আবার এক তেজস হারাল ভারত? সেনাঘাঁটিতে অবতরণের সময় ‘ব্রেক ফেল’!

আবার এক তেজস হারাল ভারত? সেনাঘাঁটিতে অবতরণের সময় ‘ব্রেক ফেল’!
ছবির ক্যাপশান, ভারতীয় প্রযুক্তিতে তৈরি যুদ্ধবিমান তেজস। ফাইল চিত্র
  • Author,
  • Role, জাগরণ নিউজ বাংলা
  • লেখক, Showanur Rahman

ভারতের নিজস্ব প্রযুক্তিতে নির্মিত হালকা যুদ্ধবিমান তেজস আবারও দুর্ঘটনার মুখে পড়েছে। একটি প্রশিক্ষণ মিশন শেষে ঘাঁটিতে অবতরণের সময় বিমানটি রানওয়ে থেকে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ছিটকে পড়ে গুরুতর ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তবে দুর্ঘটনার আগ মুহূর্তে পাইলট বিমানের ককপিট থেকে বেরিয়ে আসায় কোনো প্রাণহানি ঘটেনি।

বিমানটি যে মাত্রায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, তাতে এটিকে কার্যত বায়ুসেনার বহর থেকে বাদ পড়া হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। ভারতের বায়ুসেনা আনুষ্ঠানিকভাবে এই ঘটনা নিয়ে আগে বিস্তারিত কিছু প্রকাশ করেনি।


অবতরণের সময় ব্রেক বিকল, শেষ মুহূর্তে পাইলটের লাফ

সংবাদসংস্থা পিটিআইয়ের বরাতে জানা গেছে, চলতি মাসের শুরুতে এই দুর্ঘটনাটি ঘটে। একটি নিয়মিত প্রশিক্ষণ উড়ান শেষে যুদ্ধবিমানটি ঘাঁটিতে ফিরে আসছিল। অবতরণের সময় হঠাৎ ব্রেক কাজ না করায় বিমানটি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলে। সম্ভাব্য বিপদ আঁচ করে পাইলট জরুরি পদ্ধতিতে ককপিট থেকে বেরিয়ে পড়েন।

পাইলট নিরাপদে অবতরণ করলেও মুহূর্তের মধ্যেই বিমানটি রানওয়ে ছাড়িয়ে দূরে গিয়ে আছড়ে পড়ে এবং কাঠামোগতভাবে মারাত্মক ক্ষতির শিকার হয়।


তেজস বহরের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ

সূত্র জানায়, ৭ ফেব্রুয়ারি এই দুর্ঘটনার পর তেজস যুদ্ধবিমানের নিরাপত্তা ও যান্ত্রিক নির্ভরযোগ্যতা নিয়ে সতর্কতা জোরদার করেছে ভারতীয় বায়ুসেনা। প্রায় ৩০টি এক আসনবিশিষ্ট তেজস যুদ্ধবিমান সাময়িকভাবে গ্রাউন্ডেড করা হয়েছে। এসব বিমানে সম্ভাব্য যান্ত্রিক ত্রুটি আছে কি না, তা খতিয়ে দেখতে বিস্তৃত পরীক্ষা ও প্রযুক্তিগত মূল্যায়ন চলছে।

বিশেষজ্ঞদের অনুমোদন পাওয়া গেলে এসব বিমান পুনরায় অপারেশনে ফেরানো হবে।


তেজস প্রকল্প: উচ্চাকাঙ্ক্ষা ও বাস্তবতার দ্বন্দ্ব

ভারতের প্রতিরক্ষা শিল্পে তেজস একটি বড় অর্জন হিসেবে বিবেচিত। ২০২১ সালের ফেব্রুয়ারিতে ভারত সরকার হিন্দুস্থান এরোনটিক্স লিমিটেডকে (HAL) বায়ুসেনার জন্য ৮৩টি তেজস যুদ্ধবিমান তৈরির চুক্তি দেয়, যার মূল্য ছিল প্রায় ৪৮ হাজার কোটি রুপি। পরে ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে আরও ৯৭টি যুদ্ধবিমান তৈরির নতুন চুক্তি হয়, যার আর্থিক পরিমাণ ৬২ হাজার কোটি রুপি।

তবে প্রকল্প বাস্তবায়নে বারবার সময়সীমা পেছানোর অভিযোগ রয়েছে। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের জিই অ্যারোস্পেস থেকে ইঞ্জিন সরবরাহে বিলম্ব হওয়ায় উৎপাদন প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্টরা দাবি করছেন।


তৃতীয় বড় দুর্ঘটনা, আগেও প্রাণহানির ঘটনা

এটি তেজস যুদ্ধবিমানের তৃতীয় উল্লেখযোগ্য দুর্ঘটনা বলে জানা গেছে।

  • ২০২৪ সালের মার্চে রাজস্থানের জয়সলমেরের কাছে একটি তেজস বিধ্বস্ত হয়েছিল। সে সময় পাইলট নিরাপদে বেরিয়ে আসেন।
  • দ্বিতীয় দুর্ঘটনাটি ঘটে দুবাই এয়ার শো চলাকালে, যেখানে বিমান বিধ্বস্ত হয়ে উইং কমান্ডার নমন স্যালের মৃত্যু হয়।
  • সর্বশেষ ৭ ফেব্রুয়ারির ঘটনাটি সেই তালিকায় নতুন সংযোজন।

এই ধারাবাহিক দুর্ঘটনা তেজস প্রকল্পের নিরাপত্তা মান ও রক্ষণাবেক্ষণ ব্যবস্থাপনা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে।


প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকদের দৃষ্টিভঙ্গি

প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকরা বলছেন, তেজস প্রযুক্তিগতভাবে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হলেও, ধারাবাহিক যান্ত্রিক ত্রুটি ভারতের বিমান শিল্পের চ্যালেঞ্জ তুলে ধরছে। আধুনিক যুদ্ধবিমানের ক্ষেত্রে নির্ভরযোগ্যতা ও রক্ষণাবেক্ষণ সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, বিশেষ করে যখন বিমানটি সক্রিয় যুদ্ধ ও প্রশিক্ষণ মিশনে ব্যবহৃত হয়।

বিশেষজ্ঞদের মতে, দ্রুত উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি নিরাপত্তা মান উন্নত করা না গেলে তেজস প্রকল্পের বিশ্বাসযোগ্যতা প্রশ্নবিদ্ধ হতে পারে।

বিশ্লেষণ ও প্রভাব

তেজস যুদ্ধবিমানের সর্বশেষ দুর্ঘটনা ভারতের প্রতিরক্ষা শিল্পের জন্য একটি সতর্কবার্তা হিসেবে দেখা হচ্ছে। যদিও পাইলটের দ্রুত সিদ্ধান্তে প্রাণহানি এড়ানো গেছে, তবে বিমানটির গুরুতর ক্ষতি এবং আগের দুর্ঘটনার ইতিহাস প্রকল্পটির নির্ভরযোগ্যতা নিয়ে বিতর্ক বাড়িয়েছে।

এখন বায়ুসেনার জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো তেজস বহরের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং ভবিষ্যৎ দুর্ঘটনা এড়াতে প্রযুক্তিগত ত্রুটি দ্রুত সমাধান করা।


সম্পর্কিত নিউজ