ধর্ষণের পর হত্যা করা হয় শিশু রামিসাকে, মরদেহ লুকাতেই মাথা বিচ্ছিন্ন

ধর্ষণের পর হত্যা করা হয় শিশু রামিসাকে, মরদেহ লুকাতেই মাথা বিচ্ছিন্ন
ছবির ক্যাপশান, ছবি: সংগৃহীত

রাজধানীর মিরপুরের পল্লবী এলাকায় সাত বছর বয়সী শিশু রামিসা হত্যার ঘটনায় প্রধান সন্দেহভাজন সোহেল রানাসহ দুজনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। প্রাথমিক তদন্তে শিশুটিকে যৌন নির্যাতনের পর হত্যা করা হয়ে থাকতে পারে বলে ধারণা করছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।

তবে এ বিষয়ে চূড়ান্ত মতামত ফরেনসিক ও সিআইডি পরীক্ষার প্রতিবেদন পাওয়ার পর জানা যাবে বলে জানিয়েছে পুলিশ। এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডে পাশের ফ্ল্যাটের ভাড়াটিয়া সোহেল রানা (৩০) ও তার স্ত্রী স্বপ্না আক্তারকে (২৬) মাত্র ৭ ঘণ্টার মধ্যে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।

 

মঙ্গলবার (১৯ মে) রাতে পল্লবী থানায় আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে ঢাকা মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশন) এস এন নজরুল ইসলাম ঘটনার বিস্তারিত তুলে ধরেন। তিনি জানান, খবর পাওয়ার পর দ্রুত অভিযান চালিয়ে প্রধান সন্দেহভাজন সোহেল রানাকে নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা এলাকা থেকে গ্রেপ্তার করা হয়। তার স্ত্রী স্বপ্না আক্তারকেও ঘটনাস্থল–সংলগ্ন বাসা থেকে আটক করা হয়। 

 

পুলিশ জানায়, মঙ্গলবার সকাল সাড়ে ১০টার দিকে স্কুলে নেওয়ার জন্য রামিসাকে খুঁজতে থাকেন তার মা। একপর্যায়ে বাসার দরজার সামনে শিশুটির একটি জুতা পড়ে থাকতে দেখেন তিনি। সন্দেহ হলে পাশের ফ্ল্যাটের দরজায় ধাক্কা দেন। দরজা ভেতর থেকে আটকানো থাকায় মায়ের চিৎকারে স্থানীয়রা এগিয়ে আসেন এবং দরজা ভেঙে ভেতরে ঢুকে শিশুটির মরদেহ দেখতে পান।

 

পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, ঘটনার সময় প্রধান সন্দেহভাজন সোহেল রানা জানালার গ্রিল কেটে পালিয়ে যান। তার স্ত্রী স্বপ্না আক্তারকে বাসায় পাওয়া যায়। পরে অভিযান চালিয়ে সোহেলকে গ্রেপ্তার করা হয়। ফাইন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শিশুটিকে খুঁজে না পেয়ে পরিবার একই ভবনের ফ্ল্যাটগুলোতে খোঁজ শুরু করলে পাশের ফ্ল্যাট থেকে মরদেহ উদ্ধার হয় এবং সন্দেহভাজন ব্যক্তি পালিয়ে যান।

 

সংবাদ সম্মেলনে ডিএমপির অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার এস এন নজরুল ইসলাম বলেন, প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, শিশুটির ওপর যৌন নির্যাতনের চেষ্টা বা যৌন নির্যাতনের পর তাকে হত্যা করা হয়েছে। তবে বিষয়টি নিশ্চিত করতে আলামত সংগ্রহ করে সিআইডিতে পাঠানো হয়েছে। ফরেনসিক পরীক্ষার পরই এ বিষয়ে নিশ্চিত হওয়া যাবে। বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের প্রতিবেদনে পুলিশকে উদ্ধৃত করে বলা হয়েছে, ঘটনাটি যৌন নির্যাতন ও হত্যার সন্দেহে তদন্ত করা হচ্ছে।

 

পুলিশ আরও জানায়, হত্যার পর মরদেহ লুকানোর চেষ্টা করা হয়েছিল বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে। তবে শিশুটির মা দরজায় ধাক্কাধাক্কি শুরু করলে অভিযুক্ত ব্যক্তি পুরো পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে পারেননি। এ সময় তিনি জানালা দিয়ে পালিয়ে যান বলে পুলিশের ভাষ্য।

 

ডিএমপির কর্মকর্তা জানান, গ্রেপ্তার সোহেল রানার বিরুদ্ধে নাটোরে সন্ত্রাসবিরোধী আইনে একটি মামলা রয়েছে। তার স্ত্রীর বক্তব্যের বরাতে পুলিশ বলছে, সোহেল রানার আচরণে বিকৃত প্রবণতার আলামত ছিল এবং তিনি স্ত্রীকেও বিভিন্নভাবে নির্যাতন করতেন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। এসব তথ্য তদন্তে যাচাই করা হচ্ছে।

 

খবর পেয়ে পল্লবী থানা পুলিশ, সিআইডি ও অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা ঘটনাস্থলে যান। সিআইডির ক্রাইম সিন ইউনিট আলামত সংগ্রহ করে। মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য পাঠানো হয়েছে। তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, ময়নাতদন্ত, ডিএনএ, সিসিটিভি ফুটেজ, প্রতিবেশীদের সাক্ষ্য এবং জব্দ করা আলামতের ভিত্তিতে মামলার পরবর্তী অগ্রগতি নির্ধারণ করা হবে।

 

বিভিন্ন গণমাধ্যমে শিশুটির নামের বানানে ভিন্নতা দেখা গেছে। কোথাও রামিসা, কোথাও রামিসা আক্তার হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। জাগো নিউজের প্রতিবেদনে শিশুটিকে আব্দুল হান্নান মোল্লার মেয়ে রামিসা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে, আর ডেইলি স্টার ও ডেইলি সানের প্রতিবেদনে রামিসা আক্তার নাম ব্যবহার করা হয়েছে। তাই চূড়ান্ত প্রতিবেদন বা মামলার নথিতে যে নাম থাকবে, সেটি যাচাই করে ব্যবহার করা উচিত।

 

ঘটনার পর এলাকায় শোক ও ক্ষোভের পরিবেশ তৈরি হয়েছে। স্থানীয়রা দ্রুত বিচার দাবি করেছেন। শিশু অধিকারকর্মীরা বলছেন, এমন ঘটনায় শুধু আসামি গ্রেপ্তার করাই যথেষ্ট নয়; তদন্ত দ্রুত শেষ করে আদালতে শক্তিশালী অভিযোগপত্র দিতে হবে। একই সঙ্গে শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিতে বাড়িওয়ালা, পরিবার, স্কুল ও স্থানীয় প্রশাসনের সমন্বিত সতর্কতা জরুরি।

 

বিশেষজ্ঞদের মতে, শিশু নির্যাতন ও হত্যার ঘটনায় তদন্তে বিলম্ব হলে আলামত নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি থাকে। তাই ঘটনাস্থল সুরক্ষিত রাখা, দ্রুত ফরেনসিক পরীক্ষা, সন্দেহভাজনদের জিজ্ঞাসাবাদ এবং শিশুর পরিবারের মানসিক সহায়তা নিশ্চিত করা জরুরি। এ ধরনের ঘটনায় ভুক্তভোগী শিশুর পরিচয় ও পরিবারের ব্যক্তিগত তথ্য প্রকাশের ক্ষেত্রেও গণমাধ্যমের সতর্ক থাকা উচিত।


সম্পর্কিত নিউজ