যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের বিরুদ্ধে যুদ্ধে 'মুসলিম বিশ্ব' কেন ইরানের পাশে নেই?

যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের বিরুদ্ধে যুদ্ধে 'মুসলিম বিশ্ব' কেন ইরানের পাশে নেই?
ছবির ক্যাপশান, যুদ্ধে ইরানের পাশে নেই ‘মুসলিম বিশ্ব’
  • Author,
  • Role, জাগরণ নিউজ বাংলা
  • লেখক, Showanur Rahman

দুই সপ্তাহেরও বেশি সময় ধরে ইরানের ওপর ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের ধারাবাহিক হামলা চললেও মুসলিম বিশ্বের বড় অংশ এখনো সরাসরি বা কার্যকরভাবে তেহরানের পাশে দাঁড়ায়নি। বরং সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহে দেখা যাচ্ছে, উপসাগরীয় বহু আরব দেশ যুদ্ধ থামাতে কূটনৈতিক তৎপরতার কথা বললেও ইরানকে সামরিক বা কৌশলগত সহায়তা দেওয়ার পথে হাঁটছে না।

 এর পেছনে রয়েছে দীর্ঘদিনের আস্থাহীনতা, আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা, জাতীয় স্বার্থ, জ্বালানি নিরাপত্তা, এবং যুক্তরাষ্ট্রনির্ভর নিরাপত্তা কাঠামোর মতো জটিল বাস্তবতা। সাম্প্রতিক বিশ্লেষণেও বলা হচ্ছে, উপসাগরীয় দেশগুলো এখন একদিকে যুদ্ধের বিস্তার ঠেকাতে চায়, অন্যদিকে অসমাপ্ত কোনো সংঘাত ইরানকে আরও সাহসী করে তুলতে পারে-এই আশঙ্কাও তাদের রয়েছে।

মুসলিম দেশগুলো প্রায়ই বৃহত্তর ইসলামি সংহতির কথা বললেও বাস্তবে মধ্যপ্রাচ্যের রাজনৈতিক বাস্তবতা অনেক বেশি খণ্ডিত। প্রতিটি রাষ্ট্র মূলত নিজস্ব শাসনব্যবস্থা, নিরাপত্তা, অর্থনীতি ও আঞ্চলিক অবস্থান বিবেচনা করেই সিদ্ধান্ত নেয়। এ কারণেই কেবল ধর্মীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে তারা ইরানকে সমর্থন করতে এগিয়ে আসছে না। বিশেষ করে যুদ্ধ শুরুর পর ইরানের পাল্টা হামলার লক্ষ্যবস্তু যখন সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কুয়েত, কাতার, ওমানসহ উপসাগরীয় অবকাঠামোও হয়েছে, তখন অনেক আরব দেশের কাছে তেহরানকে সম্ভাব্য অংশীদার নয়, বরং সরাসরি নিরাপত্তা-ঝুঁকি হিসেবেই দেখা আরও জোরদার হয়েছে। রয়টার্স জানিয়েছে, উপসাগরীয় দেশগুলো এখন প্রকাশ্যে না হলেও যুক্তরাষ্ট্রকে ইরানের সামরিক সক্ষমতা দীর্ঘমেয়াদে দুর্বল করার পক্ষে চাপ দিচ্ছে।

দীর্ঘদিন ধরে অত্যন্ত দক্ষতার সাথে আরব বিশ্বের কাছে নিজেদেরকে ইসলামি সংহতির রক্ষক এবং সকল মুসলিমের জন্য একটি মানবিক বার্তার বাহক হিসেবে উপস্থাপন করার চেষ্টা করেছে তেহরান। কিন্তু আজ সেই ইরানই রমজান মাসের মাঝখানে আরব দেশগুলোর ওপর হামলা চালাচ্ছে, বলছেন মধ্যপ্রাচ্য বিশেষজ্ঞ ইয়াসমিনা আসরাগিস।

ইরানের দীর্ঘমেয়াদি কৌশলের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল নিজেকে “প্রতিরোধের محور” বা আঞ্চলিক প্রতিরোধশক্তির কেন্দ্র হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা। ফিলিস্তিন ইস্যুতে অবস্থান, হেজবুল্লাহ, হুথি ও ইরাকের মিত্রগোষ্ঠীগুলোকে সমর্থন, এবং ইসরায়েলবিরোধী বক্তব্য-সব মিলিয়ে তেহরান বহু বছর ধরে মুসলিম বিশ্বের একাংশের কাছে নিজস্ব এক ভাবমূর্তি গড়ে তোলে। কিন্তু আরব বিশ্বের বহু সরকার শুরু থেকেই এটিকে ফিলিস্তিনি অধিকারের প্রশ্নের চেয়ে বেশি দেখেছে আঞ্চলিক প্রভাব বিস্তারের প্রচেষ্টা হিসেবে। আটলান্টিক কাউন্সিলে প্রকাশিত এক বিশ্লেষণে ‘মিডল ইস্ট গ্লোবাল অ্যাফেয়ার্স কাউন্সিল’-এর নির্বাহী পরিচালক খালিদ আল-জাবের লিখেছেন, “চলমান সংঘাত যেদিকেই যাক না কেন, আঞ্চলিকভাবে ইরানের ভাবমূর্তির যে ক্ষতি হয়েছে সেটি ইতিমধ্যেই স্পষ্ট। একবার আস্থা নষ্ট হয়ে গেলে, তা পুনরায় ফিরে পাওয়া অত্যন্ত কঠিন।”

ইরান কোনো আরব দেশ নয়, তারা ভিন্ন ভাষায় কথা বলে এবং জনসংখ্যার সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ শিয়া। যদিও বিশ্বজুড়ে মুসলমানদের বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশই সুন্নি। পিউ রিসার্চ সেন্টারের হিসাবে, বৈশ্বিক মুসলিম জনসংখ্যার প্রায় ৮৭ থেকে ৯০ শতাংশ সুন্নি এবং ১০ থেকে ১৩ শতাংশ শিয়া। এই বিভাজনের শিকড় ইসলামের সূচনালগ্নের রাজনৈতিক উত্তরাধিকার প্রশ্নে, যা পরে ধর্মীয় ও মতাদর্শগত পার্থক্যে গভীর হয়েছে। বর্তমান যুদ্ধের সঙ্গে ধর্মের সম্পর্ক সরাসরি প্রধান কারণ না হলেও মধ্যপ্রাচ্যে ক্ষমতার ভারসাম্য নির্ধারণে সুন্নি-শিয়া বিভাজন বহু দশক ধরে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে এসেছে।

ওয়াশিংটন ইনস্টিটিউট ফর মিডল ইস্ট পলিসির বিশেষজ্ঞ ফ্যাব্রিস ব্যালানশ বিবিসিকে বলছেন, ’শিয়াদের সঙ্গে সুন্নিদের কোনো সংহতি হতে পারে না, বিশেষ করে যখন শিয়া অধ্যুষিত ইরান সুন্নি রাষ্ট্রগুলোতে হামলা চালায়।’

এই অবিশ্বাসের পেছনে ঐতিহাসিক ও ভূরাজনৈতিক কারণও রয়েছে। ১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের পর সৌদি আরবসহ উপসাগরীয় রাজতন্ত্রগুলো ইরানের বিপ্লব “রপ্তানি” নীতিকে উদ্বেগের চোখে দেখেছিল। রয়টার্সের ঐতিহাসিক টাইমলাইনে বলা হয়েছে, শাহর পতনের পর সৌদি নেতৃত্ব আশঙ্কা করেছিল যে তেহরান আঞ্চলিক রাজতান্ত্রিক ব্যবস্থার জন্য আদর্শিক হুমকি হয়ে উঠতে পারে। বহু বছর ধরে রিয়াদ ও তেহরান একে অপরকে আঞ্চলিক প্রাধান্যের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে দেখেছে। ২০২৩ সালে চীনের মধ্যস্থতায় দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্ক পুনঃস্থাপন হলেও সেই মৌলিক অবিশ্বাস পুরোপুরি দূর হয়নি।

এই অঞ্চলে কিংবা বিশ্বজুড়ে ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানের খুব বেশি মিত্র কোনোকালেই ছিল না, কিন্তু এখন কার্যত পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে দেশটি। প্রায় অর্ধশতাব্দীর ধর্মীয় শাসনব্যবস্থা ইরানকে মধ্যপ্রাচ্যের শান্তি বিঘ্নকারী প্রধান দেশগুলোর একটিতে পরিণত করেছে। মুসলিম বিশ্বের অনেক দেশই ইরানকে সন্দেহের চোখে দেখে এবং প্রায়শই তাদের প্রতি প্রকাশ্যে শত্রুতা পোষণ করে।

আরব উপসাগরীয় দেশগুলোর বর্তমান অবস্থান বোঝার জন্য তাদের অর্থনৈতিক অগ্রাধিকারও গুরুত্বপূর্ণ। সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতারসহ অনেক দেশ এখন স্থিতিশীলতা, বিনিয়োগ, পর্যটন, প্রযুক্তি ও অবকাঠামো উন্নয়নকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে। সৌদি আরব তার দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক রূপান্তর পরিকল্পনায় তেলনির্ভরতা কমানো, পর্যটন বাড়ানো এবং বৃহৎ বিনিয়োগ আকর্ষণে মনোযোগী। যুদ্ধের বিস্তার তাদের এই পরিকল্পনাকে ঝুঁকির মুখে ফেলতে পারে। রয়টার্স জানিয়েছে, চলমান সংঘাতের প্রভাবে অন্তত কয়েকটি উপসাগরীয় দেশ সার্বভৌম তহবিল বিনিয়োগ কৌশল পুনর্বিবেচনা করছে এবং অর্থনৈতিক অভিঘাত সামলানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে।

এখানেই মূল আস্থার সংকটটি স্পষ্ট হয়। অনেক আরব দেশের ধারণা, ইরানকে শক্তিশালী করা মানে এমন একটি রাষ্ট্রকে আরও প্রভাবশালী করা, যাকে তারা নিজেদের স্থিতিশীলতা ও অর্থনৈতিক নিরাপত্তার জন্য হুমকি মনে করে। ফরাসি বিশেষজ্ঞ ফ্যাব্রিস ব্যালানশ বলছেন, ’উপসাগরীয় দেশগুলো বুঝতে পারছে যে ইরান মাত্র কয়েকটি আঘাতেই তাদের সমস্ত অর্থনৈতিক উন্নয়ন ধ্বংস করে দিতে পারে। সব মিলিয়ে ইরান আবারও এই অঞ্চলের প্রধান হুমকি হয়ে উঠছে।’ তাঁর আরেকটি মন্তব্যও আলোচনায় এসেছে: ’বর্তমান প্রেক্ষাপট অনিবার্যভাবে সৌদি আরবকে ইসরায়েলের আরও কাছাকাছি যেতে বাধ্য করবে।’ ২০২০ সালের আব্রাহাম অ্যাকর্ডসের মধ্য দিয়ে সংযুক্ত আরব আমিরাত ও বাহরাইনসহ কয়েকটি আরব দেশ ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করেছিল; যুদ্ধ-পরবর্তী বাস্তবতা সেই নিরাপত্তা-সমীকরণকে আরও ত্বরান্বিত করতে পারে বলে বিশ্লেষকদের ধারণা।

তবে এর অর্থ এই নয় যে পুরো মুসলিম বিশ্ব একযোগে ইরানবিরোধী অবস্থান নিয়েছে। ওমান ও কাতার বহুবারই ইরান-সংক্রান্ত আলোচনায় মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করেছে। রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুদ্ধ শুরুর আগ পর্যন্ত ওমান যুক্তরাষ্ট্র-ইরান পরোক্ষ সংলাপেও ভূমিকা রাখছিল। কিন্তু হামলা, পাল্টা হামলা এবং হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে সংকট গভীর হওয়ায় এই মধ্যস্থতার ক্ষেত্রও সংকুচিত হয়ে এসেছে।

সব মিলিয়ে চিত্রটি স্পষ্ট: মুসলিম বিশ্বের বড় অংশ ইরানকে সহায়তা না করার পেছনে কেবল মতাদর্শ নয়, বরং নিরাপত্তা, অর্থনীতি, আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা এবং পুরোনো অবিশ্বাস-সব মিলিয়ে কাজ করছে। ইসলামি সংহতির ভাষ্য রাজনৈতিক বক্তৃতায় যতটা শক্তিশালী, রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্তে তার প্রভাব ততটা সরল নয়। বর্তমান যুদ্ধ সেই বাস্তবতাকেই আরও নির্মমভাবে সামনে এনে দিয়েছে।


সম্পর্কিত নিউজ