{{ news.section.title }}
আন্তর্জাতিক বাজারে কমেছে সোনার দাম-দেশে কী অবস্থা?
মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতি, তেলের বাজারের অস্থিরতা এবং যুক্তরাষ্ট্র-ইরান উত্তেজনাকে ঘিরে গত কয়েক দিনে বিশ্ববাজারে সোনার দামে বড় ধরনের ওঠানামা দেখা গেছে। টানা দরপতনের পর মঙ্গলবার কিছুটা স্থিতিশীলতা ফিরে এলেও ঈদের আগের তুলনায় আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতি আউন্স সোনার দাম এখনও প্রায় ৩০০ ডলার কম অবস্থানে রয়েছে। তবে বিশ্ববাজারে এই পতনের সরাসরি প্রতিফলন এখনো পুরোপুরি দেখা যায়নি দেশের বাজারে। কারণ, ঈদের ছুটির কারণে বাংলাদেশ জুয়েলার্স সমিতি বা বাজুস এখনো নতুন করে সোনার দর সমন্বয় করেনি।
বিশ্ববাজারে কী ঘটেছে
মঙ্গলবার সন্ধ্যা ছয়টার দিকে আন্তর্জাতিক স্পট মার্কেটে প্রতি আউন্স সোনার দাম ছিল প্রায় ৪ হাজার ৪১৪ ডলার। এর আগের দিন, অর্থাৎ সোমবার, বাজারে বড় ধস নামে এবং এক পর্যায়ে সোনার দাম ৪ হাজার ১০০ ডলারের কাছাকাছি নেমে যায়। রয়টার্স জানায়, সোমবার স্পট গোল্ড ৪,০৯৭.৯৯ ডলার পর্যন্ত নেমেছিল, যা সাম্প্রতিক মাসগুলোর মধ্যে একটি বড় নিম্নমুখী স্তর। পরে বাজার কিছুটা ঘুরে দাঁড়িয়ে ৪,৪০৭ ডলারের আশপাশে ফিরে আসে।
এই উত্থান-পতনের পেছনে বড় কারণ ছিল মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ইরানের অবকাঠামোতে সম্ভাব্য হামলা সাময়িকভাবে স্থগিত রাখার ঘোষণা। রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, এ ঘোষণার পর অপরিশোধিত তেলের দাম ১৩ শতাংশেরও বেশি কমে যায়, ফলে মূল্যস্ফীতি ও সুদহার নিয়ে বাজারের তাৎক্ষণিক উদ্বেগ কিছুটা কমে। এই পরিস্থিতিতে সোনার বাজারেও সামান্য স্থিতিশীলতা ফিরে আসে।
বিনিয়োগকারীরা কীভাবে দেখছেন
রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিনিয়োগকারীরা এখন দুই ধরনের বিপরীত সংকেত বিশ্লেষণ করছেন। একদিকে যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল ও ইরানের সংঘাত প্রশমনের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে; অন্যদিকে যুদ্ধ পুরোপুরি শেষ হয়নি এবং জ্বালানি বাজারে ঝুঁকি রয়ে গেছে। ইউবিএসের বিশ্লেষক জিওভান্নি স্টাউনোভো বলেন, বাজার এখন মূলত “অপেক্ষা করো এবং দেখো” অবস্থানে আছে। তাঁর মতে, তেলের দাম কিছুটা নেমে আসায় সুদহার আরও বাড়ার আশঙ্কা আপাতত কমেছে, আর সেটাই সোনার দামে সাময়িক স্বস্তি দিয়েছে।
কেন সোনার দাম নিচে
যুদ্ধ শুরুর পর থেকে অনেকের ধারণা ছিল সোনা নিরাপদ বিনিয়োগ হিসেবে আরও বাড়বে। কিন্তু বাস্তবে উল্টো চিত্রও দেখা যাচ্ছে। কারণ, জ্বালানি তেলের দাম বেড়ে গেলে বৈশ্বিক মূল্যস্ফীতি বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়। আর মূল্যস্ফীতি বাড়লে যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল রিজার্ভ সুদহার কমানোর বদলে উচ্চ পর্যায়ে ধরে রাখতে পারে। সোনা যেহেতু সুদ দেয় না, তাই সুদবাহী সম্পদের তুলনায় এর আকর্ষণ কমে যায়। গত কয়েক দিনের পতনে সোনার দাম যুদ্ধ শুরুর পর থেকে প্রায় ১৮ শতাংশের মতো নেমে গেছে বলে বাজার বিশ্লেষণে উঠে এসেছে।
বর্তমান অবস্থা কোথায়
বিশ্ববাজারে সোনার দামে দীর্ঘদিন ধরেই ঊর্ধ্বগতি ছিল। গত বছর সোনার দাম ৭০ শতাংশের বেশি বেড়েছিল। চলতি বছরের জানুয়ারিতে স্পট মার্কেটে প্রতি আউন্স সোনার দাম ৫ হাজার ৬০০ ডলারের কাছাকাছি পৌঁছায়। বর্তমানে সেটি ৪ হাজার ৪০০ ডলারের আশপাশে অবস্থান করছে। অর্থাৎ রেকর্ড উচ্চতা থেকে বাজার উল্লেখযোগ্যভাবে নেমেছে।
অর্থনীতিবিদ জেমস মিডওয়ের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, সোনার দামে আবার বড় পরিবর্তন আনতে দুটি বিষয় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হবে। প্রথমত, ফেড যদি স্পষ্ট করে জানায় যে মূল্যস্ফীতির চাপ থাকলেও সুদহার কমানো হবে। দ্বিতীয়ত, মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ কত দিন চলবে, সে বিষয়ে বাজারের ধারণা বদলালে সোনার দাম আবার দ্রুত নতুন দিকে মোড় নিতে পারে। এই ব্যাখ্যা সাম্প্রতিক বাজার আচরণের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
দেশে দাম এখনো কমেনি কেন
বাংলাদেশে গত বৃহস্পতিবার বাজুস দুই দফায় সোনার দাম কমায়। ওই দিন ২২ ক্যারেটের প্রতি ভরি সোনার দাম মোট ১৫ হাজার ৩৩৮ টাকা কমিয়ে ২ লাখ ৪৬ হাজার ৯২৭ টাকায় নামানো হয়। এ দর এখনও কার্যকর আছে। বাজুসের মূল্যতালিকা অনুযায়ী, ২১ ক্যারেটের প্রতি ভরি সোনার দাম ২ লাখ ৩৫ হাজার ৬৭১ টাকা, ১৮ ক্যারেটের প্রতি ভরি ২ লাখ ২ হাজার ২০ টাকা এবং সনাতন পদ্ধতির প্রতি ভরি সোনার দাম ১ লাখ ৬৪ হাজার ৫২১ টাকা।
তবে এরপর বিশ্ববাজারে সোনার দাম আরও নেমে গেলেও দেশের বাজারে নতুন সমন্বয় হয়নি। কারণ, ঈদের ছুটির কারণে বাজুস নতুন দর ঘোষণা করেনি। বাজুসের দাম নির্ধারণ কমিটির চেয়ারম্যান দেওয়ান আমিনুল ইসলাম বলেন, “ঈদের ছুটির কারণে আমরা সোনার দাম সমন্বয় করছি না। চলতি সপ্তাহের শেষ দিকে আমরা সমন্বয় করব। বিশ্ববাজারে সোনার দরে নিম্নমুখী প্রবণতা থাকলে অবশ্যই দাম কমবে। কারণ আমরা ব্যবসায়ী ও ক্রেতা-উভয়ের স্বার্থই বিবেচনায় নিই।” এই বক্তব্য থেকে বোঝা যাচ্ছে, বিশ্ববাজারে নিম্নমুখী ধারা অব্যাহত থাকলে দেশে আরও দরপতনের সম্ভাবনা আছে।
সামনে যা হতে পারে
নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক জুয়েলারি ব্যবসায়ী বলেছেন, যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে এবং ক্ষয়ক্ষতি বাড়লে সোনা আবারও নিরাপদ বিনিয়োগ হিসেবে জনপ্রিয় হয়ে উঠতে পারে। সে ক্ষেত্রে দাম আবার ৫ হাজার ডলার ছাড়াতে পারে, এমনকি বছর শেষে আরও ওপরে যাওয়ার সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যায় না। তবে আপাতত বাজারের প্রবণতা বলছে, বিশ্ববাজারে সোনার দাম উচ্চ অস্থিরতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, আর দেশের বাজার এখন অপেক্ষা করছে নতুন সমন্বয়ের ঘোষণার জন্য।
সূত্রঃ রয়টার্স