ভারতের লখনৌ বিশ্ববিদ্যালয়ে নামাজরত শিক্ষার্থীদের পাহারা দিচ্ছে হিন্দু সহপাঠীরা

ভারতের লখনৌ বিশ্ববিদ্যালয়ে নামাজরত শিক্ষার্থীদের পাহারা দিচ্ছে হিন্দু সহপাঠীরা
ছবির ক্যাপশান, নামাজরত শিক্ষার্থীদের পাহারা দিচ্ছে হিন্দু সহপাঠীরা | ছবি: সংগৃহীত
  • Author,
  • Role, জাগরণ নিউজ বাংলা
  • লেখক, Showanur Rahman

ভারতের উত্তর প্রদেশের লখনৌ বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে রমজান মাসে এক অস্বাভাবিক দৃশ্য দেখা গেছে। একদিকে মুসলিম শিক্ষার্থীরা সালাত আদায় করছেন, অন্যদিকে তাদের চারপাশে হাত ধরে মানববন্ধন করে দাঁড়িয়ে আছেন হিন্দু শিক্ষার্থীরা - যেন কোনো অঘটন না ঘটে। এই দৃশ্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর প্রশংসাও পেয়েছে, আবার বিতর্কও তৈরি করেছে।

ঘটনার সূত্রপাত বিশ্ববিদ্যালয় চত্বরে থাকা ঐতিহাসিক লাল বড়দারি কমপ্লেক্সে প্রবেশ সীমিত করা নিয়ে। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ কমপ্লেক্সটি ঘিরে ফেন্সিং/বেরিকেড দিয়ে ভেতরে ঢোকা বন্ধ করেছে, ফলে সেখানে নামাজ পড়ার জায়গা নিয়ে শিক্ষার্থীদের মধ্যে ক্ষোভ জমে।


বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ কী বলছে

বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের বক্তব্য - লাল বড়দারি ভবনটি গঠনগতভাবে ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েছে। নিরাপত্তার কারণেই ভবনে প্রবেশ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। কর্তৃপক্ষ আরও জানিয়েছে, স্থাপনাটিকে ঐতিহ্যবাহী নিদর্শন হিসেবে সংরক্ষণ/পুনরুদ্ধারের পরিকল্পনা আছে এবং এ বিষয়ে আর্কিওলজিকাল সার্ভে অব ইন্ডিয়া (ASI)–র সঙ্গে যোগাযোগ চলছে।

হিন্দুস্তান টাইমসের প্রতিবেদনে উল্লেখ আছে, বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার স্থানীয় থানায় পুলিশ মোতায়েনেরও অনুরোধ করেন - যাতে কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা না ঘটে।

এদিকে টাইমস অব ইন্ডিয়ার আরেক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সাম্প্রতিক সময়ে একটি দেয়াল ধসে পড়ার ঘটনাকে সামনে রেখে প্রশাসন ভবনটি সিল/বন্ধের সিদ্ধান্ত নেয় - এই ঘটনাটি “সেফটি কনসার্ন” হিসেবে তুলে ধরা হচ্ছে।

 

শিক্ষার্থীদের অভিযোগ: রমজানে ‘একতরফা’ সিদ্ধান্ত

শিক্ষার্থীদের একাংশের বক্তব্য - রমজান চলাকালে হঠাৎ করে প্রবেশ বন্ধ করাটা তাদের ধর্মীয় চর্চায় বাধা তৈরি করেছে। তারা বলছেন, আগে থেকেই বিকল্প ব্যবস্থা বা আলোচনা ছাড়া এমন সিদ্ধান্ত নেওয়ায় ক্ষোভ তৈরি হওয়াটা স্বাভাবিক। টাইমস অব ইন্ডিয়ার প্রতিবেদন অনুযায়ী, শিক্ষার্থীরা “আগাম নোটিশ” না পাওয়া এবং সময় নির্বাচন নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন।

ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসে প্রকাশিত প্রতিবেদনে আরও একটি দাবি উঠে এসেছে - কেউ কেউ বলছেন, লাল বড়দারির ভেতরের একটি হলকে বহুদিন ধরে নামাজের জায়গা হিসেবে ব্যবহার করা হতো; তবে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন এই দাবির সঙ্গে একমত নয়। ফলে বিষয়টি শুধু “দরজা তালাবদ্ধ” নয় - ব্যবহার অধিকার বনাম প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ - এই টানাপড়েনও এখানে কাজ করছে।

 

মানববন্ধনের পেছনের কারণ: ‘বন্ধুত্ব’ আর ‘নিরাপত্তা’ - দুই বার্তা

এই টানাপড়েনের মধ্যেই মুসলিম শিক্ষার্থীরা বাইরে নামাজ পড়তে গেলে হিন্দু শিক্ষার্থীদের একটি দল মানববন্ধন করে পাশে দাঁড়ায়। উদ্দেশ্য - যাতে নামাজের সময় কেউ বাধা না দেয় বা উত্তেজনা না ছড়ায়। এই ঘটনাকে অনেকে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির উদাহরণ হিসেবে দেখছেন।

তবে একই সঙ্গে ক্যাম্পাসে পাল্টা প্রতিক্রিয়াও দেখা গেছে। কিছু ডানপন্থি ছাত্রসংগঠন নামাজের প্রতিবাদ করে সেখানে ধর্মীয় পাঠ/স্লোগান দেওয়ার মতো কর্মসূচি নেয় - ফলে পরিস্থিতি আরও সংবেদনশীল হয়ে ওঠে। সংবাদমাধ্যমগুলো বলছে, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি সামাল দিতে পুলিশকেও সক্রিয় হতে হয়েছে এবং কয়েকজন শিক্ষার্থীকে নোটিশ/সমন দেওয়ার খবর এসেছে।

 

লাল বড়দারি আসলে কী: ২০০ বছরের ঐতিহ্য, কিন্তু ঝুঁকির গল্পও আছে

লাল বড়দারি শুধু একটি ভবন নয় - লখনৌয়ের নবাবি আমলের স্থাপত্যের একটি উল্লেখযোগ্য নিদর্শন। টাইমস অব ইন্ডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, এর নির্মাণ শুরু হয়েছিল ১৮১৪ সালের দিকে এবং ১৮২০ সালের দিকে সম্পন্ন হয়; এটি লখনৌ ক্যাম্পাসের বিরল লাল পাথরের ঐতিহাসিক স্থাপনাগুলোর একটি।

কিছু প্রতিবেদন বলছে, ভবনটি বিভিন্ন সময় নানা কাজে ব্যবহৃত হয়েছে (ক্যান্টিন/অন্যান্য), কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে অবহেলা ও ক্ষয়ের কারণে স্থাপনাটি ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠে। সংস্কার–সংরক্ষণ নিয়ে আলোচনা আগেও হয়েছে, এমনকি অর্থ বরাদ্দের তথ্যও সংবাদে এসেছে - ফলে কর্তৃপক্ষের “সংরক্ষণ” যুক্তি পুরোপুরি অস্বাভাবিক নয়।


আসল দ্বন্দ্বটা কোথায়: নিরাপত্তা বনাম ধর্মীয় চাহিদা

এই ঘটনায় দুটো দাবিই বাস্তবসম্মতভাবে সামনে এসেছে -

  • প্রশাসন বলছে: ভবন ঝুঁকিপূর্ণ, দুর্ঘটনা হলে দায় কে নেবে? তাই প্রবেশ বন্ধ জরুরি।
  • শিক্ষার্থীরা বলছে: রমজানে নিয়মিত নামাজ - ইফতার কেন্দ্রিক ব্যবস্থাপনায় হঠাৎ বাধা - এটা সংবেদনশীল সময়ে ভুল বার্তা দেয়।

সমাধানের জায়গাটা তাই মাঝামাঝি - ভবন যদি সত্যিই ঝুঁকিপূর্ণ হয়, সেখানে ঢোকানো ঠিক নয়; কিন্তু ধর্মীয় প্রয়োজনও অস্বীকার করা যায় না। শিক্ষার্থীরা দাবি তুলছেন - নিরাপদ কোনো বিকল্প জায়গা নির্ধারণ, সময়মতো নোটিশ, এবং সংস্কারের স্বচ্ছ রোডম্যাপ না থাকলে বিতর্ক থামবে না।

 

পরিস্থিতির সম্ভাব্য পরিণতি
সংবাদমাধ্যমগুলোর রিপোর্ট ইঙ্গিত দিচ্ছে, কর্তৃপক্ষ ASI–সহ সংশ্লিষ্ট দপ্তরের সঙ্গে সমন্বয় করে ভবন সংরক্ষণের পথে এগোতে চাইছে। একই সঙ্গে ক্যাম্পাসে শৃঙ্খলা রক্ষায় প্রশাসন কঠোর অবস্থানে যেতে পারে - কারণ একবার উত্তেজনা বাড়লে সেটি দ্রুত রাজনৈতিক রঙ নেয়।

এখানে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন - কর্তৃপক্ষ কি দ্রুত একটি গ্রহণযোগ্য বিকল্প নামাজের ব্যবস্থা দেবে? এবং ভবন সংস্কার/সংরক্ষণ নিয়ে কি টাইমলাইন প্রকাশ করবে? কারণ বাস্তবে শিক্ষার্থীরা “ভবিষ্যতে হবে” শুনে থামতে চান না - তারা রমজানের বর্তমান দিনের সমাধান চান।

 

লখনৌ বিশ্ববিদ্যালয়ের এই ঘটনা একদিকে দেখিয়েছে - ক্যাম্পাসে ছোট একটি সিদ্ধান্ত কীভাবে দ্রুত বড় সামাজিক আলোচনায় পরিণত হতে পারে। আবার অন্যদিকে মানববন্ধনের দৃশ্য মনে করিয়ে দিয়েছে - রাজনীতি ও উত্তেজনার মাঝেও সাধারণ শিক্ষার্থীরা চাইলে সহাবস্থানের বার্তা দিতে পারে। এখন দেখার বিষয়, প্রশাসন নিরাপত্তার যুক্তি ধরে রেখে শিক্ষার্থীদের ধর্মীয় চাহিদাকে সম্মানজনকভাবে কীভাবে সামলায় - কারণ এমন ভারসাম্য তৈরি করতে পারলেই ‘লাল বড়দারি’ শুধু অতীতের ঐতিহ্য নয়, বর্তমান সময়েরও একটি ইতিবাচক উদাহরণ হয়ে থাকবে।


সম্পর্কিত নিউজ