{{ news.section.title }}
বিশ্ববাজারে ৪ মাসের মধ্যে সোনার দামে সবচেয়ে বড় পতন
আন্তর্জাতিক বাজারে সোনার দামে আবারও বড় ধরনের পতন দেখা দিয়েছে। সোমবার লেনদেনের এক পর্যায়ে মূল্যবান এই ধাতুর দাম ৬ শতাংশের বেশি কমে প্রতি আউন্স ৪ হাজার ২০০ ডলারের ঘরে নেমে আসে। বাজারের শেষ ভাগে কিছুটা ঘুরে দাঁড়ালেও দিনের ধস স্পষ্টভাবেই বিনিয়োগকারী ও স্বর্ণবাজার সংশ্লিষ্টদের দৃষ্টি কাড়ে। রয়টার্সের তথ্য অনুযায়ী, সোমবার স্পট গোল্ড এক পর্যায়ে ৪,০৯৭.৯৯ ডলার পর্যন্ত নেমে যায় এবং পরে ৪,২০৩.২১ ডলারে স্থির হয়, যা কয়েক মাসের মধ্যে অন্যতম বড় দরপতন।
বাংলাদেশ সময় দুপুর ২টা ২০ মিনিটে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতি আউন্স সোনার দাম ২৭৩ ডলার কমে ৪ হাজার ২১৮ ডলারে নেমেছে বলে গোল্ডপ্রাইসের তথ্যও দেখায়। এর ঠিক এক দিন আগে এ দাম ছিল ৪ হাজার ৪৯৪ ডলার। অর্থাৎ মাত্র ২৪ ঘণ্টার ব্যবধানে বাজারে বড় ধরনের মূল্যহ্রাস ঘটেছে। আরও বড় ছবি দেখলে বোঝা যায়, গত ১৪ মার্চ প্রতি আউন্স সোনার দাম ছিল ৫ হাজার ২০ ডলার। সেই হিসাবে মাত্র সাত দিনের ব্যবধানে আউন্সপ্রতি সোনার দাম কমেছে ৮০২ ডলার। এই ব্যবধানই দেখিয়ে দিচ্ছে যে বাজারে এখন সংশোধন নয়, কার্যত এক ধরনের তীব্র পুনর্মূল্যায়ন চলছে।
বাজার বিশ্লেষকদের মতে, এই পতনের পেছনে সবচেয়ে বড় কারণ হলো শক্তিশালী মার্কিন ডলার, তেলের উচ্চ দাম এবং সুদহার নিয়ে নতুন অনিশ্চয়তা। মধ্যপ্রাচ্যে ইরান, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলকে ঘিরে সংঘাতের কারণে তেলের দাম ১১০ ডলারের ওপরে উঠে যাওয়ায় মূল্যস্ফীতি ফের চাপ সৃষ্টি করতে পারে-এমন ধারণা বাজারে জোরালো হয়েছে। এর ফলে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো, বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল রিজার্ভ, সুদ কমানোর পথ থেকে সরে গিয়ে কঠোর অবস্থানে থাকতে পারে। সোনা যেহেতু সুদবিহীন সম্পদ, তাই ডলার ও বন্ডের মতো আয়দায়ক বিকল্পের সামনে এর আকর্ষণ কমে যায়। রয়টার্স বলছে, সাম্প্রতিক দরপতনের বড় চালিকা শক্তি এই সুদহার-ভীতি ও ডলারের শক্ত অবস্থান।
চলতি বছরের শুরুতে অবশ্য সোনার বাজারে ছিল উল্টো চিত্র। গোল্ডপ্রাইস ও রয়টার্সের তথ্য অনুযায়ী, ৩০ জানুয়ারি বিশ্ববাজারে প্রতি আউন্স সোনার দাম ৫ হাজার ২০০ ডলারের ঘর পেরোয়, আর ২৯ জানুয়ারি তা ৫ হাজার ৫৫০ ডলারের কাছাকাছি উঠেছিল। রয়টার্স আরও নির্দিষ্টভাবে বলছে, ২৯ জানুয়ারির রেকর্ড উচ্চতা ছিল ৫,৫৯৪.৮২ ডলার প্রতি আউন্স। অর্থাৎ জানুয়ারির শেষের সর্বোচ্চ অবস্থান থেকে বাজার এখন প্রায় এক-চতুর্থাংশ নেমে এসেছে।
আন্তর্জাতিক বাজারের এই নিম্নমুখী প্রবণতার প্রভাব ইতোমধ্যে দেশের বাজারেও পড়েছে। বাংলাদেশ জুয়েলার্স সমিতি, বা বাজুস, গত বৃহস্পতিবার এক দিনেই দুই দফা সোনার দাম কমানোর ঘোষণা দেয়। দুই দফায় প্রতি ভরিতে সর্বোচ্চ ১৫ হাজার ৩৩৮ টাকা পর্যন্ত দাম কমানো হয়। বর্তমানে সবচেয়ে ভালো মানের ২২ ক্যারেটের এক ভরি সোনার দাম কমে ২ লাখ ৪৬ হাজার ৯২৭ টাকায় নেমে এসেছে। একইসঙ্গে ২১ ক্যারেটের প্রতি ভরি ২ লাখ ৩৫ হাজার ৬৭১ টাকা, ১৮ ক্যারেটের প্রতি ভরি ২ লাখ ২ হাজার ২০ টাকা এবং সনাতন পদ্ধতির প্রতি ভরি সোনার দাম ১ লাখ ৬৪ হাজার ৫২১ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। আজও দেশের বাজারে এই দরেই সোনা কেনাবেচা চলছে।
সোনার পাশাপাশি রুপার দামও কমেছে। বর্তমানে ২২ ক্যারেটের এক ভরি রুপার দাম ৫ হাজার ৩৬৫ টাকা। এ ছাড়া ২১ ক্যারেটের প্রতি ভরি রুপা ৫ হাজার ১৩২ টাকা, ১৮ ক্যারেটের প্রতি ভরি ৪ হাজার ৪৩২ টাকা এবং সনাতন পদ্ধতির প্রতি ভরি রুপার দাম ৩ হাজার ৩২৪ টাকা। অর্থাৎ মূল্যবান দুই ধাতুই এখন আন্তর্জাতিক দরপতনের প্রতিফলন হিসেবে দেশীয় বাজারে নিম্নমুখী চাপে রয়েছে।
জানুয়ারির শেষ দিকে যখন বিশ্ববাজারে সোনার দাম লাফিয়ে বাড়ছিল, তখন তার সরাসরি প্রভাব পড়েছিল বাংলাদেশেও। ২৯ জানুয়ারি সকালে বাজুস এক ধাপে ভরিপ্রতি ১৬ হাজার ২১৩ টাকা দাম বাড়িয়েছিল। এর ফলে ভালো মানের এক ভরি সোনার দাম দাঁড়িয়েছিল ২ লাখ ৮৬ হাজার টাকায়, যা দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ দাম হিসেবে আলোচিত হয়। এক ধাপে সোনার দাম আগে কখনোই এতটা বাড়ানো হয়নি। এখনকার পরিস্থিতি সেই রেকর্ড উত্থানের সম্পূর্ণ বিপরীত ছবি তৈরি করেছে।
বাজার এখন কোন দিকে যাবে, সেটিই বড় প্রশ্ন। বিশ্লেষকদের মতে, যদি ডলার আরও শক্তিশালী থাকে, তেলের দাম উচ্চ পর্যায়ে আটকে থাকে এবং ফেড সুদহার নিয়ে কড়াকড়ি সংকেত দেয়, তাহলে সোনার ওপর চাপ অব্যাহত থাকতে পারে। তবে যুদ্ধ পরিস্থিতি আরও ঘনীভূত হলে বা বৈশ্বিক আর্থিক অস্থিরতা বাড়লে নিরাপদ বিনিয়োগ হিসেবে সোনার চাহিদা আবারও বাড়তে পারে। অর্থাৎ বাজার এখনো স্থিতিশীল হয়নি; বরং উচ্চ অস্থিরতার মধ্যে রয়েছে। বর্তমান ধস তাই শুধু দরপতন নয়, বরং একটি সতর্কবার্তাও-স্বর্ণবাজারে স্বল্প সময়ের মধ্যে বড় উত্থান যেমন সম্ভব, তেমনি বড় সংশোধনও বাস্তব।