{{ news.section.title }}
দেশে হামে ৪৭ শিশুর মৃত্যু, দায় অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের
দেশে গত বছর হামের টিকাদান কার্যক্রমে উদ্বেগজনক ব্যত্যয় দেখা দিয়েছে। ২০২৫ সালে মাত্র ৫৬ দশমিক ২ শতাংশ শিশু হামের টিকা পেয়েছে, অর্থাৎ প্রায় ৪৩ দশমিক ৮ শতাংশ শিশু টিকার বাইরে থেকে গেছে। গত ৯ বছরের মধ্যে এটিই সর্বনিম্ন কভারেজ, যা জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মধ্যে শঙ্কা তৈরি করেছে।
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিপুলসংখ্যক শিশু টিকার বাইরে থাকায় ভবিষ্যতে হামের সংক্রমণ আরও বাড়তে পারে। বিশেষ করে যেসব শিশু একেবারেই টিকা নেয়নি বা আংশিক ডোজ পেয়েছে, তাদের মধ্যে সংক্রমণের ঝুঁকি বেশি।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, মাঠপর্যায়ে নানা সমস্যার কারণে টিকাদান কার্যক্রমে বড় ধরনের বিঘ্ন ঘটেছে। স্বাস্থ্য সহকারীদের কর্মবিরতি, ভিটামিন ‘এ’ ক্যাম্পেইনে অনিয়ম এবং প্রশাসনিক দুর্বলতা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে।
সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচি (ইপিআই) সূত্রে জানা যায়, আগের বছরগুলোতে হামের টিকাদান কভারেজ ছিল অনেক বেশি। ২০২৪ সালে এই হার ছিল ৯৮ দশমিক ৯ শতাংশ, ২০২৩ সালে ৯৭ দশমিক ৩ শতাংশ, ২০২২ সালে ৯৩ দশমিক ৮ শতাংশ এবং ২০২১ সালে ৯৯ দশমিক ৭ শতাংশ। এমনকি করোনা মহামারির সময়ও কভারেজ তুলনামূলকভাবে উচ্চ পর্যায়ে ছিল।
এদিকে টিকাদান কভারেজ কমে যাওয়ার তথ্য সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর ইপিআইয়ের ওয়েবসাইট থেকে কিছু তথ্য সরিয়ে নেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে। যদিও সংশ্লিষ্ট নথিতে এই তথ্যের প্রমাণ রয়েছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ওয়েবসাইটে বাংলাদেশের সামগ্রিক টিকাদান তথ্য পাওয়া গেলেও ২০২৫ সালের হামের তথ্য সেখানে অনুপস্থিত।
গত বছর ইপিআইয়ের ব্যবস্থাপক হিসেবে দায়িত্ব পালন করা ডা. আবুল ফজল মো. শাহাবুদ্দিন খান স্বীকার করেন, টিকাদানে বড় ধরনের ঘাটতি তৈরি হয়েছে। তিনি বলেন, স্বাস্থ্য সহকারীদের তিন দফা কর্মবিরতির ফলে টিকাদান কার্যক্রম সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এছাড়া ‘অপারেশনাল প্ল্যান’ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় অনেক স্বাস্থ্য সহকারীর চাকরি চলে যায়। পরে সীমিত পরিসরে নিয়োগ দেওয়া হলেও দেশের বেশিরভাগ এলাকায় এখনও জনবল সংকট রয়েছে। পাশাপাশি টিকা পরিবহন ও সরবরাহ ব্যবস্থায় জটিলতাও বড় ভূমিকা রেখেছে।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, টিকাদানে ঘাটতির কারণে প্রতি বছর বিপুলসংখ্যক শিশু ‘মিসিং’ থেকে যাচ্ছে। এরা ধীরে ধীরে সংক্রমণের ঝুঁকিতে পড়ে এবং কয়েক বছর পর বড় আকারে প্রাদুর্ভাব দেখা দিতে পারে।
জাতীয় টিকাদান সূচি অনুযায়ী, শিশুদের ৯ মাস ও ১৫ মাস বয়সে হাম-রুবেলা টিকার দুই ডোজ দেওয়ার কথা। দেশে প্রতি বছর প্রায় ৪০ লাখ শিশুর জন্য এই টিকার প্রয়োজন হয়। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে নিয়মিত টিকাদান কার্যক্রমে সমন্বয়ের ঘাটতি দেখা যাচ্ছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সাবেক পরিচালক অধ্যাপক বে-নজীর আহমেদ বলেন, হামের মতো অত্যন্ত সংক্রামক রোগ প্রতিরোধে অন্তত ৯০ থেকে ৯৫ শতাংশ টিকাদান কভারেজ প্রয়োজন। বর্তমানে অনেক ক্ষেত্রে এই হার ৬০ শতাংশের নিচে নেমে গেছে, যা অত্যন্ত উদ্বেগজনক।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা জানান, টিকাদান কর্মসূচিতে অংশগ্রহণ কমে যাওয়া, অভিভাবকদের সচেতনতার অভাব এবং সেবা প্রাপ্তির সীমাবদ্ধতা-এসব কারণেই এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। পাশাপাশি কভিড-পরবর্তী সময়ে যে ব্যাঘাত তৈরি হয়েছিল, তার প্রভাব এখনও পুরোপুরি কাটেনি। এছাড়া ২০২০ সালের ডিসেম্বরের পর আর কোনো বড় হাম-রুবেলা ক্যাম্পেইন না হওয়ায় টিকাবঞ্চিত শিশুর সংখ্যা বেড়েই চলেছে।
বিশ্বব্যাংকের সাবেক স্বাস্থ্য ও পুষ্টি বিশেষজ্ঞ ড. জিয়াউদ্দিন হায়দার বলেন, নীতিগত পরিবর্তনের প্রভাবও এখন স্পষ্ট। অপারেশনাল প্ল্যান ও লাইন ডিরেক্টর কাঠামো বাতিল করে নতুন ব্যবস্থায় যাওয়ায় বাস্তবায়নে জটিলতা তৈরি হয়েছে। তিনি দ্রুত বিশেষ টিকাদান কর্মসূচি চালুর ওপর জোর দেন এবং আক্রান্ত শিশুদের আলাদা রেখে চিকিৎসা নিশ্চিত করার পরামর্শ দেন।
তিনি আরও বলেন, হামের চিকিৎসা মূলত সহায়ক-জ্বর নিয়ন্ত্রণ, অক্সিজেন ও নিউমোনিয়ার চিকিৎসা। এগুলো প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্রেই সম্ভব হলেও পর্যাপ্ত সুবিধার অভাবে অনেক রোগীকে ঢাকায় পাঠাতে হচ্ছে, যা ঝুঁকি বাড়াচ্ছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আতঙ্ক না ছড়িয়ে তথ্যভিত্তিক বিশ্লেষণের মাধ্যমে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি। নিয়মিত টিকাদান জোরদার করা, ঝরে পড়া শিশুদের শনাক্ত করে টিকার আওতায় আনা এবং সচেতনতা বৃদ্ধি এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তর জানিয়েছে, হামের টিকাদান কভারেজ বাড়াতে শিগগিরই বিশেষ কর্মসূচি নেওয়া হবে। এতে পিছিয়ে পড়া শিশুদের অগ্রাধিকার ভিত্তিতে টিকা দেওয়া হবে। তবে দ্রুত কার্যকর উদ্যোগ না নিলে পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়ে উঠতে পারে বলে সতর্ক করেছেন বিশেষজ্ঞরা।
এদিকে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ (রামেক) হাসপাতালে গত ২৪ ঘণ্টায় হামের উপসর্গ নিয়ে আরও দুই শিশুর মৃত্যু হয়েছে। বর্তমানে সেখানে ৯৮ শিশু চিকিৎসাধীন রয়েছে এবং নতুন করে ভর্তি হয়েছে ১৬ জন। আক্রান্তদের মধ্যে প্রায় ৬৫ শতাংশের বয়স ছয় মাসের নিচে, যারা এখনও টিকা নেওয়ার বয়সে পৌঁছায়নি।
রামেক হাসপাতালের মুখপাত্র শংকর কুমার বিশ্বাস বলেন, এত কম বয়সী শিশুদের মধ্যে সংক্রমণ বাড়া উদ্বেগজনক। পরিস্থিতি বিবেচনায় টিকার বয়সসীমা কমানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
আইসিইউ সংকটের প্রেক্ষাপটে তিন বছর ধরে অচল থাকা ২০০ শয্যার রাজশাহী শিশু হাসপাতাল চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের সচিব জানিয়েছেন, আগামী তিন মাসের মধ্যে আংশিকভাবে হাসপাতালটি চালু করা হবে।
চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা হাসপাতালে রোগীর চাপও উদ্বেগজনক। মার্চ মাসে ২০ শয্যার আইসোলেশন ইউনিটে ভর্তি হয়েছে ২৮৬ শিশু। বর্তমানে ৭৭ জন ভর্তি রয়েছে এবং গত তিন মাসে মারা গেছে চার শিশু। রোগীর চাপ সামাল দিতে অনেককে মেঝে ও সিঁড়িতেও চিকিৎসা দিতে হচ্ছে।
চট্টগ্রাম, গোপালগঞ্জ ও শরীয়তপুরসহ বিভিন্ন জেলাতেও হামের সংক্রমণ ও মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। এসব এলাকায় টিকাবঞ্চিত শিশুদের তালিকা করে দ্রুত টিকাদান কার্যক্রম জোরদারের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এখনই কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে হামের সংক্রমণ বড় আকারে ছড়িয়ে পড়তে পারে, যা শিশুস্বাস্থ্যের জন্য গুরুতর হুমকি হয়ে দাঁড়াবে।