আবারো বাড়ল তেলের দাম দেখুন নতুন মুল্য

আবারো বাড়ল তেলের দাম দেখুন নতুন মুল্য
  • Author,
  • Role, জাগরণ নিউজ বাংলা
  • লেখক, Showanur Rahman

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের উত্তেজনা বাড়তে থাকায় এবং পারস্য উপসাগরের গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ হরমুজ প্রণালী দিয়ে তেল পরিবহন বিঘ্নিত হওয়ার আশঙ্কা তীব্র হওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে টানা তৃতীয় দিনের মতো অপরিশোধিত তেলের দাম ঊর্ধ্বমুখী হয়েছে। বাজার বিশ্লেষকদের মতে, সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে তেলের দামে “রিস্ক প্রিমিয়াম” আরও বাড়বে-যার প্রভাব পড়তে পারে জ্বালানি আমদানিনির্ভর দেশগুলোর মূল্যস্ফীতি, পরিবহন ব্যয় ও শিল্প উৎপাদন ব্যয়ে।

ব্রেন্ট–ডাব্লিউটিআই

রয়টার্সের তথ্য অনুযায়ী, মঙ্গলবার লেনদেনের এক পর্যায়ে ব্রেন্ট ক্রুড $79.44/ব্যারেল (প্রায় ২.২% বৃদ্ধি) এবং ডাব্লিউটিআই $72.40/ব্যারেল (প্রায় ১.৬% বৃদ্ধি) হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরান–কেন্দ্রিক সংঘাত ছড়িয়ে পড়ায় সরবরাহ ঝুঁকি বাড়ছে এবং তেল ছাড়াও ডিজেল, গ্যাসোলিন ও ইউরোপীয় গ্যাসঅয়েলসহ জ্বালানি পণ্যের দামে চাপ দেখা যাচ্ছে।


সোমবার ব্রেন্ট এক পর্যায়ে $82.37-এ উঠে পরে কিছুটা নেমে $79-এর মধ্যে স্থিত হয়-এটি মূলত যুদ্ধ–উত্তেজনা হঠাৎ তীব্র হওয়া এবং হরমুজ প্রণালী নিয়ে শঙ্কা বাড়ার প্রতিক্রিয়া। এই ধরনের দিনগুলোতে বাজারে “হেডলাইন-ড্রিভেন ট্রেডিং” বাড়ে: যুদ্ধসংক্রান্ত কোনো ঘোষণা/আক্রমণের খবর এলেই তেলের দাম দ্রুত লাফ দেয়, পরে কিছুটা সংশোধনও হয়।
হরমুজ প্রণালী কেন এত গুরুত্বপূর্ণ

হরমুজ প্রণালীকে বলা হয় বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি “চোকপয়েন্ট”গুলোর একটি। যুক্তরাষ্ট্রের EIA (Energy Information Administration)–র তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে হরমুজ প্রণালী দিয়ে গড়ে প্রায় ২০ মিলিয়ন ব্যারেল/দিন তেল প্রবাহিত হয়েছে-যা বৈশ্বিক পেট্রোলিয়াম তরলের ভোগের প্রায় ২০%-এর সমান।

অর্থাৎ, এই পথ আংশিকভাবে বিঘ্নিত হলেও বাজার ধরে নেয়-বিশ্বব্যাপী সরবরাহ দ্রুত টাইট হতে পারে। আর সরবরাহ টাইট হওয়ার আশঙ্কাই তেলের দাম বাড়ার সবচেয়ে বড় চালিকা শক্তি।

হরমুজ কার্যত বন্ধ”-এই বক্তব্যের পেছনে কী

রয়টার্স জানিয়েছে, ইরানের পক্ষ থেকে হরমুজ প্রণালী বন্ধের ঘোষণা এবং প্রণালী দিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করলে জাহাজে হামলার হুমকির খবর এসেছে।
এ ধরনের পরিস্থিতিতে-even সাময়িকভাবে ট্যাংকার চলাচল কমে গেলে-তেলের দামে তাৎক্ষণিক প্রভাব পড়ে, কারণ ক্রেতারা বিকল্প সরবরাহ নিশ্চিত করতে আগেভাগে বেশি দামে চুক্তি করতে শুরু করে।

S&P Global-এ প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়, IEA (International Energy Agency) এই পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে এবং কিছু শিপিং কোম্পানি/অপারেটর হরমুজ ট্রানজিট স্থগিত করার খবরও এসেছে।

এদিকে গার্ডিয়ানের লাইভ কভারেজে বলা হয়েছে, প্রণালী এলাকায় ট্যাংকার ট্রাফিক কমেছে এবং বাজারে শঙ্কা বাড়ায় ইউরোপীয় শেয়ারবাজারে বড় পতন দেখা গেছে-যা বোঝায়, তেল–গ্যাসের দামের ধাক্কা শুধু এনার্জি সেক্টর নয়, সামগ্রিক অর্থনীতির ঝুঁকিও বাড়ায়।

কোন কোন দেশে কী প্রভাব পড়ছে
১) ইউরোপ: গ্যাস (LNG) ও মূল্যস্ফীতির চাপ

ইউরোপ তেলের পাশাপাশি এলএনজি–বাজারের ওঠানামায়ও সংবেদনশীল। গার্ডিয়ান বলছে, যুদ্ধ–উত্তেজনায় তেলের পাশাপাশি ইউকে ও ইউরোপের গ্যাসদামও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে, যার ফলে মূল্যস্ফীতি নিয়ে উদ্বেগ ও শেয়ারবাজারে চাপ দেখা দেয়।
এই প্রভাব দীর্ঘায়িত হলে ইউরোপে শিল্প উৎপাদন ব্যয়, পরিবহন ব্যয় এবং সুদের হার–সংক্রান্ত প্রত্যাশাও বদলাতে পারে-কারণ জ্বালানি দামে দীর্ঘস্থায়ী চাপ মানে মুদ্রাস্ফীতি দীর্ঘস্থায়ী হওয়ার ঝুঁকি।

২) এশিয়া: আমদানিনির্ভর বড় অর্থনীতিগুলো বেশি ঝুঁকিতে

এশিয়ার অনেক দেশ (চীন, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, ভারতসহ) মধ্যপ্রাচ্য থেকে বড় পরিসরে তেল/গ্যাস আমদানি করে। হরমুজে বিঘ্ন মানে-ট্যাংকার রুট বদল, ডেলিভারি দেরি, শিপিং–ইনস্যুরেন্স ব্যয় বৃদ্ধি, এবং স্পট মার্কেটে দাম বেড়ে যাওয়া। এশিয়ার সরবরাহ নিরাপত্তা ঝুঁকি নিয়ে ডেটা–ভিত্তিক ব্রিফিংয়ে দেখানো হয়েছে-হরমুজে বড় ধরনের বিঘ্ন হলে বেশ কিছু এশীয় অর্থনীতি তুলনামূলকভাবে বেশি ঝুঁকিতে পড়ে।

৩) উপসাগরীয় দেশগুলো: রপ্তানি আটকে যাওয়ার ঝুঁকি, শিপিং–ইনস্যুরেন্স ব্যয় বৃদ্ধি

যেসব দেশ তেল–গ্যাস রপ্তানিতে উপসাগরীয় রুটের ওপর নির্ভরশীল, তাদের জন্য বড় ঝুঁকি হলো-রপ্তানি আটকে যাওয়া বা বিলম্ব, এবং বীমা/ভাড়ার হার বেড়ে যাওয়া। রয়টার্স বলছে, কিছু ক্ষেত্রে ট্যাংকার বিমা কভারেজ কমে যাওয়ার খবরও এসেছে-এটা বাজারে সরবরাহ ঝুঁকি আরও বাড়িয়ে দেয়।


আমাদের জন্য ঝুঁকি কোথায়, কীভাবে প্রভাব আসতে পারে

বাংলাদেশ সরাসরি হরমুজ–ভিত্তিক তেল/গ্যাস আমদানির নির্দিষ্ট দেশভিত্তিক ডেটা এই মুহূর্তে এক জায়গায় সহজে না মিললেও বাস্তবতা হলো-বাংলাদেশ আমদানিনির্ভর জ্বালানি অর্থনীতি। আন্তর্জাতিক বাজারে টানা দাম বাড়লে প্রভাব সাধারণত কয়েকটি চ্যানেলে আসে:

১) আমদানি ব্যয় ও বৈদেশিক মুদ্রার চাপ
ব্রেন্ট/ডাব্লিউটিআই বাড়ার মানে পরিশোধিত জ্বালানি ও ক্রুড-দুই ক্ষেত্রেই আমদানি ব্যয় বাড়তে পারে। দাম দীর্ঘ সময় উঁচু থাকলে এলসি খরচ ও মোট আমদানি বিল বাড়ে-এটা রিজার্ভ ও মুদ্রাবাজারের ওপর চাপ তৈরি করতে পারে। (এটি অর্থনৈতিক প্রভাবের মানক বিশ্লেষণ; নির্দিষ্ট নীতি পদক্ষেপ দেশীয় সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভরশীল।)

২) পরিবহন ব্যয় ও খাদ্য–পণ্যের দামে চাপ
ডিজেল–নির্ভর পরিবহন খরচ বাড়লে সেটি পণ্য পরিবহনের মাধ্যমে বাজারে ছড়িয়ে পড়ে-বিশেষ করে কৃষিপণ্য, ভোগ্যপণ্য ও নির্মাণ–সাপ্লাই চেইনে। রয়টার্স ইতিমধ্যে বলছে, তেল ছাড়াও ডিজেল/গ্যাসোলিনসহ জ্বালানি পণ্যের দাম বাড়ছে-এটা “পাস–থ্রু” ঝুঁকি বাড়ায়।

৩) বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয় ও শিল্প খাত
যদি আন্তর্জাতিক বাজার দীর্ঘদিন উর্ধ্বমুখী থাকে, তাহলে বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয় (ফুয়েল–মিক্স অনুযায়ী) এবং শিল্প উৎপাদন ব্যয় বাড়ার ঝুঁকি থাকে-বিশেষ করে যেসব খাত জ্বালানিনির্ভর (সিমেন্ট, টেক্সটাইলের কিছু অংশ, লজিস্টিকস ইত্যাদি)।

৪)  মুদ্রাস্ফীতি প্রত্যাশা
গার্ডিয়ান দেখিয়েছে, ইউরোপে গ্যাসদাম লাফ দেওয়ায় সুদের হার ও মূল্যস্ফীতি প্রত্যাশা বদলেছে। একই ধরনের “ইনফ্লেশন ফিয়ার” আমদানিনির্ভর দেশে দ্রুত তৈরি হয়, কারণ জ্বালানি খরচ এক ধরনের ‘কোর কস্ট’।


সামনে কী অপেক্ষা করছে: ৩টি সম্ভাব্য দৃশ্যপট

দৃশ্যপট–১: উত্তেজনা দ্রুত কমে গেলে (স্বল্পমেয়াদি শক)

যদি কূটনৈতিকভাবে উত্তেজনা কমে এবং হরমুজে জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক হয়, তাহলে রিস্ক প্রিমিয়াম দ্রুত কমতে পারে। তবে বাজার সাধারণত কয়েকদিন “সাসপেন্স” রাখে-বীমা ও শিপিং রেট স্বাভাবিক হতে সময় লাগে।

দৃশ্যপট–২: সংঘাত চলবে, কিন্তু পূর্ণ অবরোধ নয় (ভোলাটাইল বাজার)

এ ক্ষেত্রে দামে প্রতিদিন ওঠানামা হবে। রয়টার্সের রিপোর্টে ইঙ্গিত আছে-বিশ্লেষকরা কয়েকদিন দাম উচ্চ থাকতে পারে বলছেন এবং চরম পরিস্থিতিতে আরও বড় লাফের কথাও এসেছে।

দৃশ্যপট–৩: হরমুজে দীর্ঘস্থায়ী বড় বিঘ্ন/আক্রমণ (দাম $100+ ঝুঁকি)

গার্ডিয়ানের লাইভ আপডেট অনুযায়ী বাজারে আশঙ্কা আছে-সংকট গভীর হলে তেল $100/ব্যারেল ছাড়াতে পারে।
রয়টার্স জানায়, কিছু বিশ্লেষক প্রতিষ্ঠান ২০২৬ সালের ব্রেন্টের পূর্বাভাস $65 থেকে $80-এ তুলেছে এবং চরম সংঘাতে দাম $120–$150 পর্যন্ত যেতে পারে-এমন সম্ভাবনাও আলোচনায় এসেছে।


সম্পর্কিত নিউজ