নিয়োগ ঘিরে স্বজনপ্রীতির অভিযোগ, চবিতে দুদকের অনুসন্ধান

নিয়োগ ঘিরে স্বজনপ্রীতির অভিযোগ, চবিতে দুদকের অনুসন্ধান
  • Author,
  • Role, জাগরণ নিউজ বাংলা

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে (চবি) শিক্ষক ও কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়োগে অনিয়ম এবং স্বজনপ্রীতির অভিযোগ ঘিরে চলমান শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের মধ্যে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) অভিযান চালিয়েছে। বুধবার (১৪ জানুয়ারি) বেলা সাড়ে ১১টার দিকে দুদকের সহকারী পরিচালক সায়েদুল আলমের নেতৃত্বে একটি দল বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক ভবনে অভিযান শুরু করে।

দুদক সূত্রে জানা যায়, অভিযানের অংশ হিসেবে উপ-উপাচার্য (একাডেমিক) অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ শামীম উদ্দিন খানের কার্যালয়ে প্রায় আড়াই ঘণ্টা ধরে নিয়োগসংক্রান্ত বিভিন্ন নথিপত্র পর্যালোচনা ও সংগ্রহ করা হয়। এ সময় উপ-উপাচার্য অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ শামীম উদ্দিন খান, উপ-উপাচার্য অধ্যাপক কামাল উদ্দিন এবং ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার অধ্যাপক ড. সাইফুল ইসলাম উপস্থিত ছিলেন।

অভিযান চলাকালীন একই সময়ে প্রশাসনিক ভবনের সামনে নিয়োগ অনিয়মের অভিযোগে আন্দোলন করেন শিক্ষার্থীরা। আন্দোলনে অংশ নেওয়া শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের শিক্ষার্থী তানিয়া মাহি বলেন, “২৪-এর অভ্যুত্থান, জুলাই শহীদদের রক্ত এবং লক্ষ লক্ষ শিক্ষার্থীর ফ্যাসিবাদবিরোধী অবস্থানের ওপর দাঁড়িয়ে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে কোনো অন্যায় আমরা মেনে নেব না। গত দেড় বছরে নিয়োগ সংক্রান্ত যেসব অভিযোগ উঠেছে, সেগুলোর স্বচ্ছ ব্যাখ্যা প্রশাসনকে শিক্ষার্থীদের সামনে তুলে ধরতে হবে। অভ্যুত্থান পরবর্তী সময়ে হওয়া প্রতিটি নিয়োগের প্রক্রিয়া, নিয়োগপ্রাপ্তদের পরিচয় ও যোগ্যতা প্রকাশ করতে হবে। আমরা প্রশাসনের বিরুদ্ধে নই, আমরা জবাবদিহিতামূলক ক্যাম্পাস চাই। দ্রুত স্বচ্ছতা নিশ্চিত না হলে আন্দোলন আরও তীব্র হবে।”

অভিযান শেষে দুদক জানায়, প্রাথমিকভাবে বিশ্ববিদ্যালয়ে অতিরিক্ত শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারী নিয়োগের কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি। একই সঙ্গে সাম্প্রতিক সময়ে ১৫০ জন নিয়োগ দেওয়া হয়েছে এমন অভিযোগও সত্য নয় বলে দাবি করেছে সংস্থাটি। অভিযানে কিছু গুরুত্বপূর্ণ নথি সংগ্রহ করা হয়েছে এবং নিয়োগসংক্রান্ত আইন ও বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্গানোগ্রাম অনুযায়ী জনবল প্রয়োজনীয়তার বিষয়টি প্রশাসনের পক্ষ থেকে উপস্থাপন করা হয়েছে বলে জানায় দুদক। তবে উপাচার্য অধ্যাপক ড. ইয়াহইয়া আখতার দেশের বাইরে থাকায় কিছু নথি সংগ্রহ করা সম্ভব হয়নি। তিনি দেশে ফিরলে সেগুলো সংগ্রহ করে কমিশনে প্রতিবেদন পাঠানো হবে বলে জানানো হয়।

এর আগে গত ১২ জানুয়ারি রেজিস্ট্রার দপ্তর থেকে প্রকাশিত একটি বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, ৯ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত ৫৬৫তম সিন্ডিকেট সভায় শিক্ষক ও কর্মকর্তা-কর্মচারী মিলিয়ে শতাধিক জনকে নিয়োগ ও পদোন্নতি দেওয়া হয়েছে। এসব নিয়োগকে ঘিরে স্বজনপ্রীতির অভিযোগ ওঠে। অভিযোগ অনুযায়ী, উপ-উপাচার্য (একাডেমিক) অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ শামীম উদ্দিন খানের কন্যা মাহিরা খান প্রভাষক পদে নিয়োগ পান। এছাড়া বিশ্ববিদ্যালয় ল্যাবরেটরি স্কুল অ্যান্ড কলেজের অধ্যক্ষ হিসেবে নিয়োগ পান রেজিস্ট্রার সাইফুল ইসলামের ভাই মোহাম্মদ আব্দুল কাইয়ুম এবং ফাইন্যান্স বিভাগের অধ্যাপক ড. বেগম ইসমত আরা হকের পুত্র একই বিভাগে শিক্ষক হিসেবে নিয়োগপ্রাপ্ত হন।

অভিযান শেষে দুদক চট্টগ্রাম-১ এর সহকারী পরিচালক সায়েদুল আলম বলেন, “প্রাথমিকভাবে অতিরিক্ত নিয়োগের তথ্য পাওয়া যায়নি। তবে কিছু নথি সংগ্রহ করা হয়েছে। যাচাই-বাছাই শেষে কমিশনে বিস্তারিত প্রতিবেদন দেওয়া হবে।”

এদিকে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের দাবি, সব নিয়োগই শূন্য পদে এবং বিধি মেনেই দেওয়া হয়েছে। প্রশাসনের ভাষ্য অনুযায়ী, বিভিন্ন বিভাগ ও হলে দীর্ঘদিন ধরে জনবল সংকট থাকায় অধিকাংশ ক্ষেত্রে আগে থেকেই অস্থায়ীভাবে কর্মরতদের নিয়মিত করা হয়েছে। গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অতিরিক্ত নিয়োগ ও স্বজনপ্রীতির যে অভিযোগ উঠেছে, তা ভিত্তিহীন বলেও দাবি করেছে প্রশাসন।

ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার অধ্যাপক ড. সাইফুল ইসলাম বলেন, সর্বশেষ প্রক্রিয়ায় মোট ৩২১ জন জনবল নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে শিক্ষক ৭৮ জন, কর্মকর্তা ১৬ জন, তৃতীয় শ্রেণির কর্মচারী ৮৮ জন এবং চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী ১৩৯ জন। তিনি জানান, তৃতীয় শ্রেণির নিয়োগের প্রায় ৩০ শতাংশ এবং চতুর্থ শ্রেণির নিয়োগের প্রায় ৪০ শতাংশ কর্মচারী আগে থেকেই বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন দপ্তরে কর্মরত ছিলেন। বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে নিয়মিত প্রক্রিয়ায় তাদের নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। ফলে এগুলোকে পুরোপুরি নতুন নিয়োগ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।

তিনি আরও বলেন, বিভিন্ন সময় এসব নিয়োগ নিয়ে অর্থ লেনদেন বা রাজনৈতিক পরিচয়ের অভিযোগ শোনা গেলেও মানবিক বিবেচনা ও প্রাতিষ্ঠানিক ধারাবাহিকতার স্বার্থে প্রশাসন সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

শিক্ষক নিয়োগ প্রসঙ্গে তিনি জানান, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে অনুমোদিত শিক্ষকের মোট পদ ১ হাজার ২৫০টি। বর্তমানে কর্মরত শিক্ষক আছেন প্রায় ১ হাজার ৪০ জন। সে হিসাবে আরও অন্তত ২০০ জন শিক্ষক নিয়োগ প্রয়োজন। তাই অতিরিক্ত নিয়োগের প্রশ্নই ওঠে না বলে মন্তব্য করেন তিনি।

উপ-উপাচার্য (একাডেমিক) অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ শামীম উদ্দিন খান বলেন, “এ পর্যন্ত প্রায় ৭১ জন শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে, তাদের মধ্যে দুজন এখনো যোগদান করেননি। বিশ্ববিদ্যালয়ের বাস্তব প্রয়োজনের তুলনায় এই সংখ্যা খুবই কম। আউটকাম বেইজড এডুকেশন সিস্টেম চালু করতে গেলে শিক্ষকের সংখ্যা প্রায় দ্বিগুণ প্রয়োজন হবে। পাশাপাশি নতুন হল চালু হওয়ায় কর্মকর্তা-কর্মচারীর চাহিদাও বেড়েছে। অনেক বিভাগে প্রয়োজনীয় স্টাফ না থাকায় এক বিভাগের জনবল দিয়ে অন্য বিভাগের কাজ চালাতে হচ্ছে। আমি বিশ্বাস করি, নিয়োগ সংক্রান্ত বিষয়ে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ফেয়ার ছিল এবং সত্য একদিন প্রকাশ পাবে।”

অভিযানে প্রাথমিকভাবে অভিযোগের সত্যতা না মিললেও, সংগৃহীত নথিপত্র যাচাই শেষে দুদকের চূড়ান্ত প্রতিবেদনের দিকেই এখন তাকিয়ে আছে বিশ্ববিদ্যালয় সংশ্লিষ্ট মহল।
 

আপনার প্রতিক্রিয়া জানান

❤️
Love
0
(0.00 / 0 total)
👏
Clap
0
(0.00 / 0 total)
🙂
Smile
0
(0.00 / 0 total)
😞
Sad
0
(0.00 / 0 total)

মন্তব্যসমূহ

এই সংবাদের জন্য এখনো কোনো মন্তব্য নেই।


সম্পর্কিত নিউজ