নোয়াখালীতে ভোট দেওয়ার জেরে তিন সন্তানের জননী ধর্ষণের অভিযোগ

নোয়াখালীতে ভোট দেওয়ার জেরে তিন সন্তানের জননী ধর্ষণের অভিযোগ
  • Author,
  • Role, জাগরণ নিউজ বাংলা
  • লেখক, Showanur Rahman

নোয়াখালীর হাতিয়া উপজেলায় এক গৃহবধূকে ধর্ষণের অভিযোগকে কেন্দ্র করে ব্যাপক ধোঁয়াশা ও রাজনৈতিক উত্তেজনার সৃষ্টি হয়েছে। ঘটনার সত্যতা নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে ভিন্নমত দেখা দিয়েছে, অভিযোগকারী ও অভিযুক্ত পক্ষের বক্তব্যও পরস্পরবিরোধী। পুলিশ জানিয়েছে, প্রকৃত ঘটনা উদঘাটনে তদন্ত শুরু হয়েছে।

ঘটনাটি ঘটেছে হাতিয়া উপজেলার চানন্দী ইউনিয়নের নলেরচর আশ্রয়ণ প্রকল্প এলাকায়। তিন সন্তানের জননী ওই নারী অভিযোগ করেছেন, ভোটের কারণে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের লোকজন তাকে নির্যাতন করেছে এবং ধর্ষণ করেছে। তবে স্থানীয় প্রতিবেশীরা বিষয়টি সম্পর্কে কিছুই জানেন না বলে দাবি করেছেন, আর অভিযুক্ত ব্যক্তি অভিযোগ অস্বীকার করে একে ষড়যন্ত্র বলে উল্লেখ করেছেন।

হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে গিয়ে ধর্ষণের অভিযোগ

শনিবার (১৪ ফেব্রুয়ারি) দুপুরে মারধরের ঘটনায় আহত হয়ে ওই নারী নোয়াখালীর ২৫০ শয্যার জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি হন। প্রাথমিকভাবে তিনি মারধরের কথা জানালেও পরবর্তীতে চিকিৎসকদের কাছে ধর্ষণের অভিযোগ করেন। এরপর তাকে গাইনী ওয়ার্ডে স্থানান্তর করে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা ও পরীক্ষা-নিরীক্ষা শুরু করা হয়।

হাসপাতালের জরুরি বিভাগের চিকিৎসক ডা. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, “ভুক্তভোগী প্রথমে মারধরের কথা জানালেও পরে ধর্ষণের অভিযোগ করেন। বিষয়টি গুরুত্ব সহকারে বিবেচনা করে তাকে গাইনী বিভাগে ভর্তি করা হয়েছে। পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর চূড়ান্ত মতামত দেওয়া হবে।”

ভুক্তভোগীর বর্ণনা: ভোটের জেরে হামলা ও ধর্ষণ

ভুক্তভোগী নারীর দাবি, শুক্রবার রাতে তিন ব্যক্তি তার ঘরে প্রবেশ করে। তারা তার স্বামীকে বেঁধে রেখে তাকে আলাদা করে নিয়ে যায় এবং একজন তাকে ধর্ষণ করে, অন্য দুজন পাহারা দেয়। তিনি অভিযোগ করেন, সম্প্রতি অনুষ্ঠিত নির্বাচনে ‘শাপলা কলি’ প্রতীকে ভোট দেওয়ায় তাকে লক্ষ্য করে হামলা চালানো হয়।

তিনি বলেন, “স্বামীসহ রান্নাঘরে আশ্রয় নিয়েছিলাম। স্বামীকে বেঁধে রেখে একজন আমাকে নিয়ে যায় এবং নির্যাতন করে। অপরজন দরজায় পাহারা দিচ্ছিল।”

অন্যদিকে দ্বিতীয় প্রতিবেদনে তিনি আরও দাবি করেন, ঘটনার পরদিন অভিযুক্তদের নেতৃত্বে একটি দল তার বাড়িতে হামলা চালিয়ে ভাঙচুর করে এবং ঘটনা প্রকাশ করলে ভয়াবহ পরিণতির হুমকি দেয়।

প্রতিবেশীদের সন্দেহ ও ভিন্নমত

তবে স্থানীয় প্রতিবেশীদের বক্তব্য ভুক্তভোগীর বর্ণনার সঙ্গে পুরোপুরি মেলেনি। একাধিক প্রতিবেশী জানান, তারা এমন কোনো ঘটনা দেখেননি বা টের পাননি।

এক প্রতিবেশী বলেন, “ঘটনার বিষয়ে আমার কোনো ধারণা নেই।”
আরেকজন বলেন, “কেউ ওই বাড়িতে আসতে দেখিনি, কোনো ধরনের বিরক্তির ঘটনাও হয়নি।”

অভিযুক্তের অস্বীকার ও পাল্টা অভিযোগ

ধর্ষণের অভিযোগে অভিযুক্ত রহমান দাবি করেছেন, অভিযোগটি সম্পূর্ণ মিথ্যা এবং রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। তিনি বলেন, “আমি ধর্ষণ করিনি। এসব বানোয়াট অভিযোগ। আমার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র চলছে।”

তিনি আরও দাবি করেন, তাকে রাজনৈতিক দলে যোগ দেওয়ার জন্য বড় অঙ্কের অর্থের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল।

রাজনৈতিক পাল্টাপাল্টি বক্তব্য

ঘটনাটি ঘিরে স্থানীয় রাজনীতিতে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়েছে। জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) নেতা ও হাতিয়া আসনের সংসদ সদস্য আবদুল হান্নান মাসউদ দাবি করেছেন, নির্বাচনের পর থেকেই এলাকায় সহিংসতা, নির্যাতন ও ধর্ষণের ঘটনা ঘটছে।

তিনি বলেন, “শাপলা কলিতে যোগ দেওয়াই অনেকের অপরাধ হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রশাসনকে জানালেও কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। হাতিয়ায় দ্রুত সেনাবাহিনী মোতায়েন করে অস্ত্র উদ্ধার করা দরকার।”

অন্যদিকে উপজেলা বিএনপি নেতারা অভিযোগ করেছেন, রাজনৈতিকভাবে দলকে হেয় করার উদ্দেশ্যে ঘটনাটি অতিরঞ্জিত করে প্রচার করা হচ্ছে।

উপজেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি আলা উদ্দুর বলেন, “অভিযুক্ত ব্যক্তি আমাদের রাজনীতি করেন না। রাজনৈতিক উদ্দেশ্যেই আমাদের বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালানো হচ্ছে।”

পুলিশের অবস্থান ও তদন্ত

পুলিশ জানিয়েছে, অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ে তদন্ত শুরু হয়েছে। হাতিয়া সার্কেলের সহকারী পুলিশ সুপার নুরুল আনোয়ার বলেন, “এটি অতিরঞ্জিত প্রচারণা হতে পারে। ঘটনাটি বড় ইস্যু করার চেষ্টা করা হচ্ছে।”

হাতিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. সাইফুল আলম বলেন, “ঘটনার বিষয়ে কেউ আগে জানায়নি। আমরা খোঁজখবর নিচ্ছি এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”

নোয়াখালী পুলিশ সুপার টিএম মোশারেফ হোসেন জানান, বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখা হচ্ছে এবং তদন্ত শেষে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

এনসিপির কর্মসূচি ও রাজনৈতিক কর্মতৎপরতা

ঘটনার প্রতিবাদে জাতীয় নাগরিক পার্টি বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশের ঘোষণা দিয়েছে। দলটির নেতারা ভুক্তভোগীকে হাসপাতালে দেখতে গিয়ে চিকিৎসার খোঁজখবর নেন এবং আইনগত সহায়তার আশ্বাস দেন।

এ ছাড়া দলটির কেন্দ্রীয় নেতারা আগামী দিনগুলোতে ঘটনাস্থল পরিদর্শনের পরিকল্পনা করছেন বলে জানিয়েছে স্থানীয় নেতৃবৃন্দ।

নোয়াখালীর হাতিয়ায় গৃহবধূ ধর্ষণের অভিযোগের ঘটনায় একদিকে ভুক্তভোগীর গুরুতর অভিযোগ, অন্যদিকে প্রতিবেশী ও অভিযুক্তদের সন্দেহ ও অস্বীকার - সব মিলিয়ে পরিস্থিতি জটিল হয়ে উঠেছে। রাজনৈতিক বক্তব্য ও পাল্টা অভিযোগ পরিস্থিতিকে আরও উত্তপ্ত করেছে। এ ঘটনায় প্রকৃত সত্য উদঘাটনে পুলিশের তদন্তের দিকে তাকিয়ে রয়েছে স্থানীয়রা। তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত ঘটনাটি নিয়ে অনিশ্চয়তা ও বিতর্ক অব্যাহত থাকার সম্ভাবনা রয়েছে।
 


সম্পর্কিত নিউজ