সংসদ নির্বাচন ও ‘জুলাই সনদ’ গণভোট বদলাবে কী রাষ্ট্র কাঠামো?

সংসদ নির্বাচন ও ‘জুলাই সনদ’ গণভোট বদলাবে কী রাষ্ট্র কাঠামো?
  • Author,
  • Role, জাগরণ নিউজ বাংলা

১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন শুধু একটি সাধারণ নির্বাচন ছিল না, বরং একই দিনে অনুষ্ঠিত ‘জুলাই সনদ’ বাস্তবায়ন সংক্রান্ত পৃথক গণভোট দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেছে। নির্বাচন ও গণভোট একসঙ্গে হওয়ায় এটি বাংলাদেশের রাজনীতিতে এক ব্যতিক্রমী ও গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

সকাল সাড়ে সাতটা থেকে বিকেল সাড়ে চারটা পর্যন্ত দেশের হাজারো ভোটকেন্দ্রে ভোটাররা সংসদ নির্বাচনের পাশাপাশি গণভোটে অংশ নেন। গণভোটের জন্য আলাদা ব্যালট পেপার ব্যবহার করা হয়, যেখানে নির্দিষ্ট কিছু সাংবিধানিক ও রাষ্ট্রীয় সংস্কার বিষয়ে ভোটারদের মতামত জানতে চাওয়া হয়। ভোটাররা ‘হ্যাঁ’ অথবা ‘না’ ভোট দিয়ে জুলাই সনদ বাস্তবায়নের পক্ষে বা বিপক্ষে নিজেদের অবস্থান জানান।

নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, ভোটগ্রহণ শান্তিপূর্ণভাবে সম্পন্ন করতে পর্যাপ্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, প্রশাসন ও নির্বাচন কর্মকর্তারা সমন্বিতভাবে দায়িত্ব পালন করেন। সকাল থেকে কিছু কেন্দ্রে ভোটার উপস্থিতি কম থাকলেও সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তা বাড়তে দেখা যায়। বিশেষ করে তরুণ ভোটারদের মধ্যে গণভোট নিয়ে ব্যাপক আগ্রহ লক্ষ্য করা গেছে। অনেক ভোটার জানিয়েছেন, দেশের ভবিষ্যৎ রাষ্ট্রীয় কাঠামো ও সংস্কারে মতামত দেওয়ার সুযোগ পেয়ে তারা সন্তুষ্ট।

বিশ্লেষকদের মতে, সংসদ নির্বাচনের ফলাফলের পাশাপাশি গণভোটের ফলাফল বাংলাদেশের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ, সাংবিধানিক কাঠামো ও নীতিনির্ধারণী প্রক্রিয়ায় দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলতে পারে।

গণভোট নিয়ে সরকারের প্রচারণা ও রাজনৈতিক বিতর্ক

গণভোটের আগে অন্তর্বর্তী সরকার সারাদেশে ব্যাপক প্রচারণা চালায়। প্রথমদিকে সরকার নিরপেক্ষ অবস্থান থেকে গণভোটের গুরুত্ব তুলে ধরলেও পরে সরাসরি ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে প্রচারণায় নামে। কয়েকদিন আগে প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস রেডিও ও টেলিভিশনে প্রচারিত এক ভিডিও বার্তায় ‘হ্যাঁ’ ভোট দেওয়ার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, ‘হ্যাঁ’ ভোট দিলে বৈষম্য, শোষণ ও নিপীড়ন থেকে মুক্ত হয়ে নতুন বাংলাদেশ গড়ার সুযোগ তৈরি হবে।

সংস্কার কমিশনের প্রতিবেদন ও রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে একাধিক বৈঠকের পর গণভোটে মোট ৮৪টি সংস্কার প্রস্তাব অন্তর্ভুক্ত করা হয়। এর মধ্যে ৪৭টি সাংবিধানিক সংস্কার এবং ৩৭টি সাধারণ আইন বা নির্বাহী আদেশের মাধ্যমে বাস্তবায়নের প্রস্তাব রয়েছে। তবে এসব প্রস্তাবের কিছু বিষয়ে বিএনপি, জামায়াতসহ অন্যান্য রাজনৈতিক দলের ভিন্নমত বা নোট অব ডিসেন্ট ছিল।

প্রাথমিকভাবে প্রস্তাব ছিল, যেসব বিষয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর আপত্তি রয়েছে, তারা ক্ষমতায় গেলে সেসব বাস্তবায়নে বাধ্য থাকবে না। কিন্তু ঐকমত্যে পৌঁছাতে ব্যর্থ হওয়ায় সরকার গণভোটের সিদ্ধান্ত নেয়।

গণভোটে ‘হ্যাঁ’ জয়ী হলে আগামী সংসদ এসব সংস্কার বাস্তবায়নে বাধ্য থাকবে। আর ‘না’ জয়ী হলে জুলাই সনদ কার্যকর করার বাধ্যবাধকতা থাকবে না, যা রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা বাড়াতে পারে বলে বিশ্লেষকদের ধারণা।

ভাষা, জাতিসত্তা ও মৌলিক রাষ্ট্রীয় নীতিতে পরিবর্তন

জুলাই সনদের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো রাষ্ট্রীয় পরিচয় ও মৌলিক নীতির পরিবর্তন। বর্তমানে সংবিধানে বাংলা ছাড়া অন্য ভাষার স্বীকৃতি নেই। কিন্তু সনদে বলা হয়েছে, রাষ্ট্রভাষা বাংলা হলেও অন্যান্য মাতৃভাষাকেও স্বীকৃতি দেওয়া হবে, যা দেশের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী ও ভাষাগত বৈচিত্র্যের স্বীকৃতি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

বর্তমানে নাগরিকদের জাতিগত পরিচয় ‘বাঙালি’ হলেও সংস্কারের পর নাগরিক পরিচয় হবে ‘বাংলাদেশি’, যা নাগরিকত্বের ভিত্তিকে জাতিগত পরিচয়ের বাইরে এনে রাষ্ট্রীয় পরিচয়কে আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক করার প্রচেষ্টা হিসেবে দেখা হচ্ছে।

সংবিধান সংশোধনের ক্ষেত্রেও বড় পরিবর্তনের প্রস্তাব এসেছে। বর্তমানে সংসদের দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতায় সংবিধান সংশোধন করা যায়। কিন্তু জুলাই সনদে প্রস্তাব করা হয়েছে - নিম্নকক্ষে দুই-তৃতীয়াংশ এবং উচ্চকক্ষে সংখ্যাগরিষ্ঠতা প্রয়োজন হবে, কিছু ক্ষেত্রে গণভোটও বাধ্যতামূলক করা হবে।

এছাড়া বর্তমান সংবিধানের মূলনীতি যেখানে বাঙালি জাতীয়তাবাদ, গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ, সেখানে নতুন মূলনীতি হিসেবে প্রস্তাব করা হয়েছে সাম্য, মানবিক মর্যাদা, সামাজিক ন্যায়বিচার, ধর্মীয় স্বাধীনতা ও সম্প্রীতি।

রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতার ভারসাম্য

জুলাই সনদের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সংস্কার রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতার ভারসাম্য নিয়ে। বর্তমানে জরুরি অবস্থা জারি করতে প্রধানমন্ত্রীর স্বাক্ষরই যথেষ্ট, যার ফলে মৌলিক অধিকার স্থগিত হতে পারে। কিন্তু সনদ অনুযায়ী জরুরি অবস্থা জারি করতে মন্ত্রিসভার অনুমোদন লাগবে এবং বিরোধী দলীয় নেতার উপস্থিতিও বাধ্যতামূলক হবে।

রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের পদ্ধতিতেও পরিবর্তন আসছে। বর্তমানে সংসদ সদস্যদের প্রকাশ্য ভোটে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন। নতুন প্রস্তাব অনুযায়ী, গোপন ব্যালটে উচ্চকক্ষ ও নিম্নকক্ষের সংসদ সদস্যদের ভোটে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হবেন।

রাষ্ট্রপতির নিয়োগ ক্ষমতা বাড়ানোর প্রস্তাবও রয়েছে। তিনি প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শ ছাড়াই মানবাধিকার কমিশন, তথ্য কমিশন, প্রেস কাউন্সিলসহ বিভিন্ন সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের প্রধান নিয়োগ দিতে পারবেন, যদিও এ বিষয়ে কিছু রাজনৈতিক দলের আপত্তি রয়েছে।

২০০৮ সালে নির্বাচিত হওয়ার পর ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা চারবার শপথ নিয়েছিলেন। এ পরিপ্রেক্ষিতে প্রধানমন্ত্রী পদের মেয়াদ সীমিত করার প্রস্তাব এসেছে। প্রস্তাব অনুযায়ী, একজন ব্যক্তি সর্বোচ্চ ১০ বছর বা দুই মেয়াদ প্রধানমন্ত্রী থাকতে পারবেন। একই সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী একাধিক পদে থাকতে পারবেন না - যা ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ রোধের উদ্যোগ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

সংসদ ও নির্বাচন ব্যবস্থার মৌলিক সংস্কার

জুলাই সনদের অন্যতম বড় পরিবর্তন হলো দ্বিকক্ষ বিশিষ্ট সংসদ ব্যবস্থা চালুর প্রস্তাব। উচ্চকক্ষে ১০০ জন সদস্য থাকবে এবং রাজনৈতিক দলগুলোর প্রাপ্ত ভোটের আনুপাতিক হারে আসন বণ্টন করা হবে।

নারীদের সংরক্ষিত আসন ৫০ থেকে বাড়িয়ে ১০০ করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে, যা নারীর রাজনৈতিক অংশগ্রহণ বৃদ্ধির উদ্যোগ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

এছাড়া ডেপুটি স্পিকার বিরোধী দল থেকে নির্বাচিত হবেন এবং সংসদ সদস্যরা বাজেট ও আস্থাবিল ছাড়া অন্যান্য বিষয়ে স্বাধীনভাবে ভোট দিতে পারবেন - যা সংসদীয় গণতন্ত্রে শক্তিশালী বিরোধী দল গঠনের সুযোগ সৃষ্টি করতে পারে।

নির্বাচন কমিশন গঠনের প্রক্রিয়াও বদলানোর প্রস্তাব রয়েছে। স্পিকারের নেতৃত্বে বিরোধী দল ও বিচার বিভাগের প্রতিনিধিদের নিয়ে কমিটি গঠনের মাধ্যমে ইসি গঠনের কথা বলা হয়েছে, যা কমিশনের স্বাধীনতা বাড়াতে পারে।

বিচার বিভাগ ও আইন ব্যবস্থার সংস্কার

জুলাই সনদ কার্যকর হলে সংবিধানের ৯৫ অনুচ্ছেদে পরিবর্তন আনা হবে বলে প্রস্তাব করা হয়েছে। বর্তমানে এই অনুচ্ছেদ অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি প্রধান বিচারপতি নিয়োগে পূর্ণ এখতিয়ার রাখেন। তবে নতুন প্রস্তাবে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের প্রধান বিচারপতি অবশ্যই আপিল বিভাগ থেকে নিয়োগ পেতে হবে।

বিদ্যমান সংবিধানে আপিল বিভাগের বিচারকের সংখ্যা নির্ধারণের ক্ষমতা সরকারের হাতে থাকলেও জুলাই সনদে এ বিষয়ে ভিন্ন অবস্থান নেওয়া হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, প্রধান বিচারপতির প্রয়োজন ও সুপারিশের ভিত্তিতে বিচারকের সংখ্যা নির্ধারিত হবে। অতীতে হাইকোর্ট বিভাগের বিচারক নিয়োগে প্রধানমন্ত্রীর প্রভাব ছিল বলে সমালোচনা রয়েছে; নতুন প্রস্তাবে এ দায়িত্ব প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বাধীন একটি কমিশনের ওপর ন্যস্ত করার কথা বলা হয়েছে।

সনদে বিচার বিভাগের পূর্ণ স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে সাংবিধানিক সুরক্ষা জোরদারের কথাও উল্লেখ আছে। পাশাপাশি দেশের প্রতিটি বিভাগে হাইকোর্টের এক বা একাধিক বেঞ্চ স্থাপন, সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল-কে আরও কার্যকর করা এবং অধস্তন আদালতের বিচারকদের চাকরি-সংক্রান্ত নিয়ন্ত্রণ বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট-এর হাতে অর্পণের প্রস্তাব অন্তর্ভুক্ত হয়েছে।

সংবিধানে ন্যায়পাল নিয়োগের বিধান আগে থেকেই থাকলেও তা কখনো বাস্তবায়িত হয়নি। জুলাই সনদে ন্যায়পাল নিয়োগের জন্য সাত সদস্যের একটি কমিটি গঠনের প্রস্তাব করা হয়েছে। এ কমিটিতে থাকবেন স্পিকার (সভাপতি), বিরোধী দল থেকে নির্বাচিত ডেপুটি স্পিকার, প্রধানমন্ত্রী, বিরোধী দলীয় নেতা, দ্বিতীয় বৃহত্তম বিরোধী দলের প্রতিনিধি, রাষ্ট্রপতির মনোনীত প্রতিনিধি এবং আপিল বিভাগের একজন বিচারপতি।

এ ছাড়া সরকারি কর্মকমিশন, মহা হিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রক, এবং দুর্নীতি দমন কমিশন-এর চেয়ারম্যান ও কমিশনার নিয়োগেও বিরোধী দলের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে পৃথক কমিটি গঠনের প্রস্তাব রয়েছে। তবে এসব প্রস্তাবের কিছু অংশের বিষয়ে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)সহ সাতটি দল নোট অব ডিসেন্ট বা আপত্তি জানিয়েছে।

প্রশাসন ও আইনগত সংস্কার

সাংবিধানিক সংস্কারের বাইরে ৩৭টি আইন ও নির্বাহী সংস্কার প্রস্তাব রয়েছে, যার মধ্যে রয়েছে বিচার ব্যবস্থার ডিজিটালাইজেশন, স্বাধীন ফৌজদারি তদন্ত সার্ভিস গঠন, জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশন প্রতিষ্ঠা এবং নতুন প্রশাসনিক বিভাগ গঠন।

কুমিল্লা ও ফরিদপুর নামে দুটি নতুন প্রশাসনিক বিভাগ গঠনের প্রস্তাবও রয়েছে, যা প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরণের অংশ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

গণভোটের সীমাবদ্ধতা ও ভোটার বিভ্রান্তি

গণভোটের ব্যালটে মাত্র চারটি সংক্ষিপ্ত প্রশ্ন অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে, ফলে অনেক ভোটারের পক্ষে বোঝা কঠিন ছিল ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ ভোট দিলে ঠিক কী পরিবর্তন আসবে। বিশ্লেষকদের মতে, এত বড় সাংবিধানিক পরিবর্তনের বিষয়ে সাধারণ ভোটারদের পর্যাপ্ত তথ্য না থাকায় সিদ্ধান্ত গ্রহণ কঠিন হয়ে পড়ে।

রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ ও সম্ভাব্য প্রভাব

বিশেষজ্ঞদের মতে, ‘হ্যাঁ’ জয়ী হলে বাংলাদেশ একটি গভীর সাংবিধানিক রূপান্তরের পথে প্রবেশ করবে, যা রাষ্ট্রের ক্ষমতার ভারসাম্য, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ও সংসদীয় গণতন্ত্রকে নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করতে পারে।

অন্যদিকে, ‘না’ জয়ী হলে বর্তমান রাজনৈতিক কাঠামো বহাল থাকবে এবং সংস্কার প্রক্রিয়া রাজনৈতিক আলোচনার মাধ্যমে এগোতে হবে, যা দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক সংঘাত ও অচলাবস্থার সম্ভাবনা তৈরি করতে পারে।

রাষ্ট্র সংস্কারের পথে বাংলাদেশ, বাস্তবায়নেই আসল পরীক্ষা

১২ ফেব্রুয়ারির সংসদ নির্বাচন ও জুলাই সনদ গণভোট বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ মোড় হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। একদিকে জনগণের ভোটে নতুন সংসদ গঠনের প্রক্রিয়া, অন্যদিকে রাষ্ট্রের সাংবিধানিক কাঠামো পরিবর্তনের বিষয়ে সরাসরি জনমত  এই দুই প্রক্রিয়ার সমন্বয় বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক অভিযাত্রায় একটি নতুন মাত্রা যোগ করেছে।

গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোটের বিজয়ের মাধ্যমে বাংলাদেশ একটি গভীর সাংবিধানিক রূপান্তরের পথে প্রবেশ করেছে। এর ফলে রাষ্ট্রপতি-প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতার ভারসাম্য, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, সংসদীয় কাঠামো এবং নির্বাচন ব্যবস্থায় মৌলিক পরিবর্তনের পথ উন্মুক্ত হয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এসব সংস্কার বাস্তবায়ন হলে ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ, জবাবদিহিতা এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর স্বচ্ছতা ও কার্যকারিতা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়তে পারে।

তবে বাস্তবায়নের প্রক্রিয়া সহজ হবে না বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা। রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে মতবিরোধ, সংসদে আইন পাসের জটিলতা এবং প্রশাসনিক কাঠামোর পুনর্গঠন - সব মিলিয়ে সামনে একটি দীর্ঘ ও চ্যালেঞ্জপূর্ণ রূপান্তর প্রক্রিয়া অপেক্ষা করছে। তবুও জনগণের এই গণরায় রাষ্ট্র সংস্কারের জন্য একটি শক্ত গণতান্ত্রিক ভিত্তি তৈরি করেছে।

সব মিলিয়ে, এই নির্বাচন ও গণভোট শুধু ক্ষমতার পালাবদল নয়, বরং বাংলাদেশের রাষ্ট্র কাঠামো পুনর্গঠনের একটি ঐতিহাসিক গণতান্ত্রিক সিদ্ধান্ত হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। নতুন সংসদের সামনে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে - জনগণের দেওয়া এই সংস্কারের ম্যান্ডেট বাস্তবে রূপ দেওয়া এবং একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক, জবাবদিহিমূলক ও আধুনিক রাষ্ট্র ব্যবস্থার ভিত্তি স্থাপন করা।


সম্পর্কিত নিউজ