{{ news.section.title }}
বিশ্ববাজারে তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি কত ডলার ছাড়ালো
মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের বিস্তার এবার সরাসরি বিশ্ব জ্বালানি বাজারে বড় ধাক্কা হিসেবে দেখা দিচ্ছে। ইরানের সাউথ পার্স গ্যাসক্ষেত্রে হামলার পর তার জবাবে সৌদি আরব, কাতার ও কুয়েতসহ উপসাগরীয় অঞ্চলের জ্বালানি স্থাপনাগুলোতে ইরানের পাল্টা আঘাতের ঘটনায় আন্তর্জাতিক বাজারে তেল ও গ্যাসের দাম দ্রুত বেড়ে গেছে।
বৃহস্পতিবার (১৯ মার্চ) ভোরে ব্রেন্ট ক্রুডের ফিউচার দাম ব্যারেলপ্রতি ১১৫ ডলার অতিক্রম করে, যা এক সপ্তাহের বেশি সময়ের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়। একই সঙ্গে গ্যাসবাজারেও অস্বাভাবিক অস্থিরতা তৈরি হয়েছে, বিশেষ করে কাতারের এলএনজি অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার খবরে সরবরাহ নিয়ে নতুন উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।
রয়টার্স জানায়, ইরানের বিরুদ্ধে চলমান যুদ্ধের নতুন ধাপে ইসরায়েলের হামলায় সাউথ পার্স গ্যাসক্ষেত্র ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পর তেহরান উপসাগরীয় জ্বালানি অবকাঠামোকে লক্ষ্য করে হামলা চালায়। এতে কাতারের রাস লাফান শিল্পাঞ্চল, কুয়েতের মিনা আল-আহমাদি রিফাইনারি এবং সৌদি আরবের কয়েকটি জ্বালানি স্থাপনায় আঘাত লাগে বা হামলার চেষ্টা হয়। বাজারে তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় ব্রেন্ট ১১৫.১০ ডলার পর্যন্ত উঠে যায়, পরে কিছুটা নেমে এলেও তা ১১৩ ডলারের ওপরে থাকে। একই সময়ে ডব্লিউটিআইও বড় উত্থান দেখায়।
হরমুজ প্রণালি এখন সবচেয়ে বড় অনিশ্চয়তা
বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান সংকটের কেন্দ্রবিন্দুতে আছে হরমুজ প্রণালি। বিশ্বে শান্তিকালীন সময়ে মোট তেল ও এলএনজি সরবরাহের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই জলপথ দিয়ে যায়। রয়টার্সের একাধিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুদ্ধ শুরুর পর থেকে এই পথের জাহাজ চলাচল মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে, আর তেহরান কার্যত এটিকে অবরুদ্ধ করে রেখেছে। এর ফলে শুধু মধ্যপ্রাচ্যের তেল নয়, বৈশ্বিক গ্যাস সরবরাহও চাপের মুখে পড়েছে। কাতার ইতোমধ্যে তাদের এলএনজি উৎপাদন স্থগিত করেছে বলে রয়টার্স জানিয়েছে, যা বৈশ্বিক গ্যাসবাজারে বড় ঝুঁকি তৈরি করছে।
এই প্রেক্ষাপটে তেলবাজার বিশ্লেষণা প্রতিষ্ঠান ভান্ডা ইনসাইটসের প্রতিষ্ঠাতা বন্দনা হারি আল-জাজিরাকে বলেন, “Benchmark Middle Eastern crudes like Oman and Dubai have already crossed the $150 threshold, so $200 is already within sight, even if not for Brent and West Texas Intermediate.” তিনি আরও বলেন, “How much further crude climbs from here almost entirely hinges on how much longer the Strait of Hormuz remains closed.” আল-জাজিরার বিশ্লেষণ অনুযায়ী, এখন তেলের ভবিষ্যৎ দামের প্রশ্নে প্রায় সব হিসাবই গিয়ে ঠেকছে এই একটি বিষয়েই-হরমুজ কত দিন অচল থাকে।
শুধু তেল নয়, গ্যাসও বড় ঝুঁকিতে
এবারের সংকটে শুধু তেলের দাম বাড়ছে না, গ্যাসবাজারেও চাপ বাড়ছে। সাউথ পার্স বিশ্বের বৃহৎ গ্যাসক্ষেত্রগুলোর একটি, আর এর সঙ্গে কাতারের যৌথ অংশীদারিত্ব রয়েছে। এই ক্ষেত্রকে ঘিরে সামরিক উত্তেজনা বাড়ায় কাতারের এলএনজি খাতেও বড় ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। রয়টার্স বলছে, রাস লাফানে “extensive damage” হওয়ার আশঙ্কা এবং কাতারের উৎপাদন স্থগিত হওয়ায় বৈশ্বিক গ্যাস সরবরাহে দীর্ঘমেয়াদি বিঘ্নের শঙ্কা তৈরি হয়েছে। এর ফলে ইউরোপ ও এশিয়া-দুই অঞ্চলের বাজারেই গ্যাসের দাম লাফিয়ে বাড়তে পারে।
বাজারে ভয়, বিশ্ব অর্থনীতিতে নতুন চাপ
জ্বালানি দামের এই উত্থান ইতোমধ্যে শেয়ারবাজারেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। রয়টার্সের বাজার-সংক্রান্ত প্রতিবেদনে দেখা যায়, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত তীব্র হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া ও এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের বিভিন্ন সূচকে বড় ধরনের পতন দেখা দিয়েছে। বিনিয়োগকারীরা এখন শঙ্কা করছেন, উচ্চ জ্বালানি মূল্য বিশ্ব অর্থনীতিতে নতুন করে মুদ্রাস্ফীতির চাপ সৃষ্টি করতে পারে, আর তাতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর সুদহার-নীতি আরও কঠোর হয়ে উঠতে পারে।
রয়টার্সের আরেক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই যুদ্ধ ইতোমধ্যে মধ্যপ্রাচ্যের জ্বালানি খাতে একটি “deep, costly scar” তৈরি করেছে। এমনকি যুদ্ধ বন্ধ হলেও হরমুজ ঘিরে আস্থার সংকট দ্রুত কাটবে না বলে ধারণা করা হচ্ছে। এর মানে, বাজারে একটি স্থায়ী “Middle East risk premium” তৈরি হতে পারে, যা ভবিষ্যতেও তেল ও গ্যাসের দামে অতিরিক্ত চাপ বজায় রাখবে।
সামনে যা হতে পারে
বর্তমান পরিস্থিতিতে বাজার বিশ্লেষকদের বড় উদ্বেগ হলো, জ্বালানি অবকাঠামোতে হামলা যদি অব্যাহত থাকে এবং হরমুজ প্রণালি দীর্ঘ সময় বন্ধ থাকে, তাহলে ব্রেন্ট ১১৫ ডলারের বেশি থেকে আরও ওপরে যেতে পারে। আল-জাজিরার বিশ্লেষণে যেমন ২০০ ডলারের আশঙ্কার কথা উঠে এসেছে, তেমনি রয়টার্সও বলছে-এখন বাজার শুধু যুদ্ধের খবর শুনে প্রতিক্রিয়া দেখাচ্ছে না, বরং বাস্তব সরবরাহ-সংকটের আশঙ্কাও দামে যুক্ত হচ্ছে। ফলে সামনে পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হলে বিশ্বজুড়ে পরিবহন, শিল্প, বিদ্যুৎ ও খাদ্য সরবরাহ ব্যয়ও বাড়তে পারে।