{{ news.section.title }}
সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে বাংলাদেশের তিনটি ঝুঁকি
মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে উত্তেজনা বাড়ায় বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে অনিশ্চয়তা তৈরি হলেও বাংলাদেশে তাৎক্ষণিক সরবরাহ সংকটের আশঙ্কা দেখছে না বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি)। সরকার-টু-সরকার (জি-টু-জি) চুক্তি এবং আন্তর্জাতিক উন্মুক্ত দরপত্রের আওতায় নির্ধারিত সময় পর্যন্ত পরিশোধিত জ্বালানি আমদানির ব্যবস্থা আগেই সম্পন্ন রয়েছে। পাশাপাশি বিকল্প রুট ব্যবহারের প্রস্তুতিও রাখা হয়েছে।
তবে পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হলে আন্তর্জাতিক বাজারে দামের ঊর্ধ্বগতি, আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে নতুন চাপ-এই তিনটি ঝুঁকি সামনে বড় হয়ে উঠতে পারে বলে মনে করছেন জ্বালানি ও অর্থনীতি বিশ্লেষকরা।
সরবরাহ পরিস্থিতি ও বিকল্প রুট
বিপিসি সূত্র জানায়, চীন, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া ও সিঙ্গাপুর থেকে পরিশোধিত জ্বালানি আমদানি অব্যাহত রয়েছে। অপরিশোধিত তেল আসছে সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে। অতীতে এসব চালানের বড় অংশ হরমুজ প্রণালি হয়ে এলেও সম্ভাব্য ঝুঁকি বিবেচনায় ফুজাইরাহ টার্মিনালকে বিকল্প সরবরাহ কেন্দ্র হিসেবে প্রস্তুত রাখা হয়েছে। বছরে ১৪ থেকে ১৫ লাখ টন অপরিশোধিত তেল বিকল্প রুটে আনার সক্ষমতা গড়ে তোলা হয়েছে।
বর্তমানে বিপিসির হাতে প্রায় ৩০ দিনের কৌশলগত মজুত রয়েছে। মাসভিত্তিক আমদানি ও পরিশোধন বাবদ গড়ে ৪৫০ থেকে ৫০০ মিলিয়ন ডলার ব্যয় হয়। দীর্ঘমেয়াদি চুক্তিতে নির্ধারিত প্রিমিয়াম থাকায় তাৎক্ষণিকভাবে স্পট মার্কেটের পুরো চাপ পড়ছে না। তবে স্পট দামে বড় উল্লম্ফন হলে ভবিষ্যৎ চালানের ব্যয় বাড়বে-এমন আশঙ্কা রয়েছে।
হরমুজ প্রণালির ভূরাজনৈতিক ঝুঁকি
মার্কিন জ্বালানি তথ্য সংস্থার হিসাব অনুযায়ী, বিশ্বে প্রতিদিন ব্যবহৃত অপরিশোধিত তেলের প্রায় ১৮–১৯ মিলিয়ন ব্যারেল, অর্থাৎ মোট চাহিদার প্রায় এক-পঞ্চমাংশ, হরমুজ প্রণালি দিয়ে পরিবাহিত হয়। বৈশ্বিক তরল প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) বাণিজ্যের প্রায় এক-তৃতীয়াংশও এই পথ নির্ভর। ফলে এই রুটে দীর্ঘস্থায়ী বিঘ্ন বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ শৃঙ্খলকে নড়বড়ে করে দিতে পারে।
আন্তর্জাতিক বাজারে ইতোমধ্যে ভূরাজনৈতিক প্রিমিয়াম যুক্ত হতে শুরু করেছে। ফেব্রুয়ারির মাঝামাঝি ব্যারেলপ্রতি অপরিশোধিত তেলের দাম যেখানে ৬১ ডলারের কাছাকাছি ছিল, তা সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে ৬৭ ডলারের ঘরে উঠে আসে। ব্রেন্ট ও মারবান ক্রুড ৭৩–৭৪ ডলারের মধ্যে লেনদেন হয়েছে। বড় ধরনের অবরোধ বা সামরিক উত্তেজনা বেড়ে গেলে দাম ৯৫ থেকে ১১০ ডলারের মধ্যে পৌঁছাতে পারে-এমন সতর্কবার্তা দিয়েছে একাধিক আন্তর্জাতিক বিশ্লেষক সংস্থা। বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠান গোল্ডম্যান স্যাকসও অতীতে সতর্ক করেছে, বড় অবরোধে ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলার ছাড়ানোর ঝুঁকি রয়েছে।
ভারতের ইকুইরাস সিকিউরিটিজের বিশ্লেষণ বলছে, সরবরাহে প্রতি ১ শতাংশ বিঘ্ন ঘটলে আন্তর্জাতিক বাজারে দাম ৩ থেকে ৫ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে। ইরানের দৈনিক উৎপাদন প্রায় ৩৩ লাখ ব্যারেল-যা বৈশ্বিক সরবরাহের প্রায় ৩ শতাংশ। ফলে ইরানকেন্দ্রিক উত্তেজনা সরাসরি বাজারে প্রতিফলিত হওয়ার ঝুঁকি রাখে।
জাহাজ চলাচল, বীমা ব্যয় ও সরবরাহ শৃঙ্খল
সংঘাত দীর্ঘ হলে জাহাজ চলাচলের বীমা ব্যয় বাড়তে পারে, যা পরিবহন খরচে তাৎক্ষণিক প্রভাব ফেলবে। লোহিত সাগর সংকটের সময় অনেক জাহাজ কেপ অব গুড হোপ ঘুরে চলাচল করায় খরচ এক-তৃতীয়াংশ পর্যন্ত বেড়েছিল এবং গন্তব্যে পৌঁছাতে সময় লেগেছিল দুই থেকে তিন সপ্তাহ বেশি। হরমুজে দীর্ঘ অচলাবস্থা তৈরি হলে পরিস্থিতি আরও জটিল হতে পারে।
দুবাইয়ের জেবেল আলি বন্দর হয়ে কনটেইনার চলাচলেও এই রুট ব্যবহৃত হয়। ফলে মধ্যপ্রাচ্যে বাংলাদেশের রপ্তানি-বিশেষ করে তৈরি পোশাক, সিরামিক, ওষুধ ও হালকা প্রকৌশল পণ্য-পরিবহনে খরচ বাড়ার ঝুঁকি রয়েছে। চট্টগ্রাম বন্দরে আসা-যাওয়া করা জাহাজের ভাড়া কয়েক গুণ বাড়তে পারে বলে শিপিং সংশ্লিষ্টরা আশঙ্কা করছেন।
বাংলাদেশের আমদানি নির্ভরতা ও অভ্যন্তরীণ প্রভাব
বিপিসির পরিচালনা ও পরিকল্পনা বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরে দেশে জ্বালানি তেলের ব্যবহার প্রায় ৬৮ লাখ টনে পৌঁছাতে পারে। এর প্রায় ৮০ শতাংশ আসে মধ্যপ্রাচ্য থেকে। মাসে গড়ে সাড়ে চার থেকে পাঁচ লাখ টন জ্বালানি আমদানি হয়। কৃষি, শিল্পকারখানা ও গণপরিবহন খাত প্রধান ভোক্তা।
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, তেলের দাম বাড়লে বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয় বাড়বে, যার প্রভাব পড়বে কৃষকের সেচ ব্যয় ও শিল্পের উৎপাদন খরচে। পরিবহন ব্যয় বাড়লে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্যস্ফীতি বাড়তে পারে। সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে সামগ্রিক অর্থনীতিতে চাপ বাড়বে।
এলএনজি আমদানির ঝুঁকি
পরিশোধিত তেলের তুলনায় এলএনজি খাতে ঝুঁকি বেশি। দীর্ঘমেয়াদি চুক্তিতে আনা এলএনজির বড় অংশই হরমুজ প্রণালি হয়ে আসে। সংঘাত বাড়লে এলএনজি সরবরাহে বিঘ্ন ও স্পট মার্কেটে দামের উল্লম্ফন ঘটতে পারে। এতে বিদ্যুৎ উৎপাদন ও শিল্প খাতে অনিশ্চয়তা তৈরি হবে। বর্তমানে দেশীয় উৎস থেকে দৈনিক ১৭১ কোটি ঘনফুট গ্যাস আসে এবং আমদানিকৃত এলএনজি থেকে ৮৫ থেকে ১০০ কোটি ঘনফুট যোগ হয়। এলএনজি ব্যাহত হলে গ্যাসঘাটতি আরও বাড়তে পারে।
খাত-সংশ্লিষ্টরা পরামর্শ দিচ্ছেন-দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির পরিধি বাড়ানো, আফ্রিকা ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বিকল্প উৎস বিবেচনা করা এবং কৌশলগত মজুত সক্ষমতা বৃদ্ধি করা জরুরি। নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগ বাড়ানোও সময়ের দাবি।
রিজার্ভ ও ভর্তুকি চ্যালেঞ্জ
বিশ্লেষকদের মতে, জ্বালানি আমদানি বিল বাড়লে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে নতুন চাপ তৈরি হবে। ইউক্রেন ও গাজা যুদ্ধের পর দুই বছরে রিজার্ভ ৪৮ বিলিয়ন ডলার থেকে ২০ বিলিয়নের নিচে নেমে এসেছিল। একই পরিস্থিতি পুনরাবৃত্তি হলে বাজেট ঘাটতি ও ঋণচাপ বাড়তে পারে।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞদের মতে, সরকারকে দুই পথের একটিতে হাঁটতে হতে পারে-ভর্তুকি বাড়ানো অথবা খুচরা মূল্য সমন্বয় করা। ভর্তুকি বাড়ালে বাজেট চাপ বাড়বে; মূল্য সমন্বয় করলে পরিবহন, কৃষি ও শিল্প খাতে ব্যয় বৃদ্ধি পাবে এবং তার প্রভাব পড়বে ভোক্তা পর্যায়ে।
বাংলাদেশের জ্বালানি ঝুঁকি
তাৎক্ষণিকভাবে বাংলাদেশে জ্বালানি সরবরাহে বড় ধরনের সংকটের আভাস না থাকলেও মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হলে বৈশ্বিক বাজারে অস্থিরতা বাড়বে। বিকল্প সরবরাহ পথ সক্রিয় রাখা, দীর্ঘমেয়াদি মূল্যচুক্তি জোরদার করা, কৌশলগত মজুত বাড়ানো এবং জ্বালানি উৎস বৈচিত্র্যকরণ-এই চারটি পদক্ষেপ এখন নীতিনির্ধারকদের অগ্রাধিকারে থাকা প্রয়োজন।
বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলছেন, আপাত স্বস্তিতে আত্মতুষ্টির সুযোগ নেই। হরমুজ প্রণালির সামান্য বিঘ্নও বিশ্ব জ্বালানি বাজারে বড় ঢেউ তুলতে পারে-আর সেই ঢেউয়ের প্রভাব থেকে বাংলাদেশ পুরোপুরি নিরাপদ নয়।