{{ news.section.title }}
ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্রের হামলায় আইআরজিসি মুখপাত্র নায়িনি নিহত
ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের যৌথ ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় ইরানের ইসলামী বিপ্লবী গার্ড বাহিনী-আইআরজিসির মুখপাত্র জেনারেল আলী মোহাম্মদ নায়িনি নিহত হয়েছেন। শুক্রবার ইরানের রাষ্ট্রীয় ও আধা-সরকারি গণমাধ্যমে এ খবর প্রকাশের পর আইআরজিসির পক্ষ থেকেও তাঁর মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়।
রয়টার্স জানায়, ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনের বরাতে বলা হয়েছে, আইআরজিসির মুখপাত্র ও জনসংযোগ বিভাগের উপপ্রধান আলী মোহাম্মদ নায়িনি হামলায় নিহত হয়েছেন।
ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম তাসনিম নিউজ এজেন্সির বরাতে জানা গেছে, শুক্রবার ভোরে এই হামলা চালানো হয়। বিভিন্ন আঞ্চলিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, হামলার কিছুক্ষণ পরই টেলিগ্রাম বার্তায় নায়িনির মৃত্যুর খবর প্রকাশ করা হয়। এ ঘটনাকে চলমান যুদ্ধের আরেকটি বড় ধাক্কা হিসেবে দেখা হচ্ছে, কারণ সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে ইরানের সামরিক ও কৌশলগত পরিসরের বেশ কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্বকে লক্ষ্য করে হামলার খবর এসেছে।
আলী মোহাম্মদ নায়িনি আইআরজিসির একজন গুরুত্বপূর্ণ মুখ ছিলেন। ২০২৪ সাল থেকে তিনি বাহিনীটির মুখপাত্র হিসেবে কাজ করছিলেন বলে একাধিক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। চলমান যুদ্ধের মধ্যে তিনি ইরানের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা, ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদন এবং যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার সংকল্প নিয়ে বিভিন্ন বক্তব্য দেন। যুদ্ধকালীন সময়ে তাঁর ভূমিকা ছিল শুধু সামরিক বার্তা পৌঁছে দেওয়া নয়, বরং অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক পরিসরে ইরানের অবস্থান প্রচার করাও।
মেহর নিউজের বরাতে প্রকাশিত প্রতিবেদনের সূত্র ধরে তুর্কি টুডে জানায়, নিহত হওয়ার আগে এক বিবৃতিতে জেনারেল নায়িনি দৃঢ়তার সঙ্গে জানিয়েছিলেন, ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের ক্রমাগত হামলা সত্ত্বেও তেহরান এখনো ক্ষেপণাস্ত্র তৈরিতে সক্ষম। অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের লাইভ আপডেটেও বলা হয়েছে, তিনি নিহত হওয়ার আগে ইরান এখনো ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদন অব্যাহত রাখতে পারছে বলে দাবি করেছিলেন। অর্থাৎ, মৃত্যুর ঠিক আগে পর্যন্তও তিনি প্রকাশ্যে প্রতিরোধের ভাষ্য তুলে ধরছিলেন।
যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার সংকল্প ব্যক্ত করে নায়িনি বলেছিলেন, “এ লড়াই চলবে।” ইরানের জনগণের আকাঙ্ক্ষা তুলে ধরে এই জেনারেল বলেন, “জনগণ চায়, শত্রু পুরোপুরি নিঃশেষ না হওয়া পর্যন্ত এ যুদ্ধ চলুক।” যুদ্ধের সমাপ্তি নিয়ে তিনি বলেন, “দেশ থেকে যখন যুদ্ধের কালো ছায়া পুরোপুরি সরে যাবে, তখনই এ যুদ্ধের অবসান ঘটা উচিত।” তাঁর এই বক্তব্য যুদ্ধের সামরিক মাত্রার পাশাপাশি মনস্তাত্ত্বিক ও রাজনৈতিক দিকটিও স্পষ্ট করে। ইরানি নেতৃত্ব ও আইআরজিসির বার্তায় সাম্প্রতিক দিনগুলোতে যে আপসহীন অবস্থান দেখা গেছে, নায়িনির শেষদিকের বক্তব্যও তারই ধারাবাহিকতা।
নায়িনির মৃত্যুর ঘটনায় যুদ্ধ আরও কোন পথে মোড় নেবে, তা এখনো পরিষ্কার নয়। তবে বিশ্লেষকদের মতে, আইআরজিসির মুখপাত্রকে লক্ষ্য করে হামলা শুধু একটি ব্যক্তিগত ক্ষয়ক্ষতি নয়; এটি ইরানের সামরিক বার্তাব্যবস্থা ও প্রতীকী নেতৃত্বের ওপরও আঘাত। রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন ও আইআরজিসির বিবৃতিতে এই ঘটনাকে “আক্রমণ” এবং “সন্ত্রাসী হামলা” হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। একই সময় ইরানপন্থী সংবাদমাধ্যমগুলো তাঁর মৃত্যুকে শহীদত্বের ভাষ্যে তুলে ধরছে, যা থেকে বোঝা যায়, তেহরান এই ঘটনাকে শুধু নিরাপত্তা-সংকট নয়, রাজনৈতিকভাবে জনগণকে সংগঠিত করার এক উপাদান হিসেবেও ব্যবহার করতে পারে।
চলমান সংঘাতে এরই মধ্যে ইরান, ইসরায়েল, লেবানন ও উপসাগরীয় অঞ্চলের বিভিন্ন স্থানে হামলা-পাল্টা হামলার পরিধি বেড়েছে। অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের আপডেট বলছে, যুদ্ধ এখন কেবল সামরিক ঘাঁটি বা সীমিত লক্ষ্যবস্তুতে সীমাবদ্ধ নেই; এর প্রভাব জ্বালানি অবকাঠামো, জননিরাপত্তা এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার ওপরও পড়ছে। এই প্রেক্ষাপটে নায়িনির মৃত্যু ইরানের জন্য শুধু প্রতীকী ক্ষতি নয়, যুদ্ধের ভাষ্য নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রেও একটি বড় ধাক্কা হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
সব মিলিয়ে, আলী মোহাম্মদ নায়িনির মৃত্যু মধ্যপ্রাচ্যের এই যুদ্ধকে আরও তীব্র ও অনিশ্চিত এক পর্যায়ে নিয়ে গেল। তাঁর শেষদিকের বক্তব্যে যেমন প্রতিরোধের সুর ছিল প্রবল, তেমনি তাঁর নিহত হওয়ার খবর প্রমাণ করল-যুদ্ধ এখন ইরানের ভেতরের উচ্চপর্যায়ের সামরিক ব্যক্তিত্বদের কাছেও সরাসরি পৌঁছে গেছে। সামনে তেহরান কীভাবে এর জবাব দেয়, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।
সূত্র: রয়টার্স