তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলার পেরিয়ে ১১৫ ডলার

তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলার পেরিয়ে ১১৫ ডলার

মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল ও ইরানকে ঘিরে চলমান যুদ্ধ নতুন এক অর্থনৈতিক ধাক্কা তৈরি করেছে বিশ্ববাজারে। সোমবার সকালে এশিয়ার বাজারে কেনাবেচা শুরু হওয়ার পরই আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলার ছাড়িয়ে যায়। যে আশঙ্কা নিয়ে গত কয়েক দিন ধরে আলোচনা চলছিল, সপ্তাহের প্রথম দিনেই তার বাস্তব প্রতিফলন দেখা গেল। একই সঙ্গে এশিয়ার বিভিন্ন শেয়ারবাজারে বড় ধরনের পতন নেমে আসে, যা বিনিয়োগকারীদের উদ্বেগ আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।

বিশ্লেষকেরা আগেই ধারণা দিয়েছিলেন, চলতি সপ্তাহেই তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলার অতিক্রম করতে পারে। কিন্তু বাস্তবতা আরও দ্রুত বদলে গেল। সপ্তাহের প্রথম কার্যদিবসেই এশিয়ার বাজারে তেলের দাম সেই সীমা ছাড়িয়ে যায়। বিবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুদ্ধ পরিস্থিতির তীব্রতা এবং জ্বালানি সরবরাহে অনিশ্চয়তা একসঙ্গে এই মূল্যবৃদ্ধিকে ত্বরান্বিত করেছে।

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের সংঘাত ক্রমেই জটিল ও বিস্তৃত রূপ নিচ্ছে। কোনো পক্ষই আপসের ইঙ্গিত দিচ্ছে না। ফলে শুধু সামরিক উত্তেজনাই নয়, বিশ্ববাজারে জ্বালানি সরবরাহ ও বাণিজ্যিক স্থিতিশীলতা নিয়েও তৈরি হয়েছে বড় ধরনের উদ্বেগ। এর সরাসরি প্রতিফলন পড়েছে আন্তর্জাতিক তেলের বাজারে। সর্বশেষ লেনদেনে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১১৫ ডলারে পৌঁছেছে। একই সঙ্গে বিভিন্ন দেশের শেয়ারবাজারে সূচকের বড় পতন দেখা গেছে।

এই পরিস্থিতিকে আরও উদ্বেগজনক করে তুলেছে হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে তৈরি হওয়া অনিশ্চয়তা। বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ তেল পরিবহনপথ এই প্রণালি দিয়ে মধ্যপ্রাচ্য থেকে বিপুল পরিমাণ জ্বালানি বিশ্ববাজারে যায়। সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে এই পথ দিয়ে জ্বালানি পরিবহন দীর্ঘ সময়ের জন্য ব্যাহত হতে পারে-এমন আশঙ্কা ক্রমেই জোরালো হচ্ছে।

এর মধ্যে রোববার ইরান ঘোষণা দিয়েছে, দেশটির সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আলী খামেনির উত্তরসূরি হিসেবে তাঁর ছেলে মোজতবা খামেনির নাম নির্ধারণ করা হয়েছে। সংঘাত শুরুর এক সপ্তাহের মাথায় এ ঘোষণা তেহরানের ক্ষমতার ভেতরের বার্তাও স্পষ্ট করেছে। এতে বোঝা যাচ্ছে, রাজধানীকেন্দ্রিক ক্ষমতার বলয় এখনো খামেনিপন্থী গোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রণেই রয়েছে।

একই সময়ে শনিবার ও রোববার ইরানের বিভিন্ন স্থানে নতুন করে বিমান হামলা চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল। এসব হামলায় তেলের ডিপোসহ বিভিন্ন জ্বালানি ও কৌশলগত স্থাপনা লক্ষ্যবস্তু হয়েছে। ফলে বাজারে এই আশঙ্কা আরও বেড়েছে যে, মধ্যপ্রাচ্য থেকে জ্বালানি সরবরাহে বড় ধরনের বিঘ্ন ঘটতে পারে। এর প্রভাব সরাসরি পড়বে বিশ্বজুড়ে ভোক্তা, শিল্পপ্রতিষ্ঠান ও পরিবহন খাতে।

সোমবার এশিয়ার বাজার খোলার পর দেখা যায়, ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ২২ শতাংশ বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ১১৫ ডলারে উঠে গেছে। একই সময়ে ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট বা ডব্লিউটিআই ক্রুডের দাম ২২ শতাংশ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১১৩ দশমিক ৪০ ডলারে। মারাবান ক্রুডের দামও বেড়ে ১২০ ডলারে পৌঁছেছে। এসব সংখ্যা স্পষ্ট করে দিচ্ছে যে, জ্বালানি বাজার এখন আর শুধু উত্তেজনায় নয়, বাস্তব সরবরাহ-সংকটের আশঙ্কায়ও নড়বড়ে হয়ে পড়েছে।

আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) সতর্ক করে বলেছে, তেলের দাম প্রতি ১০ শতাংশ বাড়লে সামগ্রিক মূল্যস্ফীতি বাড়তে পারে শূন্য দশমিক ৪ শতাংশ। একই সঙ্গে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি কমে যেতে পারে শূন্য দশমিক ১৫ শতাংশ। আল জাজিরার বরাতে এই মূল্যায়ন সামনে আসার পর উদ্বেগ আরও বেড়েছে, কারণ জ্বালানির দামের প্রভাব কেবল তেলেই সীমাবদ্ধ থাকে না; এর প্রভাব পরিবহন, শিল্প উৎপাদন, খাদ্য সরবরাহ এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দামে ছড়িয়ে পড়ে।

শেয়ারবাজারেও বড় ধাক্কা

তেলের দামের এই উল্লম্ফনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের শেয়ারবাজারগুলোতেও বড় ধরনের পতন দেখা গেছে। জাপানের নিক্কেই ২২৫ সূচক ৭ শতাংশের বেশি কমেছে। হংকংয়ের হ্যাংসেং সূচক নেমেছে ৩ শতাংশেরও বেশি। অস্ট্রেলিয়ার এএসএক্স ২০০ সূচকও ৪ শতাংশের বেশি হারিয়েছে।

সবচেয়ে তীব্র পতন দেখা গেছে দক্ষিণ কোরিয়ায়। দেশটির কোসপি সূচক ৮ শতাংশেরও বেশি নেমে গেলে আতঙ্কিত বিনিয়োগকারীরা শেয়ার বিক্রি শুরু করেন। পরিস্থিতি সামাল দিতে ২০ মিনিটের জন্য লেনদেন বন্ধ করে দিতে হয়। বাজারে অতিরিক্ত বিক্রি ঠেকাতে ব্যবহৃত এই ব্যবস্থাকে বলা হয় ‘সার্কিট ব্রেকার’। এর আগে গত বুধবারও কোসপি সূচক ১২ শতাংশ পড়ে যাওয়ার পর একই ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল।

গত সপ্তাহ পর্যন্ত বাজারে এতটা আতঙ্ক না থাকলেও ঝুঁকির ইঙ্গিত ছিল স্পষ্ট। উপসাগরীয় অঞ্চলে উৎপাদিত বিপুল পরিমাণ অপরিশোধিত তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস হরমুজ প্রণালি দিয়েই পরিবাহিত হয়। কিন্তু শনি ও রোববার সংঘাতের তীব্রতা বাড়ার পর ইরান ও উপসাগরীয় অঞ্চলের বিভিন্ন স্থানে জ্বালানি অবকাঠামো ধ্বংসের খবর বাজারে নতুন আতঙ্ক তৈরি করে। এর ফলে তেলের সরবরাহ স্বাভাবিক থাকবে কি না, তা নিয়ে গুরুতর সন্দেহ তৈরি হয়েছে।

বাস্তবতা হলো, হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল বন্ধ হয়ে যাওয়ার কারণে বিপুল পরিমাণ অপরিশোধিত তেল আটকে আছে। এই অবস্থায় ইরাক, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও কুয়েত-ওপেকভুক্ত এই তিন বড় উৎপাদক দেশ উৎপাদন কমিয়ে দিয়েছে বলে আল জাজিরার প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। অর্থাৎ বাজার এখন শুধু যুদ্ধের খবর শুনে প্রতিক্রিয়া দেখাচ্ছে না, সরবরাহ ব্যবস্থার বাস্তব সংকোচনেরও মুখোমুখি হয়েছে।

১৯৮৩ সালের পর সবচেয়ে বড় সাপ্তাহিক উত্থান

সাম্প্রতিক বাজারের তথ্য দেখাচ্ছে, সংকটের গভীরতা দ্রুত বাড়ছে। মার্কিন ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট (WTI) অপরিশোধিত তেলের দাম ২৮ শতাংশ বেড়ে প্রতি ব্যারেল প্রায় ১১৬ ডলারে পৌঁছেছে। একইভাবে ব্রেন্ট ক্রুডও ২৬ শতাংশ বেড়ে প্রায় ১১৭ ডলারে লেনদেন হচ্ছে।

সবচেয়ে আলোচিত বিষয় হলো, গত সপ্তাহেই মার্কিন অপরিশোধিত তেলের দাম প্রায় ৩৫ শতাংশ বেড়েছে। ১৯৮৩ সালের পর ফিউচার বাজারের ইতিহাসে এক সপ্তাহে এটিই সবচেয়ে বড় উত্থান। জ্বালানি বিশ্লেষকদের মতে, হরমুজ প্রণালীর পরিস্থিতি দ্রুত স্বাভাবিক না হলে সামনে আরও বড় সংকট অপেক্ষা করছে।

তেল কি ১৫০ ডলার ছাড়াবে?

এখন বাজারের সবচেয়ে বড় প্রশ্ন-এই অস্থিরতা কোথায় গিয়ে থামবে। কিছু বিশ্লেষকের মতে, মার্চের শেষ পর্যন্ত যদি হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকে, তাহলে তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১৫০ ডলার ছাড়িয়ে যেতে পারে। সে ক্ষেত্রে নতুন রেকর্ড তৈরি হবে, আর এর অভিঘাত পড়বে বিশ্বজুড়ে মুদ্রাস্ফীতি, পরিবহন খরচ, শিল্প উৎপাদন এবং সাধারণ ভোক্তার জীবনযাত্রায়।

ওয়াশিংটনভিত্তিক পিটারসন ইনস্টিটিউট ফর ইন্টারন্যাশনাল ইকোনমিকসের অর্থনীতিবিদ আদনান মাজরেই বলেছেন, উপসাগরীয় কয়েকটি দেশে তেল উৎপাদন বন্ধ হয়ে যাওয়া এবং সংঘাত দ্রুত শেষ হওয়ার সম্ভাবনা কমে যাওয়াই দামের এই উল্লম্ফনের প্রধান কারণ। তাঁর মতে, অনেকেই এখন বুঝতে পারছেন যে যুদ্ধ দ্রুত শেষ হওয়ার সম্ভাবনা কম। যুক্তরাষ্ট্র যে নিরাপত্তা নিশ্চয়তা ও কৌশলগত লক্ষ্য সামনে রেখে এগোচ্ছে, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তা কতটা বাস্তবসম্মত-সে প্রশ্নও জোরালো হচ্ছে।

তেলের দাম বাড়ার অর্থ শুধু জ্বালানির দাম বাড়া নয়। এর সঙ্গে জেট ফুয়েল, সার উৎপাদনের কাঁচামালসহ আরও বহু পণ্যের দাম বেড়ে যেতে পারে। ফলে কৃষি, বিমান পরিবহন, শিল্প উৎপাদন এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্য-সবখানেই চাপ বাড়বে।

বিশেষ করে উপসাগরীয় অঞ্চলের জ্বালানির বড় অংশ ব্যবহার করে এশিয়ার দেশগুলো। এরই মধ্যে দেখা যাচ্ছে, এশিয়ার ক্রেতারা যুক্তরাষ্ট্রের গ্যাসের জন্য বেশি দাম দিতে শুরু করেছেন। ফলে ইউরোপমুখী কিছু গ্যাসবাহী জাহাজ মাঝ আটলান্টিক থেকেই দিক পরিবর্তন করে এশিয়ার পথে ঘুরছে। এর অর্থ, জ্বালানি সরবরাহের বৈশ্বিক মানচিত্রও দ্রুত বদলাতে শুরু করেছে।

তেলের দাম বাড়ার প্রতিক্রিয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, স্বল্প মেয়াদে দামের এই বৃদ্ধি বড় কোনো বিষয় নয়। তাঁর ভাষ্য, ইরানের পারমাণবিক হুমকি দূর করতে হলে এই মূল্য দিতে হবে। তবে একই সময়ে তাঁর জ্বালানিমন্ত্রী মার্কিন গণমাধ্যমকে বলেছেন, ইরানের জ্বালানি অবকাঠামোতে হামলা চালাচ্ছে ইসরায়েল, যুক্তরাষ্ট্র নয়। যুক্তরাষ্ট্রে জ্বালানির খুচরা দাম বেড়ে যাওয়ার যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে, সেই প্রেক্ষাপটে এই বক্তব্য বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

সব মিলিয়ে স্পষ্ট হচ্ছে, মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ এখন আর শুধু একটি আঞ্চলিক সামরিক সংঘাত নয়; এটি বিশ্ব অর্থনীতি, জ্বালানি নিরাপত্তা এবং শেয়ারবাজারের জন্য বড় ধরনের ঝুঁকিতে পরিণত হয়েছে। তেলের দাম ১০০ ডলার ছাড়িয়ে ১১৫ ডলারে পৌঁছানো, এশিয়ার বাজারে বড় পতন, হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে অনিশ্চয়তা এবং ১৫০ ডলারে পৌঁছানোর আশঙ্কা-সবকিছু মিলিয়ে বিশ্ব অর্থনীতি এখন অত্যন্ত সংবেদনশীল এক পর্যায়ে দাঁড়িয়ে।


সম্পর্কিত নিউজ