{{ news.section.title }}
পাগলা মসজিদের গরু কিনেও টাকা দেননি, বিতর্কে কথিত বিএনপি নেতা
কিশোরগঞ্জের ঐতিহ্যবাহী পাগলা মসজিদের নিলামে কেনা দানের একটি গরুর মূল্য প্রায় এক বছর ধরে পরিশোধ না করার অভিযোগ উঠেছে মো. জীবন মিয়া (২৮) নামে এক ব্যক্তির বিরুদ্ধে, যিনি নিজেকে বিএনপির নেতা হিসেবে পরিচয় দিয়ে থাকেন।
বিষয়টি নিয়ে মসজিদ প্রশাসন ও স্থানীয়দের মধ্যে ব্যাপক আলোচনা সৃষ্টি হয়েছে। একই সঙ্গে সম্প্রতি মসজিদে নিলামকে কেন্দ্র করে সাংবাদিকদের ওপর হামলার ঘটনাতেও তার সম্পৃক্ততার অভিযোগ উঠেছে।
মসজিদ প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, গত বছরের ৯ ফেব্রুয়ারি পাগলা মসজিদ প্রাঙ্গণে অনুষ্ঠিত দানকৃত পশু ও অন্যান্য সামগ্রীর নিলামে জীবন মিয়া ৫৫ হাজার টাকায় একটি গরু ক্রয় করেন। নিলাম প্রক্রিয়ার নিয়ম অনুযায়ী, যে ব্যক্তি নিলামে কোনো সামগ্রী কিনবেন তাকে তাৎক্ষণিকভাবে সম্পূর্ণ মূল্য পরিশোধ করতে হয়। কিন্তু জীবন মিয়া নিলামের সময় টাকা পরিশোধ না করে পরে দেওয়ার কথা বলে গরুটি নিয়ে যান বলে জানা গেছে।
এ ঘটনার পর প্রায় এক বছর পার হয়ে গেলেও এখনো পর্যন্ত গরুটির মূল্য পরিশোধ করা হয়নি বলে জানিয়েছে মসজিদ কর্তৃপক্ষ। এতে করে নিলাম কার্যক্রমের স্বচ্ছতা ও নিয়ম-শৃঙ্খলা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
পাগলা মসজিদের প্রশাসনিক কর্মকর্তা জুবায়ের আহমেদ বলেন, “গরুর মূল্য পরিশোধের জন্য জীবন মিয়াকে একাধিকবার যোগাযোগ করে তাগাদা দেওয়া হয়েছে। তাকে বারবার জানানো হয়েছে যে নিলামের টাকা দ্রুত পরিশোধ করতে হবে। কিন্তু এখন পর্যন্ত কোনো অর্থ জমা দেওয়া হয়নি।” তিনি আরও জানান, বিষয়টি ইতোমধ্যে মসজিদ পরিচালনা কমিটির সভাপতি এবং সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবহিত করা হয়েছে।
এ বিষয়ে পাগলা মসজিদ পরিচালনা কমিটির সভাপতি এবং জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ আসলাম মোল্লা বলেন, বিষয়টি তার কাছে নতুন। তিনি বলেন, “নিলামের গরু কীভাবে বাকিতে বিক্রি হলো তা খতিয়ে দেখা হবে। যদি কোনো অনিয়ম হয়ে থাকে, তাহলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
এদিকে জীবন মিয়া নিজেকে কিশোরগঞ্জ পৌর বিএনপির ৫ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য হিসেবে পরিচয় দিলেও স্থানীয় বিএনপি নেতারা তার এই দাবি অস্বীকার করেছেন। পৌর বিএনপির সভাপতি আমিনুল ইসলাম আশফাক বলেন, “পৌরসভার ওই ওয়ার্ডে এখন পর্যন্ত বিএনপির কোনো কমিটি গঠন করা হয়নি। ফলে তিনি ওই ওয়ার্ডের বিএনপির সদস্য-এ দাবি সঠিক নয়।”
স্থানীয় রাজনৈতিক মহলের মতে, রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহার করে প্রভাব বিস্তার করার চেষ্টা থেকেই এমন দাবি করা হতে পারে। তারা বলেন, মসজিদের মতো একটি ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের নিলাম কার্যক্রমে কোনো ধরনের প্রভাব বা অনিয়ম গ্রহণযোগ্য নয়।
এর মধ্যে গত বৃহস্পতিবার বিকেলে পাগলা মসজিদে চলমান নিলাম কার্যক্রমকে কেন্দ্র করে আরেকটি উত্তেজনাকর ঘটনা ঘটে। অভিযোগ রয়েছে, নিলামের সময় সাংবাদিকরা ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়ে সংবাদ সংগ্রহ করতে গেলে জীবন মিয়ার নেতৃত্বে তাদের ওপর হামলা চালানো হয়।
এই হামলায় চ্যানেল টোয়েন্টিফোরের কিশোরগঞ্জ জেলা প্রতিনিধি খায়রুল আলম ফয়সাল এবং গ্লোবাল টিভির জেলা প্রতিনিধি ফয়জুল ইসলাম ভূঁইয়া পিংকু আহত হন। স্থানীয়রা তাদের উদ্ধার করে চিকিৎসার ব্যবস্থা করেন।
পরে আহত সাংবাদিক ফয়জুল ইসলাম ভূঁইয়া পিংকু বাদী হয়ে জীবন মিয়াকে প্রধান আসামি করে কিশোরগঞ্জ মডেল থানায় একটি মামলা দায়ের করেন। মামলায় আটজনের নাম উল্লেখ করা হয়েছে এবং অজ্ঞাতনামা আরও ৮ থেকে ১০ জনকে আসামি করা হয়েছে।
কিশোরগঞ্জ মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ আবুল কালাম ভূঁইয়া জানান, ঘটনার পর পুলিশ অভিযান চালিয়ে জীবন মিয়া ও মনা নামে আরও একজনকে গ্রেপ্তার করেছে। তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার প্রক্রিয়া চলছে এবং ঘটনার সঙ্গে জড়িত অন্যদের শনাক্ত করার চেষ্টা করছে পুলিশ।
স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, পাগলা মসজিদের নিলাম কার্যক্রমকে ঘিরে দীর্ঘদিন ধরেই একটি প্রভাবশালী চক্র সক্রিয় রয়েছে। তাদের অভিযোগ, কিছু ব্যক্তি নিলামে অংশ নিয়ে নানা কৌশলে প্রভাব বিস্তার করার চেষ্টা করেন এবং মাঝে মাঝে বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি তৈরি করেন।
স্থানীয়দের দাবি, পাগলা মসজিদ দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান। এখানে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে মানুষ দান করতে আসেন এবং সেই দানের অর্থ ও সামগ্রী নিলামের মাধ্যমে বিক্রি করে মসজিদের বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কাজে ব্যয় করা হয়। তাই এই নিলাম কার্যক্রম যেন সম্পূর্ণ স্বচ্ছ ও নিয়মতান্ত্রিকভাবে পরিচালিত হয়, তা নিশ্চিত করা জরুরি।
তারা আরও বলেন, সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোর সুষ্ঠু তদন্ত করে দায়ীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হলে ভবিষ্যতে এ ধরনের অনিয়ম ও সহিংসতা কমে আসবে। একই সঙ্গে মসজিদ প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সমন্বয়ে নিলাম কার্যক্রম পরিচালনার দাবি জানিয়েছেন তারা।