সেচ ব্যবস্থায় ডিজেল ও সৌর শক্তির খরচে ব্যবধান

সেচ ব্যবস্থায় ডিজেল ও সৌর শক্তির খরচে ব্যবধান
ছবির ক্যাপশান, সেচ ব্যবস্থায় ডিজেল ও সৌর শক্তির খরচে ব্যবধান

বৈশ্বিক বাজারে ডিজেলের দাম বৃদ্ধি ও সরবরাহ সংকটের কারণে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে কৃষিকাজে চাপ তৈরি হলেও বরিশাল অঞ্চলে ভিন্ন চিত্র দেখা যাচ্ছে। এখানে সেচ ব্যবস্থায় নতুন সম্ভাবনা হিসেবে উঠে এসেছে সৌরচালিত পাম্প, যা কৃষকদের খরচ কমিয়ে দিচ্ছে উল্লেখযোগ্যভাবে।

বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশন (বিএডিসি) জানায়, যেখানে ডিজেলচালিত সেচে প্রতি শতাংশ জমিতে প্রায় ৪০ টাকা খরচ হয়, সেখানে সৌরচালিত পাম্প ব্যবহারে খরচ নেমে আসে মাত্র ২৫ পয়সায়। ফলে কৃষকদের উৎপাদন ব্যয় কমে আসছে এবং তারা লাভবান হচ্ছেন।

সেচ ব্যবস্থায় বৈচিত্র্য

বরিশাল বিভাগের ছয় জেলায় বর্তমানে ৩৪০টি ডিজেলচালিত সেচ স্কিম চালু রয়েছে। পাশাপাশি ৪৫টি সৌরবিদ্যুচ্চালিত পাম্প ও ৩১টি বিদ্যুচ্চালিত পাম্প স্থাপন করা হয়েছে। এছাড়া পানি উন্নয়ন বোর্ডের অধীনে বিভিন্ন উপজেলায় ‘ইরিগেশন প্রজেক্ট’-এর আওতায় ৭৮টি পাম্প হাউজ স্থাপন করা হয়েছে।

এই পাম্পগুলো প্রতি সেকেন্ডে প্রায় ৭০০ লিটার পানি উত্তোলনে সক্ষম, যা কৃষিজমিতে সেচ নিশ্চিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।

খরচে বড় পার্থক্য

নিজস্ব ব্যবস্থায় ডিজেল দিয়ে সেচ দিতে একক জমিতে খরচ হয় প্রায় ৭ হাজার ৫০০ টাকা। কিন্তু পানি উন্নয়ন বোর্ডের গ্রাভিটি পাম্প ব্যবহারে একই সেচ খরচ নেমে আসে মাত্র ২ হাজার টাকায়। এতে কৃষকদের আর্থিক চাপ অনেকটাই কমছে।

সমবায় ভিত্তিক উদ্যোগ

বিএডিসির আওতায় ২৫ একর জমি নিয়ে সমবায় পদ্ধতিতে কৃষকদের সংগঠিত করে সৌরচালিত পাম্প স্থাপন করা হচ্ছে। প্রতিটি সমিতিকে এককালীন ৩০ হাজার টাকা এবং বছরে ১৫ হাজার টাকা সরকারকে দিতে হয়। তবে এর বিনিময়ে তারা পাচ্ছেন স্বল্প খরচে নিয়মিত সেচ সুবিধা।

একটি সৌরচালিত পাম্প ও ভূগর্ভস্থ ড্রেনেজ ব্যবস্থা তৈরি করতে সরকারের ব্যয় হয়েছে প্রায় ১৬ লাখ ৯০ হাজার টাকা। পাশাপাশি ১২ লাখ টাকা ব্যয়ে স্থাপন করা হয়েছে ভূগর্ভস্থ পাইপলাইন, যার ফলে পানির অপচয় কমে এসেছে।

মাঠের কৃষকের অভিজ্ঞতা

বাবুগঞ্জের কৃষক ওয়াহেদ জানান, তার ৩০ একর জমিতে ইরি-বোরো চাষ হয়েছে এবং সময়মতো সেচ দিতে পেরেছেন। ডিজেলের দামের প্রভাব তার ওপর পড়েনি। তিনি বলেন, “এ বছর আমাদের অঞ্চলে পানির কোনো সংকট নেই।”

একই অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছেন বরিশাল সদর উপজেলার কৃষক মিজানুর রহমান ও নেছার উদ্দিন। তারা বলছেন, সৌরচালিত সেচ ব্যবস্থার কারণে উৎপাদন খরচ কমে এসেছে।

সেচ কমিটির সভাপতি নুরুল ইসলাম গাজী বলেন, “বছরে ১৫ হাজার টাকা দিলেও এটি ডিজেলচালিত সেচের তুলনায় অনেক কম খরচ।”

বিশেষজ্ঞদের মতামত

বিএডিসির প্রকৌশলী বিশ্বজিৎ সিকদার জানান, এই প্রকল্পের মাধ্যমে নদী ও খালের পানি ব্যবহার করে প্রায় এক হাজার একর জমি সেচের আওতায় আনা সম্ভব হয়েছে। এতে ভূগর্ভস্থ পানির ওপর চাপ কমছে এবং কৃষকরা কম খরচে উৎপাদন করতে পারছেন।

অন্যদিকে, বরিশাল বিএডিসির নির্বাহী প্রকৌশলী সৈয়দ ওয়াহিদ মুরাদ বলেন, “সৌরচালিত পাম্প ব্যবহারে একরে সেচ খরচ মাত্র ২৫ টাকা, যেখানে ডিজেলে খরচ হয় প্রায় ৪ হাজার টাকা। এই পার্থক্যই কৃষকদের জন্য বড় স্বস্তি।”

বিশ্ববাজারে জ্বালানির দামের অস্থিরতার মধ্যেও বরিশালে সৌরশক্তিনির্ভর সেচ ব্যবস্থার প্রসার কৃষিতে নতুন সম্ভাবনা তৈরি করেছে। কম খরচ, পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তি এবং সহজলভ্য পানি ব্যবস্থার কারণে এই উদ্যোগ ভবিষ্যতে দেশের অন্যান্য অঞ্চলেও সম্প্রসারণের সম্ভাবনা তৈরি করেছে।


সম্পর্কিত নিউজ