রোজায় নীরব সহায়তা: ইফতার ও সেহরিতে চবির অসচ্ছল শিক্ষার্থীদের পাশে উত্তরণ

রোজায় নীরব সহায়তা: ইফতার ও সেহরিতে চবির অসচ্ছল শিক্ষার্থীদের পাশে উত্তরণ
  • Author,
  • Role, জাগরণ নিউজ বাংলা
  • লেখক, চবি প্রতিনিধি

রমজান মাসে রোজা, ইফতার ও সেহরিকে ঘিরে যখন ক্যাম্পাসজুড়ে ধর্মীয় আবহ, ঠিক তখনই নীরবে চলছে আরেকটি মানবিক কর্মযজ্ঞ। অর্থসংকটে থাকা শিক্ষার্থীদের জন্য ইফতার ও সেহরির ব্যবস্থা করছে উত্তরণ চবি। একটি বার্তা পেলেই স্বেচ্ছাসেবকেরা পৌঁছে দিচ্ছেন খাবার, রাখা হচ্ছে পরিচয়ের গোপনীয়তা।

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী সংখ্যা প্রায় ২৭ হাজার। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় হওয়ায় বিভিন্ন আর্থসামাজিক পটভূমির শিক্ষার্থীরা এখানে পড়তে আসে। তবে উল্লেখযোগ্য একটি অংশ নিম্নআয়ের পরিবার থেকে আগত। অনেকে টিউশন, পার্টটাইম কাজ কিংবা ক্ষুদ্র ব্যবসার মাধ্যমে পড়াশোনার খরচ চালান। বিশ্ববিদ্যালয়টি শহর থেকে প্রায় ২২ কিলোমিটার দূরে হওয়ায় টিউশনে যাওয়া-আসায় সময় ও খরচ দুটোই বাড়ে। সব বিভাগের শিক্ষার্থীর জন্য সমানভাবে টিউশনের সুযোগও থাকে না।

এই বাস্তবতায় রমজান মাস অনেকের জন্য বাড়তি চাপ নিয়ে আসে। সেহরি ও ইফতারের খরচ জোগাতে হিমশিম খেতে হয় অনেককে। বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন অনলাইন গ্রুপে মাঝেমধ্যে অ্যানোনিমাস পোস্ট দেখা যায়—“এক বেলা খাওয়ার ব্যবস্থা হলে উপকার হতো”, “কেউ কি একটা টিউশন ম্যানেজ করে দিতে পারবেন?”

এমন প্রেক্ষাপটে কাজ করছে উত্তরণ সিইউ। শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের উদ্যোগে গড়ে ওঠা এই সংগঠনটি চার বছর ধরে অসচ্ছল শিক্ষার্থীদের সহায়তা দিচ্ছে। রমজান মাসে তারা চারটি হলে টোকেন সিস্টেমে সেহরি বিতরণ করছে। পাশাপাশি সোহরাওয়ার্দী হল ক্যাফেটেরিয়ায় নিয়মিত ইফতার সামগ্রী সরবরাহ করা হচ্ছে। ইফতার পেতে শিক্ষার্থীদের শুধু সংগঠনের ফেসবুক পেজে একটি বার্তা পাঠাতে হয়। এরপর স্বেচ্ছাসেবক দল সরাসরি গিয়ে খাবার পৌঁছে দেয়।

সংগঠনের আয়োজক গিয়াসউদ্দিন রক্সি বলেন, তারা চার বছর ধরে আর্থিক সংকটে থাকা শিক্ষার্থীদের পাশে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছেন। রমজানে বিশেষভাবে ইফতার ও সেহরির ব্যবস্থা করা হয়েছে, যাতে অর্থের অভাবে কেউ রোজা রাখতে গিয়ে কষ্টে না পড়েন।

উত্তরণের নারী সদস্য তানিয়া আক্তার মহি বলেন, আমরা চেষ্টা করি যেন কোনো শিক্ষার্থী শুধু সংকোচের কারণে না খেয়ে না থাকে। হলভিত্তিক প্রতিনিধি থাকায় শিক্ষার্থীরা সহজেই আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারে। মেয়েদের হলে আমরা নিজেরাই গিয়ে খোঁজ নেই, যাতে তারা স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে। শুধু খাবার নয়, টিউশন খোঁজা, জরুরি রক্তের ব্যবস্থা করা কিংবা হঠাৎ কোনো প্রয়োজন হলে পাশে দাঁড়ানো এসবই আমাদের কাজের অংশ। ছোট পরিসরে হলেও আমরা চাই শিক্ষার্থীরা বুঝুক, ক্যাম্পাসে তারা একা নয়।

সংগঠনের সদস্য তাসনীম আইয়ান জানান, প্রতিদিন ২৪ থেকে ২৫ জন শিক্ষার্থীর কাছে ইফতার পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে। চারটি হলে টোকেনের মাধ্যমে সেহরি বিতরণ করা হচ্ছে। তবে বর্তমানে তহবিল সংকট রয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, সাবেক ও বর্তমান শিক্ষার্থীদের অনুদানেই কার্যক্রম চলছে।

ইফতার বিতরণ প্রক্রিয়া সম্পর্কে সদস্য মোকাদ্দেস হোসেন বলেন, শিক্ষার্থীদের শুধু নাম, স্টুডেন্ট আইডি ও অবস্থান জানালেই স্বেচ্ছাসেবকেরা খাবার পৌঁছে দেন। পুরো প্রক্রিয়ায় পরিচয় গোপন রাখা হয়।

সংগঠন সূত্রে জানা যায়, সারা বছর মেয়েদের দুটি ও ছেলেদের দুটি হলে দুপুর ও রাতে খাবার সরবরাহ করা হয়। গত জানুয়ারি মাসে চারটি হলে ৩১৫টি মিলের বিপরীতে প্রায় সাড়ে ১১ হাজার টাকা পরিশোধ করেছে সংগঠনটি। ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে এখন পর্যন্ত প্রায় পাঁচ হাজার শিক্ষার্থী খাদ্য সহায়তা পেয়েছেন। এছাড়া বৃত্তি প্রদান, টিউশন ব্যবস্থা ও রক্তদান সমন্বয়ের কাজও করছে তারা।

উত্তরণের ইনবক্সে আসা কিছু বার্তা বাস্তবতাকে আরও স্পষ্ট করে। একজন লিখেছেন, “কালকে দুপুরে এক বেলা ভাত খেতে পারব?” আরেকজন জানান, “রাতে না খেলেও সমস্যা নেই, দুপুরে এক বেলা হলেই হবে।” উত্তরণ থেকে জবাব আসে, “অবশ্যই পারবেন, যতদিন সমস্যায় থাকবেন ততদিন খাবেন।”

রমজানের এই সময়ে যখন ইফতার ও সেহরি কেবল ধর্মীয় অনুশীলন নয়, অনেকের জন্য টিকে থাকার প্রশ্ন, তখন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে নীরবে সেই দায়িত্ব ভাগ করে নিচ্ছে উত্তরণ চবি।


সম্পর্কিত নিউজ