{{ news.section.title }}
ইসরায়েল থেকে স্থায়ীভাবে রাষ্ট্রদূত প্রত্যাহার করল স্পেন
ইরানকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সামরিক অভিযানের বিরোধিতা এবং গাজা যুদ্ধ নিয়ে দীর্ঘদিনের মতপার্থক্যের জেরে ইসরায়েল–স্পেন কূটনৈতিক সম্পর্ক নতুন করে আরও কঠিন মোড় নিয়েছে। সর্বশেষ পদক্ষেপ হিসেবে স্পেন ইসরায়েলে নিযুক্ত তাদের রাষ্ট্রদূতের পদ আনুষ্ঠানিকভাবে “সমাপ্ত/বাতিল” করেছে।
ফলে তেল আবিবে স্পেনের দূতাবাস আপাতত চার্জ দ্য অ্যাফেয়ার্স (অন্তর্বর্তী প্রধান কূটনীতিক) দিয়ে পরিচালিত হবে। ইউরোপীয় ও আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলো জানিয়েছে, এই সিদ্ধান্ত বাস্তবে গত বছরের সেপ্টেম্বর মাসে রাষ্ট্রদূতকে “পরামর্শের জন্য” দেশে ডেকে আনার ধারাবাহিকতারই স্থায়ী রূপ-এবার আর দূতাবাসে পূর্ণ রাষ্ট্রদূত পর্যায়ের প্রতিনিধিত্ব থাকছে না।
সরকারি গেজেটে কী বলা হয়েছে
আল জাজিরা ও ইউরোনিউজের প্রতিবেদন অনুযায়ী, স্পেনের সরকারি গেজেটে রাষ্ট্রদূত আনা মারিয়া স্যালোমোন পেরেজ–এর নিয়োগ “সমাপ্ত” করার ঘোষণা প্রকাশ করা হয়। এতে স্পষ্ট করা হয়েছে-কাউন্সিল অব মিনিস্টার্সের বৈঠকে (১০ মার্চ) সিদ্ধান্তের পর রাষ্ট্রদূত পদ বাতিল করা হয়েছে এবং স্পেনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রস্তাবনায় এটি কার্যকর হয়েছে। একই রিপোর্টে বলা হয়েছে, স্পেনের দূতাবাস কার্যক্রম বন্ধ হচ্ছে না; বরং রাষ্ট্রদূত না রেখে চার্জ দ্য অ্যাফেয়ার্স–এর নেতৃত্বে কাজ চলবে।
কেন সম্পর্ক আরও খারাপ হলো-দুটি বড় ইস্যু
এই কূটনৈতিক টানাপোড়েনের পেছনে দুইটি বড় ফ্রন্ট কাজ করছে-গাজা যুদ্ধ এবং ইরান নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র–ইসরায়েলের সামরিক পদক্ষেপ।
গাজা যুদ্ধ নিয়ে স্পেনের অবস্থান
২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের হামলার পর গাজায় ইসরায়েলের সামরিক অভিযান শুরু হলে ইউরোপের ভেতরে সবচেয়ে উচ্চকণ্ঠ সমালোচকদের একটি দেশ হয়ে ওঠে স্পেন। স্পেনের প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ একাধিকবার গাজায় মানবিক বিপর্যয় বন্ধে চাপ দেওয়ার কথা বলেন। এই অবস্থানকে ঘিরে তেল আবিবের সঙ্গে মাদ্রিদের সম্পর্ক ধারাবাহিকভাবে ঠান্ডা হতে থাকে।
ইরান হামলার বিরোধিতা ও মার্কিন ঘাঁটি ব্যবহারে ‘না’
ইরানে যুক্তরাষ্ট্র–ইসরায়েলের হামলার পর স্পেন প্রকাশ্যে এর বিরোধিতা করে এবং স্পেনের ভূখণ্ডে যৌথভাবে পরিচালিত মার্কিন ঘাঁটি (রোটা, মোরোন)-এসব যেন ইরান অভিযানে ব্যবহার না হয়, সে অবস্থানও জানায়। এই ভিন্ন অবস্থান ইসরায়েলের সঙ্গে কূটনৈতিক উত্তেজনা আরও বাড়ায়।
২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরের ঘটনাই ছিল ‘টার্নিং পয়েন্ট’
স্পেনের রাষ্ট্রদূত প্রত্যাহারের শেকড় মূলত গত বছরের সেপ্টেম্বরের ঘটনার মধ্যে। রয়টার্স জানায়, স্পেন ঘোষণা দেয়-ইসরায়েলগামী অস্ত্রবাহী বিমান বা জাহাজ স্পেনের বন্দর ও আকাশপথ ব্যবহার করতে পারবে না। পাশাপাশি গাজা পরিস্থিতি নিয়ে স্পেনের ভাষা ও পদক্ষেপ-ইসরায়েল পক্ষ থেকে তীব্র প্রতিক্রিয়া তৈরি করে। ওই সময় ইসরায়েলের পররাষ্ট্রমন্ত্রী গিদেওন সার স্পেনের অবস্থানকে “ইহুদিবিদ্বেষী” বলে সমালোচনা করেছিলেন এবং স্পেনের দুই মন্ত্রীকে ইসরায়েলে প্রবেশে নিষেধাজ্ঞার কথাও রিপোর্ট হয়।
এর পরই স্পেন তাদের রাষ্ট্রদূতকে তেল আবিব থেকে দেশে ডেকে আনে। তখন সেটি ছিল “পরামর্শের জন্য তলব”-কিন্তু বাস্তবে তিনি আর পূর্ণ দায়িত্বে ফিরেননি। এবারের সরকারি গেজেটের সিদ্ধান্ত সেই “অস্থায়ী প্রত্যাহার”–কে আনুষ্ঠানিকভাবে স্থায়ী পর্যায়ে নামিয়ে আনল।
পাল্টা বাস্তবতা: স্পেনেও ইসরায়েলের রাষ্ট্রদূত নেই
এখানে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রেক্ষাপট আছে-স্পেন যে একতরফাভাবে দূরত্ব তৈরি করছে, বিষয়টি এমন নয়; বরং দুই দেশই কার্যত দূতাবাস পরিচালনা করছে চার্জ দ্য অ্যাফেয়ার্স দিয়ে। ইউরোনিউজ ও অন্যান্য প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৪ সালের মে মাসে স্পেন ফিলিস্তিন রাষ্ট্রকে স্বীকৃতি দেওয়ার পর ইসরায়েল মাদ্রিদ থেকে তাদের রাষ্ট্রদূতকে ফিরিয়ে নেয়। এরপর ইসরায়েল স্পেনে পূর্ণ রাষ্ট্রদূত পুনর্নিয়োগ করেনি; ফলে মাদ্রিদে ইসরায়েলি দূতাবাসও চার্জ দ্য অ্যাফেয়ার্স দ্বারা পরিচালিত হচ্ছে।
এই বাস্তবতায় স্পেনের সর্বশেষ সিদ্ধান্তকে অনেক বিশ্লেষক “reciprocity” বা সমতার ভিত্তিতে নেওয়া পদক্ষেপ হিসেবেও দেখছেন-যদিও এর রাজনৈতিক অর্থ হলো সম্পর্ককে আরও নিচের স্তরে নামিয়ে আনা।
কূটনৈতিক সম্পর্ক
রাষ্ট্রদূত পর্যায় না থাকলে সাধারণত-
- উচ্চ পর্যায়ের দ্বিপক্ষীয় বার্তা আদান–প্রদান ধীর হয়
- রাজনৈতিক ভুল বোঝাবুঝি দ্রুত নিরসনের চ্যানেল সংকুচিত হয়
- কনস্যুলার সেবা (ভিসা/নাগরিক সহায়তা) চললেও সিদ্ধান্ত গ্রহণে “লোয়ার লেভেল” বাস্তবতা তৈরি হয়
- সংকটকালে যোগাযোগের “হাই ট্রাস্ট” স্তর কমে যায়
স্পেনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, দূতাবাস বন্ধ হচ্ছে না, তবে রাষ্ট্রদূত না থাকায় প্রতিনিধিত্বের মর্যাদা ও কূটনৈতিক বার্তার ওজন বদলে যাবে-এটাই এখন মূল বাস্তবতা।
সামনে কী হতে পারে
প্রতিবেদনগুলো ইঙ্গিত দেয়-স্পেন যদি ভবিষ্যতে আবার রাষ্ট্রদূত নিয়োগ করতেও চায়, সেক্ষেত্রে তা ইসরায়েলের সম্মতি/অ্যাগ্রেমো (agrément)–এর ওপরও নির্ভর করবে। আবার ইসরায়েলও স্পেনে পূর্ণ রাষ্ট্রদূত পাঠাবে কি না-সেটি একই কূটনৈতিক পরিবেশের অংশ। ফলে, দুই দেশের সম্পর্ক এখন “ফিরবে কি ফিরবে না”-এর চেয়ে বেশি “কবে এবং কোন শর্তে ফিরবে”-এই প্রশ্নে আটকে আছে।