{{ news.section.title }}
মার্চ মাসের জন্য জ্বালানি তেলের দাম নির্ধারণ
বাংলাদেশে মার্চ মাসেও জ্বালানি তেলের দাম অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে। সরকার ঘোষিত ‘জ্বালানি তেলের স্বয়ংক্রিয় মূল্য নির্ধারণ নির্দেশিকা (সংশোধিত)’ অনুযায়ী মার্চ মাসজুড়ে প্রতি লিটার ডিজেল ১০০ টাকা, অকটেন ১২০ টাকা, পেট্রোল ১১৬ টাকা এবং কেরোসিন ১১২ টাকা দরে বিক্রি হবে।
উল্লেখ্য, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (IMF) ঋণের শর্ত মেনে গত বছরের মার্চ থেকে অন্তর্বর্তী সরকার স্বয়ংক্রিয় মূল্য নির্ধারণ (Automatic Pricing) পদ্ধতি চালু করেছিলো। এই পদ্ধতির মাধ্যমে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম কমলে দেশে কমে যায় এবং বাড়লে দেশের বাজারেও দাম বৃদ্ধি পায়।
এই পদ্ধতিতে প্রতি মাসেই বিশ্ববাজারের সঙ্গে মিল রেখে জ্বালানি তেলের দাম সমন্বয় করে আসছে কর্তৃপক্ষ। দেশে নির্বাচনী সরকার গঠনের পরেও এই পদ্ধতি অনুসরণ করেই নতুন মাসের মূল্য নির্ধারণ করা হলো।
দেশের বাজারে এই একই পদ্ধতি অনুসরণ করে বিইআরসি (BERC) এলপিজি গ্যাসের দামও (LPG Gas Price) প্রতি মাসে নির্ধারণ করে। যদিও নতুন বছর শুরুর থেকে বাজার সিন্ডিকেটের জন্য এলপিজি গ্যাস সিলিন্ডার আকাশ ছোয়া মূল্যে চলে যায়।
আমাদের দেশে প্রতি বছর প্রায় ৭৫ লাখ টন জ্বালানি তেলের চাহিদা রয়েছে বলে জানায় বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (BPC)। এই চাহিদার সিংহভাগ, প্রায় ৭৫ শতাংশই হলো ডিজেল।
গণপরিবহন, কৃষি সেচ, বাসাবাড়ি ও প্রতিষ্ঠানের জেনারেটরে ডিজেলের ব্যাপক ব্যবহার করা হয়। অপরিবর্তিত এই দাম রোজার মাসে গ্রাহকদের বাড়তি কোনো চাপের মুখে ফেলবেনা বলে আশা করা হচ্ছে।
দেশের বাকি ২৫ শতাংশ জ্বালানীর চাহিদা মেটায় পেট্রোল, অকটেন ও কেরোসিন।
উল্লেখ্য, নির্ধারিত এই মূল্য দেশের সকল ফিলিং স্টেশনে কার্যকর হবে। তবে যদি কোনো নির্দিষ্ট দূরবর্তী এলাকায় পরিবহন খরচ যুক্ত হয়ে খুচরা পর্যায়ে মূলের তারতম্য (কয়েক পয়সার ব্যবধান) দেখা যায়, তা স্থানীয় পাম্প মালিকদের সমন্বয়ের কারণে হতে পারে। গ্রাহকদের এই বিষয়ে আস্থা রাখতে ও সেবা গ্রহণের জন্য অনুরোধ করা হলো।
তবে কোথাও আকাশচুম্বী মূল্য দাবী করা হলে তৎক্ষণাৎ প্রশাসনকে জানানোর জন্য বলা হলো।
বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে-আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে এই মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে এবং তা যথাযথ কর্তৃপক্ষের অনুমোদিত।
তবে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় ও বিশ্ব অর্থনীতির দিক থেকে চলমান উত্তেজনা, বিশেষ করে ইরান ও ইসরায়েলের সংঘাত এবং হরমুজ প্রণালীর নিরাপত্তা, তেলের ভবিষ্যৎ দামের ওপর বিশাল প্রভাব ফেলতে পারে। এতে সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা ও বাংলাদেশসহ উন্নয়নশীল দেশগুলোর অর্থনীতিতে চরম চাপ সৃষ্টি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
হরমুজ প্রণালির কৌশলগত গুরুত্ব ও ঝুঁকি
হরমুজ প্রণালি হলো বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তেল পরিবহন রুটগুলোর একটি, যার মাধ্যমে প্রতিদিন বিশ্বের মোট জ্বালানি তেলের প্রায় ২০% বা ২ কোটি ব্যারেলের ওপর সরবরাহ হয়। এটি পারস্য উপসাগরকে আরব সাগরের সাথে যুক্ত করে এবং বিশ্বের বড় বড় তেল নিঃসরণকারী ও রপ্তানিকারী দেশগুলোর জ্বালানি এই রুট দিয়েই চলে।
বর্তমান ইরান–ইসরায়েল সংঘাতের মধ্যে অংশ হিসেবে ইরান হরমুজ প্রণালি বন্ধ করার হুমকি দিয়েছে এবং এতে বাজারে অন্তত তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ৯৫ থেকে ১১০ ডলারে ওঠার শঙ্কা দেখা দিয়েছে। শঙ্কা রয়েছে, সরবরাহে সামান্য বাধা থাকলেও দাম স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক বেশি বিশ্বব্যাপী বহু আলোচনায় ভূরাজনৈতিক প্রিমিয়াম যুক্ত হয়ে উঠতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে অসম্পূর্ণ সরবরাহ বা প্রণালিতে বাধা থাকলে তেলের দাম $100 বা তারও বেশি পর্যন্ত উঠতে পারে, যা বিশ্ব অর্থনীতিতে মূল্যস্ফীতি ও পণ্যের খরচ বৃদ্ধির সরাসরি কারণ হবে।
জানুয়ারি–ফেব্রুয়ারি–মার্চ: দামের ধারাবাহিকতা
চলতি বছরের জানুয়ারি মাসে আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম তুলনামূলক স্থিতিশীল থাকায় দেশে বড় ধরনের সমন্বয় হয়নি। ফেব্রুয়ারিতেও একই হার বজায় ছিল। মার্চে এসে সরকার সেই ধারাবাহিকতাই ধরে রেখেছে। অর্থাৎ টানা তিন মাস ধরে ভোক্তা পর্যায়ে দামে বড় পরিবর্তন আসেনি।
বিশ্লেষকরা বলছেন, আন্তর্জাতিক বাজারে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ব্যারেলপ্রতি ৭৫–৮৫ ডলারের মধ্যে ওঠানামা করায় সরকার আপাতত চাপ সামলাতে পারছে। তবে পরিস্থিতি যেকোনো সময় বদলে যেতে পারে।
ইরান–ইসরায়েল–আমেরিকা উত্তেজনা: হরমুজ প্রণালী বন্ধ হলে কী হবে?
বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ জ্বালানি তেল হরমুজ প্রণালী দিয়ে পরিবাহিত হয়। ইরান–ইসরায়েল–যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য সামরিক সংঘাত যদি তীব্র হয় এবং হরমুজ প্রণালী সাময়িকভাবে বন্ধ হয়ে যায়, তাহলে বৈশ্বিক বাজারে তেলের দাম হঠাৎ ১২০–১৫০ ডলার পর্যন্ত লাফ দিতে পারে-এমন আশঙ্কা আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের।
এমন পরিস্থিতি তৈরি হলে বাংলাদেশেও তেলের দাম বাড়ার ঝুঁকি তৈরি হবে। কারণ বাংলাদেশ তার চাহিদার বড় অংশ আমদানিনির্ভর। আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বাড়লে সরকারকে ভর্তুকি বাড়াতে হবে, অথবা খুচরা পর্যায়ে মূল্য সমন্বয় করতে হবে।
বিশ্বজুড়ে মূল্যবৃদ্ধি ও তেলের বাজারে ইতোমধ্যেই প্রতিক্রিয়া
এখন পর্যন্ত সংঘাতের কারণে হরমুজ প্রণালিতে পরিবহনকারীরা নৌ চলাচল স্থগিত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে, যার ফলে সরবরাহের অনিশ্চয়তা বেড়েছে এবং বাজারে এক নতুন ধরনের ভূরাজনৈতিক ঝুঁকির সৃষ্টি হয়েছে।
এদিকে, বিশ্বের বড় বড় শিপিং ইস্যুর বিমা খরচও বিভিন্ন সংস্থা ৫০% পর্যন্ত বাড়াতে শুরু করেছে, যা সরাসরি পরিবহন খরচে চাপ দিচ্ছে। জাহাজ মালিকরা এই ভূরাজনৈতিক ঝুঁকি এড়ানোর জন্য পথ পরিবর্তন ও পরিকল্পনার কথা ভাবছে, যা সরবরাহ শৃঙ্খলের ক্ষেত্রে নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে।
বিশ্লেষকরা জানিয়েছেন, যদি সংঘাত দীর্ঘায়িত হয়, তাহলে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম $80–$100 বা তারও বেশি পর্যায়ে দাঁড়াতে পারে এবং বিশ্বব্যাপী মূল্যস্ফীতি তীব্রভাবে বাড়তে পারে।
বাংলাদেশে সম্ভাব্য প্রভাব
তেলের দাম বাড়লে শুধু পরিবহন খাত নয়, নিম্নোক্ত খাতগুলোও চাপে পড়বে-
- পণ্য পরিবহন ও ভাড়া বৃদ্ধি
- শিল্প উৎপাদন খরচ বাড়া
- নিত্যপণ্যের মূল্য বৃদ্ধি
- বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি
- কৃষি উৎপাদন খরচ বাড়া
এর সরাসরি প্রভাব পড়বে বাজারদর ও সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায়। অতীতে দেখা গেছে, জ্বালানি মূল্যবৃদ্ধি হলে কয়েক সপ্তাহের মধ্যে বাজারে সব পণ্যের ওপর চাপ পড়ে।
ইতিহাস কী বলছে?
২০০৩ সালে ইরাক যুদ্ধের সময় বৈশ্বিক তেলের দাম দ্রুত বাড়ে। আবার ২০১৯ সালে সৌদি আরবের আরামকো স্থাপনায় ড্রোন হামলার পর বিশ্ববাজারে তেলের দাম একদিনে প্রায় ১৫–২০ শতাংশ পর্যন্ত লাফ দেয়।
২০২১–২২ সালে রাশিয়া–ইউক্রেন যুদ্ধের সময় তেলের দাম ১৩০ ডলারের কাছাকাছি পৌঁছেছিল। সেই সময় বাংলাদেশে এক দফায় জ্বালানি তেলের দাম বড় পরিসরে সমন্বয় করা হয়, যা বাজারে উল্লেখযোগ্য প্রভাব ফেলে।
২০২৪ সালের এপ্রিল মাসে ইরানের প্রতিরোধ মিসাইল হামলার পর পরিস্থিতি আন্তর্জাতিক বাজারে ইতোমধ্যেই প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। ইসরেল ও যুক্তরাষ্ট্রের হামলা ও পাল্টা জবাবে মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতা বেড়েছে এবং আন্তর্জাতিক স্টক ও অর্থনীতি এতে প্রভাবিত হয়েছে। প্রতি তেলের তীব্র ওঠাপড়া কিংবা নিরাপত্তা ঝুঁকি বিশ্বব্যাপী বিনিয়োগকারীদের মনোবল খারাপ করেছে এবং ডিফেন্স শিল্প ও নিরাপত্তা সংশ্লিষ্ট খাতে বিনিয়োগে চাপ সৃষ্টি করেছে।
এই সংঘাতের ফলে তেলের সরবরাহে বিঘ্ন এসে থাকলে আন্তর্জাতিক ক্রুড তেলের দাম ফলে বাড়তে পারে, বিশেষ করে যদি ইরানের বড় তেল বন্দর বা রপ্তানি ইনফ্রাস্ট্রাকচারে সরাসরি আঘাত লাগে। এতে ব্রেন্ট ও ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট (WTI) উভয় ড benchmarks হিসেবে মূল্য বাড়বে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
রমজান বা ঈদের সময় যদি এমন সংঘাত হয়, তাহলে চাহিদা বাড়ার কারণে বাজারে প্রভাব আরও তীব্র হতে পারে-এমন নজির অতীতেও রয়েছে।
এই মুহূর্তে মার্চ মাসে দাম অপরিবর্তিত থাকলেও আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি অস্থিতিশীল। হরমুজ প্রণালী নিয়ে উত্তেজনা বাড়লে বিশ্ববাজারে অস্থিরতা তৈরি হতে পারে।