{{ news.section.title }}
মধ্যপ্রাচ্যে বহুমাত্রিক যুদ্ধ: কোন দেশ কার পাশে, বিশ্বনেতাদের অবস্থান কী?
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাত দ্রুত বিস্তৃত হয়ে আঞ্চলিক যুদ্ধের রূপ নিয়েছে। গত শনিবার ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ সামরিক হামলার মধ্য দিয়ে পরিস্থিতির নাটকীয় অবনতি ঘটে। ওই হামলায় তেহরানে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিসহ দেশটির শীর্ষ পর্যায়ের কয়েকজন কর্মকর্তা নিহত হন। ইরানে এখন পর্যন্ত ছয় শতাধিক প্রাণহানির খবর পাওয়া গেছে। এরপর পাল্টা প্রতিক্রিয়ায় ইরান মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে অবস্থিত মার্কিন ঘাঁটি লক্ষ্য করে হামলা চালায়। প্রাথমিকভাবে সামরিক স্থাপনাগুলো টার্গেট করা হলেও এখন বেসামরিক অবকাঠামোও আক্রান্ত হওয়ার অভিযোগ উঠছে।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সতর্ক করে জানিয়েছেন, এযুদ্ধ চার থেকে পাঁচসপ্তাহ পর্যন্ত স্থায়ী হতে পারে। প্রয়োজনে ইরানে স্থল অভিযান চালানোর সম্ভাবনার কথাও তিনি উড়িয়ে দেননি। ফলে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে।
যুক্তরাজ্যের সতর্ক অবস্থান
যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের মিত্র যুক্তরাজ্য এবার সরাসরি যুদ্ধেঅংশ নেয়নি। তবে কাতারের আল-উবেইদ ঘাঁটির সুরক্ষায় আরএএফ টাইফুন মোতায়েনের ঘোষণা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার। লন্ডন জানিয়েছে, তারা ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন করতে দিতে চায়না, কিন্তু সংঘাতের বিস্তারও চায় না। ব্রিটিশ যুদ্ধবিমান কাতারের আকাশে একটি ইরানি ড্রোন ভূপাতিত করেছে বলে প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে-যা এই সংঘাতে তাদের প্রথম প্রত্যক্ষ সম্পৃক্ততা।
রাশিয়ার কড়া প্রতিক্রিয়া
ইরানের ঘনিষ্ঠ মিত্র রাশিয়া যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের হামলাকে ‘পূর্বপরিকল্পিত আগ্রাসন’ হিসেবে আখ্যা দিয়েছে। প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন বলেছেন, খামেনিকে হত্যার ঘটনা আন্তর্জাতিক আইনও নৈতিকতার সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। মস্কোর মতে, এই হামলা মধ্যপ্রাচ্যে মানবিক ও অর্থনৈতিক বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে।
চীনের সংযমের আহ্বান
তেলবাণিজ্যে ইরানের গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার চীন অবিলম্বে যুদ্ধবিরতির আহ্বান জানিয়েছে। বেইজিং বলেছে, ইরানের সার্বভৌমত্ব ও ভৌগোলিক অখণ্ডতার প্রতি সম্মান দেখানো জরুরি। সংলাপ ও কূটনৈতিক প্রচেষ্টার মাধ্যমেই উত্তেজনা প্রশমনের পথ খুঁজতে হবে বলে চীনের অবস্থান।
ইউরোপের বার্তা
ফ্রান্স-এর প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল মাখোঁ, জার্মানি ও যুক্তরাজ্যের নেতাদের সঙ্গে যৌথ বিবৃতিতে সতর্ক করেছেন যে, এই উত্তেজনা সবার জন্য বিপজ্জনক হতে পারে। একই সুরে ইউরোপীয় ইউনিয়ন-এর কমিশন প্রধান উরসুলা ভন ডার লেনসব পক্ষকে সর্বোচ্চ সংযম প্রদর্শনের আহ্বান জানিয়েছেন। বেসামরিক নাগরিকদের সুরক্ষা এবং আন্তর্জাতিক আইন মেনে চলার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রপন্থী দেশগুলোর সমর্থন
কানাডা-এর প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি বলেছেন, ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন থেকে বিরত রাখতে যুক্তরাষ্ট্রের পদক্ষেপকে সমর্থন দেবে তাঁর দেশ।একইভাবে অস্ট্রেলিয়া-র প্রধানমন্ত্রী অ্যান্থনি আলবানিজ সামরিক পদক্ষেপের প্রতি সমর্থন জানালেও সরাসরি হামলায় অংশ না নেওয়ার কথা বলেছেন।
ন্যাটো-এর প্রধান মার্করুতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের পদক্ষেপের প্রশংসা করলেও জোট হিসেবে সরাসরি জড়ানোর পরিকল্পনা নেই বলে স্পষ্ট করেছেন।
ইরানের পক্ষে অবস্থান
উত্তর কোরিয়া হামলাকে ‘অবৈধ আগ্রাসন’ বলে নিন্দা করেছে। ইরাক তিন দিনের জাতীয় শোক ঘোষণা করেছে।পাকিস্তান-এর প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ খামেনির হত্যাকে আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন বলেছেন।
ভারত ও আঞ্চলিক প্রতিক্রিয়া
ভারত-এর প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি শুরুতে নীরব থাকলেও পরে বলেন, ভারত উত্তেজনা কমাতে আলোচনার পক্ষে। স্পেন-এর প্রধানমন্ত্রী পেদ্রোসান চেজ দ্রুত যুদ্ধ বন্ধের আহ্বান জানিয়েছেন।
অন্যদিকে ইউক্রেন-এর প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি ইরানের তীব্র সমালোচনা করেছেন। আলবেনিয়া-র প্রধানমন্ত্রী ইদিরমা ইসরায়েলের পাশে থাকার ঘোষণা দিয়েছেন। হাঙ্গেরি-র প্রধানমন্ত্রী ভিক্টরওরবান জ্বালানি বাজারে প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।
বাংলাদেশের অবস্থান
বাংলাদেশ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে খামেনির হত্যাকাণ্ডে শোক প্রকাশ করেছে এবং আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘনের অভিযোগ তুলেছে। একই সঙ্গে ইরানের পাল্টা হামলায় মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশের সার্বভৌমত্ব ক্ষুণ্ন হওয়ার বিষয়েও উদ্বেগ জানানো হয়েছে। ঢাকা স্পষ্ট করেছে, কোনো সংকটের সমাধান সামরিক সংঘাতে নয়; আলোচনাই একমাত্রপথ।
এই সংঘাত কেবল ইরান-যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; বরং বিশ্বরাজনীতিকে নতুন মেরুকরণের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।জ্বালানি বাজার, বৈশ্বিক বাণিজ্য ও আঞ্চলিক নিরাপত্তা-সব ক্ষেত্রেই এর প্রভাব পড়তে শুরু করেছে।বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা করছেন, দ্রুত কূটনৈতিক উদ্যোগ না নিলে মধ্যপ্রাচ্য দীর্ঘমেয়াদি অস্থিতিশীলতার মুখে পড়তে পারে, যার অভিঘাত বিশ্ব অর্থনীতি ও নিরাপত্তা ব্যবস্থায় সুদূরপ্রসারী হবে।