রাকসু'র গণ ইফতারে মুসলিম শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি অংশ নিলেন ভিন্ন ধর্মাবলম্বীরাও

রাকসু'র গণ ইফতারে মুসলিম শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি অংশ নিলেন ভিন্ন ধর্মাবলম্বীরাও

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (রাকসু)- এর উদ্যোগে প্রথমবারের মতো রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে অনুষ্ঠিত হলো বৃহৎ পরিসরের গণ ইফতার মাহফিল ও দোয়া মাহফিল। রোববার (০১ মার্চ) বাদ আসর বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় জামে মসজিদ প্রাঙ্গণে ছাত্রদের এবং কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার প্রাঙ্গণে ছাত্রীদের জন্য পৃথকভাবে ইফতারের আয়োজন করা হয়।

আজকের ইফতার আয়োজনের বিশেষ আকর্ষণ ছিল, মুসলিম শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি ভিন্ন ধর্মাবলম্বী শিক্ষার্থীদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ। ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সবাইকে নিয়ে সম্প্রীতির বার্তা ছড়িয়ে দিতে এ উদ্যোগ গ্রহণ করে রাকসু।

রাকসু'র উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়ে রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী তানভীর হাসান বলেন, রাকসুর আয়োজনে এই সম্মিলিত ইফতার নিঃসন্দেহে ক্যাম্পাসে পারস্পরিক সম্প্রীতি ও ভ্রাতৃত্ববোধ জোরদার করবে। বিভিন্ন বিভাগ ও হলের শিক্ষার্থীরা একসঙ্গে বসে ইফতার করার মধ্য দিয়ে আমাদের মাঝে যে বন্ধন তৈরি হয়, তা কেবল ধর্মীয় অনুভূতির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না বরং এটি বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের ঐক্য ও সহমর্মিতার এক উজ্জ্বল উদাহরণ হয়ে ওঠে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগের শিক্ষার্থী জান্নাতুন নাঈমা বলেন, হাজারো শিক্ষার্থীর সঙ্গে প্রথমবারের মতো রাকসুর আয়োজনে ইফতারে অংশ নিতে পেরে আমি ভীষণ আনন্দিত। বিশেষ করে ছেলে ও মেয়েদের জন্য পৃথক স্থানে সুশৃঙ্খল আয়োজন এবং সার্বিক ব্যবস্থাপনা আমাকে মুগ্ধ করেছে। আমরা আশা করি, শিক্ষার্থীদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণে এমন আয়োজন প্রতিবছর আরও বৃহৎ পরিসরে অনুষ্ঠিত হবে।

অর্থনীতি বিভাগের শিক্ষার্থী মাহমুদুল হাসান বলেন, দীর্ঘ ৩৬ বছর পর রাকসু নির্বাচন হয়েছে। তাই বলা যায়, দীর্ঘ তিন যুগ পর শিক্ষার্থীদের প্রত্যক্ষ সম্পৃক্ততায় এমন একটি ইতিবাচক আয়োজন করেছে প্ল্যাটফর্ম টি, যা ক্যাম্পাস রাজনীতির বাইরে এক মানবিক ও সাংস্কৃতিক পরিবেশ তৈরি করতে সহায়তা করবে। ইফতার শুধু খাবার ভাগাভাগি নয়, এটি একে অপরের প্রতি শ্রদ্ধা ও সহানুভূতির প্রকাশ, এই উপলব্ধিই আজকের আয়োজনের সবচেয়ে বড় সাফল্য।

এদিকে ভিন্ন ধর্মাবলম্বী শিক্ষার্থী, দর্শন বিভাগের অনন্যা চক্রবর্তী বলেন, তিনি মুসলিম নন, তবুও রাকসুর আয়োজনে এই ইফতার মাহফিলে অংশ নিতে পেরে নিজের কাছে খুব আনন্দ লাগছে। রাইসুল এমন আয়োজন ধর্মীয় গণ্ডি পেরিয়ে আমাদের কাছে পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সহাবস্থানের বার্তা দেয়। যা একটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের চেতনার সঙ্গে গভীরভাবে সামঞ্জস্যপূর্ণ।

ইংরেজি বিভাগের শিক্ষার্থী মারিয়া স্কলাস্টিকা বলেন, আমি একজন খ্রিস্টান ধর্মাবলম্বী হলেও রাকসুর এই সম্মিলিত ইফতার আয়োজনে অংশ নিতে পেরে গভীরভাবে আপ্লুত। আমি মনে করি, রাকসুর এমন আয়োজন শুধু একটি ধর্মীয় অনুষঙ্গ নয় বরং এটি পারস্পরিক শ্রদ্ধা, সহাবস্থান ও মানবিক মূল্যবোধের প্রতীক। বিভিন্ন ধর্ম ও সংস্কৃতির শিক্ষার্থীরা একসঙ্গে বসে সৌহার্দ্যের পরিবেশে সময় কাটানো, এটাই একটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রকৃত সৌন্দর্য।

ভবিষ্যতেও রাকসু এ ধরনের অন্তর্ভুক্তিমূলক উদ্যোগ অব্যাহত রাখবে, যাতে ক্যাম্পাসে বহুত্ববাদ ও সম্প্রীতির সংস্কৃতি আরও শক্তিশালী হয়, এই আশা প্রকাশ করেন তিনি।

আজকের ইফতারের সার্বিক বিষয়ে জানতে চাইলে রাকসু সাধারণ সম্পাদক (জিএস) সালাহউদ্দিন আম্মার বলেন, আজকের এই গণইফতার আয়োজন শুধুমাত্র মুসলিম শিক্ষার্থীদের জন্য নয়; সনাতন ধর্মাবলম্বী শিক্ষার্থীদের জন্যও আলাদাভাবে ইফতারের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। প্রায় ১৮ হাজারের অধিক শিক্ষার্থীর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে আমরা সর্বোচ্চ প্রস্তুতি নিয়েছি। আশা করছি, পুরো আয়োজন সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন হবে। তবে কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত কারণে খাবারের স্বল্পতা দেখা দিলে আগাম ক্ষমা প্রার্থনা করছি। সবাই যেন পারস্পরিক সহযোগিতা ও ভাগাভাগির মাধ্যমে সম্প্রীতির এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করে এটাই আমাদের প্রত্যাশা।

গণ ইফতারের ফান্ডিং প্রসঙ্গে তিনি বলেন, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (রাকসু) উদ্যোগে এটাই প্রথম এত বড় পরিসরে আয়োজন। প্রস্তুতির বিভিন্ন দিক নিয়ে আলাদা আলাদা টিম কাজ করেছে। তবে ফান্ডিং সংক্রান্ত বিস্তারিত বিষয়ে রাকসু ভিপি আরও স্পষ্ট ব্যাখ্যা দিতে পারবেন।

সম্প্রীতির মেলবন্ধন তৈরির আহ্বান জানিয়ে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (রাকসু) সহ-সভাপতি (ভিপি) মোস্তাকুর রহমান জাহিদ বলেন, রাকসুর পক্ষ থেকে আমরা ক্যাম্পাসে সহমর্মিতা ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির একটি দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে চেয়েছি। সনাতন ধর্মাবলম্বী শিক্ষার্থীসহ বিভিন্ন বিভাগের প্রায় ১৮ হাজারের অধিক শিক্ষার্থীর একসঙ্গে ইফতারে অংশগ্রহণ সত্যিই অনন্য ও প্রশংসনীয় উদ্যোগ। ভবিষ্যতেও আমরা রাকসুর এ ধরনের আয়োজন অব্যাহত রাখার প্রত্যাশা রাখি।

ইফতার মাহফিলের ফান্ডিংয়ের বিষয়ে তিনি জানান, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষার্থী ও আমাদের রাকসুপ্রেমী ভাইয়েরাই এই আয়োজন বাস্তবায়নে সহায়তা করেছেন। সংগৃহীত অর্থের প্রায় পুরোটাই ইফতারের জন্য খরচ করা হয়েছে।

তিনি আরও বলেন, গতকাল বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন কর্তৃক আয়োজিত গণ ইফতারের ভিন্ন ধর্মাবলম্বী শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণের আগ্রহ আমরা লক্ষ্য করেছি। সকল শিক্ষার্থীর মধ্যে সম্প্রীতির বন্ধন দৃঢ় করার লক্ষ্যে মুসলিম শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি ভিন্ন ধর্মাবলম্বী শিক্ষার্থীদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ আমাদের মুগ্ধ করেছে এবং আশাবাদী করেছে।

উল্লেখ্য, দীর্ঘদিন পর রাকসুর এমন উদ্যোগে শিক্ষার্থীদের মধ্যে উৎসবমুখর পরিবেশ সৃষ্টি হয় এবং পুরো ক্যাম্পাসে সম্প্রীতির আবহ বিরাজ করে। এই কর্মসূচিতে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন বিভাগ ও ইনস্টিটিউটের প্রায় ১৮ হাজারের অধিক শিক্ষার্থী অংশগ্রহণ করেন। তবে রেজিস্ট্রেশনের বাইরে অতিরিক্ত মানুষ আসায় কিছু সংখ্যক শিক্ষার্থীর ইফতার না পাওয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে বলে জানিয়েছেন আয়োজকরা। স্বল্প কিছু সংখ্যক ইফতার প্যাকেট কম পড়ায় দুঃখ প্রকাশ করে শিক্ষার্থীদের কাছে আন্তরিকভাবে ক্ষমা চেয়েছেন রাকসু। 


সম্পর্কিত নিউজ