৮ মাসেও অগ্রগতি নেই চবি-এলাকাবাসীর সংঘর্ষ মামলা, এখনো স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারেনি ৩ শিক্ষার্থী

৮ মাসেও অগ্রগতি নেই চবি-এলাকাবাসীর সংঘর্ষ মামলা, এখনো স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারেনি ৩ শিক্ষার্থী
ছবির ক্যাপশান, ৮ মাসেও অগ্রগতি নেই চবি-এলাকাবাসীর সংঘর্ষ মামলা, এখনো স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারেনি ৩ শিক্ষার্থী

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের (চবি) শিক্ষার্থীদের সঙ্গে স্থানীয় এলাকাবাসীর সংঘর্ষের ঘটনায় দায়ের করা মামলার আট মাস পার হলেও দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি হয়নি। এদিকে ওই সংঘর্ষে গুরুতর আহত তিন শিক্ষার্থী এখনো স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারেননি বলে জানা গেছে।

বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা যায়, চবিতে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে পার্শ্ববর্তী এলাকার বাসিন্দাদের বিরোধ নতুন নয়। তবে গত বছরের ৩০ ও ৩১ আগস্ট দুই পক্ষের মধ্যে স্মরণকালের ভয়াবহ সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। আবাসিক হলে আসন সংকটের কারণে অনেক শিক্ষার্থী ক্যাম্পাসসংলগ্ন এলাকায় বাসা ভাড়া করে থাকেন। ৩০ আগস্ট দিবাগত রাতে এক ছাত্রীর বাসায় ফেরাকে কেন্দ্র করে ভবনের দারোয়ানের  দুর্ব্যবহার থেকে ঘটনার সূত্রপাত হয়।

ঘটনার খবর পেয়ে শিক্ষার্থীদের একটি দল ঘটনাস্থলে ছুটে যায়। অভিযোগ রয়েছে, শুরুতে তারা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের শরণাপন্ন না হয়ে সরাসরি এলাকায় গিয়ে পরিস্থিতি উত্তপ্ত করে তোলে। তবে শিক্ষার্থীদের দাবি, প্রক্টরিয়াল টিমের সঙ্গে যোগাযোগ করেও প্রত্যাশিত সাড়া না পাওয়ায় তারা তাৎক্ষণিকভাবে সহপাঠীর পাশে দাঁড়াতে সেখানে যান।

পরবর্তীতে শিক্ষার্থী ও এলাকাবাসীর মধ্যে বাগ্‌বিতণ্ডা সংঘর্ষে রূপ নেয়। দুই দিনে অন্তত ৪২১ জন শিক্ষার্থী আহত হন, যাদের মধ্যে চারজনকে গুরুতর অবস্থায় আইসিইউতে ভর্তি করা হয়। গুরুতর আহতদের মধ্যে তিনজন— ইমতিয়াজ সায়েম, মামুন হোসেন ও মোহাম্মদ নাঈমুল ইসলাম - এখনো স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারেননি। সংঘর্ষে এলাকাবাসীরও হতাহতের পাশাপাশি ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির ঘটনা ঘটে।

এ ঘটনায় বিশ্ববিদ্যালয়ের নিরাপত্তা দপ্তরের প্রধান আব্দুর রহিম বাদী হয়ে হাটহাজারী মডেল থানায় ৯৫ জনের নাম উল্লেখ করে এবং অজ্ঞাত আরও এক হাজার জনকে আসামি করে মামলা দায়ের করে। পুলিশ এ পর্যন্ত আটজনকে গ্রেফতার করলেও পরে তারা জামিনে মুক্তি পান। ঘটনার আট মাস পেরিয়ে গেলেও মামলার তদন্ত বা বিচারিক প্রক্রিয়ায় দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি না থাকায় শিক্ষার্থীদের মধ্যে অসন্তোষ বিরাজ করছে। ঘটনার পর প্রশাসনের পক্ষ থেকে শিক্ষার্থীদের যে ক্ষতিপূরণ দেয়া হয়েছে  সেটিও অপ্রতুল বলে জানান শিক্ষার্থীরা।

আহত শিক্ষার্থী ইমতিয়াজ সায়েম অভিযোগ করে বলেন, “আহত হওয়ার পর আমি প্রায় ১৬ দিন আইসিইউতে ভর্তি ছিলাম। এরপর বিশ্ববিদ্যালয়ের কিছু শিক্ষক আমার কাছে এসে ঘটনার বিস্তারিত জানতে চান এবং বক্তব্য রেকর্ড করেন, পাশাপাশি ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দেন। কিন্তু পরবর্তীতে তারা আর কোনো খোঁজ নেননি। ঘটনার পর গঠিত স্বাস্থ্য কমিটির কয়েকজনের সঙ্গে যোগাযোগ আছে, তবে সেখানে শুধু স্বাস্থ্যসংক্রান্ত বিষয় নিয়েই আলোচনা হয়।”

তিনি আরও বলেন, “সংঘর্ষের সময় আমার মোবাইল ফোনটি ছিনতাই হয়। আমি প্রশাসনকে বিষয়টি জানিয়ে ফোনটি উদ্ধারের অনুরোধ করি। ফোন ট্র্যাক করলে অপরাধী শনাক্ত করা সম্ভব ছিল, কিন্তু প্রশাসন এ বিষয়ে কোনো উদ্যোগ নেয়নি।”

অন্যদিকে আহত শিক্ষার্থী মোহাম্মদ নাঈমুল ইসলাম বলেন, “যারা হামলাকারী তারা এখনো অবাধে ক্যাম্পাসে ঘুরে বেড়াচ্ছে। নবনিযুক্ত ভিসি দায়িত্ব গ্রহণের পর ঘটনার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময় করছেন।”

তিনি আরও যোগ করেন, “নির্বাচনের ১০-১৫ দিন আগে আমানত হলের সামনে একজনকে দেখতে পেয়ে সাইদ বিন হাবিব, ফজলে রাব্বি তৌহিদ, ইসহাক ভাই ও সাংবাদিক মাহফুজ শুভ্রসহ একাধিক জনের কাছে ছবিসহ বিষয়টি জানাই। তাকে ধরার জন্য অপেক্ষা করলেও নির্বাচন বানচালের আশঙ্কা দেখিয়ে চাকসু প্রতিনিধিরা নির্বাচনের পর বিষয়টি দেখবে বলে এড়িয়ে যায়। "
এবং একজন অপরাধীকে চিহ্নিত করে তার ছবিও তিনি পাঠান জাগরণ নিউজের এই সাংবাদিককে।

এদিকে গত শুক্রবার (৩ এপ্রিল) বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন “উক্ত ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাবাসীর ক্ষতিপূরণ বিষয়ে আলোচনা ও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ” শীর্ষক একটি সভা আহ্বান করে। সভায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের পাশাপাশি হাটহাজারী উপজেলা প্রশাসনের প্রতিনিধি, থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি), স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ উপস্থিত ছিলেন। এছাড়া চবির কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (চাকসু) প্রতিনিধি হিসেবে ভিপি, জিএস ও এজিএসকে আমন্ত্রণ জানানো হয়।

সভা শুরুর পর চাকসু ভিপি রনি শিক্ষার্থীদের পক্ষে তিন দফা দাবি উপস্থাপন করেন। তিনি বলেন, “প্রথমত, আহত শিক্ষার্থীদের চিকিৎসা নিশ্চিত করতে যে কমিটি গঠন করা হয়েছিল, তাদের কাজে কোনো গাফিলতি ছিল কি না তা পর্যালোচনা করতে হবে। দ্বিতীয়ত, চিহ্নিত আসামিরা প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়াচ্ছে ,এমনকি কেউ কেউ চবি প্রশাসনে পদোন্নতিও পাচ্ছে তাদের দ্রুত গ্রেফতার নিশ্চিত করতে হবে। তৃতীয়ত, স্থায়ীভাবে আহত শিক্ষার্থীদের যথাযথ ক্ষতিপূরণ ও পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করতে হবে।”
রনি আরও বলেন, “এই বিষয়গুলোতে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের পরেই কেবল কোনো পক্ষের সঙ্গে আলোচনা হতে পারে, অন্যথায় নয়।” তিনি জানান, এ অবস্থানের প্রেক্ষিতে তিনি সভা বয়কট করে চলে আসেন এবং তার সঙ্গে একমত পোষণ করে চাকসুর জিএস ও এজিএসও সভা ত্যাগ করেন বলে জানান তিনি।

চাকসুর অবস্থান তুলে ধরে জাগরণ নিউজ কে তিনি বলেন, “এলাকাবাসী আমাদের শত্রু নয়। এলাকাবাসী ও শিক্ষার্থীরা একে অপরের পরিপূরক। তবে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকে সবার আগে ক্ষতিগ্রস্ত শিক্ষার্থীদের জন্য কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।”

সভা সম্পর্কে জানতে চাইলে  চাকসু এ জি এস  আইয়ুবুর রহমান তৌফিক, জাগরণ নিউজ কে বলেন," সভা ছিল এলাকাবাসীর ক্ষতিপূরণ দেওয়া নিয়ে। যেখানে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের এখনো পুনর্বাসন সম্ভব হয়নি। সেখানে আলোচনার সাথে আমি একমত হতে পারিনি দেখে চলে এসেছি। আবার এ ঘটনার জন্য বিশ্ববিদ্যালয়  একমাত্র দায়ী না এখানে স্থানীয় প্রশাসন ও রাষ্ট্রীয় দায় আছে। সঠিক সময় প্রতিক্রিয়া দেখালে ক্ষয়ক্ষতি এত বেশি হতো না। তাই বিশ্ববিদ্যালয় এককভাবে ক্ষতিপূরণ দেবে এর সাথেও তিনি একমত নন বলে জানান তিনি।

এ বিষয়ে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আল-ফোরকানের কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, “ওই সভায় আমি সভাপতিত্ব করিনি। সভার সভাপতি ছিলেন উপ-উপাচার্য (একাডেমিক) শামীম উদ্দিন খান।” মামলার অগ্রগতি সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, “বিষয়টি উপ-উপাচার্য শামীম উদ্দিন খান দেখছেন, এ বিষয়ে তার সঙ্গে কথা বলতে পারেন।”

অন্যদিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ উপাচার্য একাডেমিক শামীম উদ্দিন খান বর্তমানে চিকিৎসার জন্য বিদেশে অবস্থান করছেন।

এ ব্যাপারে হাটহাজারী থানার অফিসার ইনচার্জ জাহিদুর রহমান জাগরণ নিউজ কে জানান, মামলার তদন্ত চলমান রয়েছে। তিনি বলেন, “হাটহাজারী মডেল থানার সাব-ইন্সপেক্টর রুপন মামলাটির তদন্ত করছেন।”


সম্পর্কিত নিউজ