্ত্রিক কাঠামো হিসেবে পরিচিত। দেশটির সংসদ দুই কক্ষ নিয়ে গঠিত - লোকসভা (নিম্নকক্ষ) এবং রাজ্যসভা (উচ্চকক্ষ)।

লোকসভা (নিম্নকক্ষ)

লোকসভা ভারতের সংসদের প্রধান কক্ষ, যেখানে ৫৪৩ জন সদস্য সরাসরি জনগণের ভোটে নির্বাচিত হন। প্রধানমন্ত্রী ও তার মন্ত্রিসভা লোকসভার কাছে দায়বদ্ধ থাকে এবং সরকার গঠনের মূল ক্ষমতা এই কক্ষের হাতেই থাকে। বাজেট, অর্থনীতি ও জাতীয় নীতিনির্ধারণে লোকসভা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

রাজ্যসভা (উচ্চকক্ষ)

রাজ্যসভা মূলত ভারতের ফেডারেল কাঠামোর প্রতিফলন। এটি রাজ্যগুলোর প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করার জন্য গঠিত, যেখানে সদস্যরা রাজ্য বিধানসভাগুলোর মাধ্যমে নির্বাচিত হন। রাজ্যসভা একটি স্থায়ী কক্ষ, যা কখনো বিলুপ্ত হয় না।

আইন প্রণয়নের প্রক্রিয়া

ভারতে যেকোনো সাধারণ আইন পাসের জন্য লোকসভা ও রাজ্যসভা উভয়ের অনুমোদন প্রয়োজন হয়। তবে অর্থবিলের ক্ষেত্রে লোকসভা সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী। দুই কক্ষের মধ্যে মতবিরোধ হলে রাষ্ট্রপতির আহ্বানে যৌথ অধিবেশনের মাধ্যমে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

বিশ্লেষকরা বলছেন, ভারতের এই দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদ ব্যবস্থা আইন প্রণয়নে ভারসাম্য ও গুণগত মান নিশ্চিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।


পাকিস্তান: ন্যাশনাল অ্যাসেম্বলি ও সিনেট - প্রাদেশিক সমতা রক্ষার কাঠামো

পাকিস্তানের সংসদীয় কাঠামোও দ্বিকক্ষবিশিষ্ট এবং ফেডারেল ভারসাম্য রক্ষার উদ্দেশ্যে গঠিত।

ন্যাশনাল অ্যাসেম্বলি (নিম্নকক্ষ)

ন্যাশনাল অ্যাসেম্বলি পাকিস্তানের প্রধান আইন প্রণয়নকারী কক্ষ, যেখানে সদস্যরা সরাসরি জনগণের ভোটে নির্বাচিত হন। প্রধানমন্ত্রী ও সরকার এই কক্ষের কাছে দায়বদ্ধ।

সিনেট (উচ্চকক্ষ)

সিনেট পাকিস্তানের প্রাদেশিক প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করার জন্য গঠিত। প্রতিটি প্রদেশ থেকে সমান সংখ্যক সদস্য সিনেটে প্রতিনিধিত্ব করেন, যাতে জনসংখ্যায় বড় প্রদেশগুলো ছোট প্রদেশগুলোর ওপর আধিপত্য বিস্তার করতে না পারে।

উদাহরণস্বরূপ, পাঞ্জাব পাকিস্তানের সবচেয়ে জনবহুল প্রদেশ হলেও সিনেটে বেলুচিস্তান বা সিন্ধুর মতো ছোট প্রদেশের সমান প্রতিনিধিত্ব থাকে।

আইন প্রণয়নে সিনেটের ভূমিকা

সিনেট কোনো বিল পাস না করলে তা আইনে পরিণত হওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। ফলে প্রাদেশিক স্বার্থ রক্ষায় সিনেট একটি শক্তিশালী চেক অ্যান্ড ব্যালান্স হিসেবে কাজ করে।


রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিবর্তনের সম্ভাবনা

গণভোটের ‘হ্যাঁ’ ফলাফল বাংলাদেশের রাজনৈতিক কাঠামোতে দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলতে পারে।

গণতান্ত্রিক জবাবদিহিতা বৃদ্ধি

ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ ও সংসদের স্বাধীনতা বৃদ্ধির ফলে সরকার জবাবদিহিতার আওতায় আসবে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, এটি দীর্ঘদিনের কর্তৃত্ববাদী প্রবণতা কমাতে সহায়ক হবে।

আইন প্রণয়নের মান উন্নয়ন

দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদের ফলে আইন প্রণয়নে দ্বিতীয় স্তরের যাচাই-বাছাই হবে, যা ভুল আইন ও তড়িঘড়ি সিদ্ধান্তের ঝুঁকি কমাবে।

প্রাতিষ্ঠানিক শক্তিশালীকরণ

নির্বাচন কমিশন, দুদকসহ সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলো স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারবে, যা দুর্নীতি দমন ও প্রশাসনিক স্বচ্ছতায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

নাগরিক অধিকার সম্প্রসারণ

মৌলিক অধিকার শক্তিশালী হওয়ায় নাগরিক সমাজ, গণমাধ্যম ও মানবাধিকার সংগঠনগুলোর কার্যক্রম আরও সক্রিয় হবে বলে আশা করা হচ্ছে।


রাজনৈতিক সংস্কৃতির নতুন অধ্যায়

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই গণভোট বাংলাদেশের ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক রূপান্তরের সূচনা।

২০২৪ সালের জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার রাষ্ট্র সংস্কারের অঙ্গীকার করেছিল। ওই প্রতিশ্রুতির ধারাবাহিকতায় ‘জুলাই জাতীয় সনদ’ তৈরি হয়, যেখানে বিভিন্ন সংস্কার কমিশনের সুপারিশ অন্তর্ভুক্ত করা হয়।

গণভোটের মাধ্যমে জনগণ শুধু নেতা পরিবর্তনের পক্ষে নয়, বরং কাঠামোগত পরিবর্তনের পক্ষে রায় দিয়েছে। এটি রাজনৈতিক দলগুলোর জন্যও একটি বড় বার্তা - ভবিষ্যতে জনগণের প্রত্যাশা পূরণ না হলে রাজনৈতিক চাপ বাড়তে পারে।

তবে কিছু বিশ্লেষক সতর্ক করছেন, সংস্কার বাস্তবায়নে রাজনৈতিক ঐকমত্য ও আইনি কাঠামো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদ, ক্ষমতার ভারসাম্য ও সাংবিধানিক নিয়োগ কাঠামো বাস্তবায়ন করতে সাংবিধানিক সংশোধন ও রাজনৈতিক সমঝোতার প্রয়োজন হবে।


জনগণের জন্য সম্ভাব্য সুফল

গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ফলাফল বাংলাদেশের জনগণের জন্য একটি নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিয়েছে। ক্ষমতার ভারসাম্য, সংসদের স্বাধীনতা, নাগরিক অধিকার সুরক্ষা এবং প্রাতিষ্ঠানিক স্বচ্ছতা - সব মিলিয়ে এটি একটি আধুনিক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র গঠনের দিকে বড় পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

যদি সংস্কারগুলো সঠিকভাবে বাস্তবায়িত হয়, তবে সাধারণ মানুষ আরও জবাবদিহিমূলক সরকার, উন্নত আইন ব্যবস্থা এবং শক্তিশালী নাগরিক অধিকার উপভোগ করতে পারবে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই গণভোট ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি স্থায়ী রাজনৈতিক উত্তরাধিকার হয়ে থাকতে পারে।


সম্পর্কিত নিউজ