বাংলাদেশি পোশাকের দাম কমেছে আন্তর্জাতিক বাজারে

বাংলাদেশি পোশাকের দাম কমেছে আন্তর্জাতিক বাজারে
ছবির ক্যাপশান, বাংলাদেশি পোশাকের দাম কমেছে আন্তর্জাতিক বাজারে
  • Author,
  • Role, জাগরণ নিউজ বাংলা
  • লেখক, Showanur Rahman

বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্প এখন এক জটিল চাপে পড়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারে অস্থিরতা, যুক্তরাষ্ট্রের শুল্কনীতি এবং চলমান বৈশ্বিক সংঘাত-সবকিছু মিলিয়ে চলতি অর্থবছরের প্রথম আট মাসে রফতানি আয়ে স্পষ্ট নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। সংশ্লিষ্ট খাতের তথ্য বলছে, এই সময়ে পোশাক রফতানি আয় কমেছে ৩.৩৭ শতাংশ, যা শিল্পের জন্য একটি সতর্ক সংকেত হিসেবে দেখা হচ্ছে।

রফতানি ও আমদানিতে একসঙ্গে ধাক্কা

শুধু রফতানি নয়, কাঁচামাল আমদানিতেও মন্দাভাব লক্ষ্য করা যাচ্ছে। ব্যাক-টু-ব্যাক ঋণপত্র খোলার হার কমেছে প্রায় ৬.৭৯ শতাংশ। এর অর্থ হচ্ছে, ভবিষ্যৎ উৎপাদন নিয়েও অনিশ্চয়তা তৈরি হচ্ছে। একইসঙ্গে প্রধান বাজারগুলোতেও চাহিদা কমে যাওয়ার প্রভাব পড়েছে সরাসরি রফতানিতে। যুক্তরাষ্ট্রে রফতানি কমেছে প্রায় ১ শতাংশ, আর ইউরোপে এই হার ২৫ শতাংশেরও বেশি।

ইউরোপীয় বাজারে দামের পতন

বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় রফতানি গন্তব্য ইউরোপে পোশাকের দাম ক্রমাগত কমছে। গত বছর যেখানে গড় মূল্য কমেছিল ৩.৮৪ শতাংশ, সেখানে চলতি বছরের জানুয়ারিতে তা নেমে এসেছে ৯.৪৩ শতাংশে। এই দামের পতন রফতানিকারকদের জন্য বড় ধরনের চাপ তৈরি করছে। কারণ একই সময়ে প্রতিযোগী দেশগুলোতে ঠিক উল্টো চিত্র দেখা যাচ্ছে।

প্রতিযোগীদের শক্ত অবস্থান

ভিয়েতনাম, ভারত এবং ইন্দোনেশিয়ার মতো দেশগুলো আন্তর্জাতিক বাজারে নিজেদের অবস্থান আরও শক্ত করছে। ভিয়েতনামের পোশাকের দাম বেড়েছে প্রায় ৬.৫ শতাংশ, ভারতের প্রায় ২ শতাংশ এবং ইন্দোনেশিয়ার ক্ষেত্রে তা ১৪ শতাংশের বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে। ফলে বাংলাদেশের জন্য কম দামে পণ্য বিক্রি করেও বাজার ধরে রাখা কঠিন হয়ে উঠছে।

উৎপাদন খরচ বেড়ে যাওয়ার চাপ

রফতানিকারকদের মতে, দীর্ঘদিনের জ্বালানি সংকট উৎপাদন খরচ বাড়িয়ে দিয়েছে। পাশাপাশি বৈশ্বিক পরিস্থিতির কারণে পরিবহন ব্যয়ও বেড়েছে। কিন্তু কারখানা চালু রাখতে এবং কর্মসংস্থান ধরে রাখতে উৎপাদন বন্ধ করা সম্ভব নয়। তাই বাধ্য হয়ে কম দামে অর্ডার নিতে হচ্ছে, যা লাভের মার্জিন কমিয়ে দিচ্ছে।

ক্রয়ক্ষমতা হ্রাস ও অর্ডার সংকট

বিশ্বব্যাপী মূল্যস্ফীতির কারণে ভোক্তাদের ক্রয়ক্ষমতা কমে গেছে। ফলে আন্তর্জাতিক ক্রেতারা আগের মতো বড় অর্ডার দিচ্ছেন না। শিল্প সংশ্লিষ্টদের মতে, এই পরিস্থিতিতে অনেক কারখানাই টিকে থাকার জন্য কম দামে কাজ নিতে বাধ্য হচ্ছে, যা দীর্ঘমেয়াদে ঝুঁকিপূর্ণ।

টেকসই সমাধানের প্রয়োজন

অর্থনীতিবিদরা বলছেন, ইউরোপীয় বাজার ধরে রাখতে হলে কাঁচামাল উৎপাদনে স্বনির্ভরতা বাড়ানো জরুরি। বর্তমানে অনেক ক্ষেত্রে বিদেশ থেকে কাপড় আমদানি করে পোশাক তৈরি করা হয়। তবে ভবিষ্যতে জিএসপি প্লাস সুবিধা পেতে হলে সুতা ও কাপড় দেশেই উৎপাদনের সক্ষমতা বাড়াতে হবে। এতে করে প্রতিযোগিতায় এগিয়ে থাকা সম্ভব হবে।

বৈশ্বিক বাজারের সংকেত

ইউরোস্ট্যাটের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারিতে ইউরোপের মোট পোশাক আমদানি আগের বছরের তুলনায় প্রায় ১৫.৫ শতাংশ কমেছে। অর্থাৎ শুধু বাংলাদেশ নয়, সামগ্রিকভাবেই বিশ্ববাজারে চাহিদা কমে যাচ্ছে।

সামনে কী চ্যালেঞ্জ

বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এই পরিস্থিতি সামাল দিতে হলে সরকার ও উদ্যোক্তাদের সমন্বিত উদ্যোগ নিতে হবে। উৎপাদন খরচ কমানো, জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা এবং নতুন বাজার খোঁজার ওপর গুরুত্ব দিতে হবে। একই সঙ্গে প্রযুক্তি ও দক্ষতা বাড়িয়ে পণ্যের মান উন্নয়ন করাও জরুরি।

বাংলাদেশের পোশাক খাত দীর্ঘদিন ধরে দেশের অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করছে। তবে বর্তমান পরিস্থিতি ইঙ্গিত দিচ্ছে-সময়মতো কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে এই খাত বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারে।


সম্পর্কিত নিউজ