আল-আকসায় ঈদের নামাজে ইসরায়েলের বাধা

আল-আকসায় ঈদের নামাজে ইসরায়েলের বাধা
ছবির ক্যাপশান, আল-আকসায় ঈদের নামাজে ইসরায়েলের বাধা

পবিত্র ঈদুল ফিতর উপলক্ষে আল-আকসা মসজিদে ফিলিস্তিনিদের প্রবেশে বাধা দিয়েছে ইসরায়েলি বাহিনী। ফলে শত শত মুসল্লি মসজিদের ভেতরে প্রবেশ করতে না পেরে প্রবেশদ্বার, আশপাশের সড়ক এবং পুরনো জেরুজালেমের বিভিন্ন খোলা স্থানে ঈদের নামাজ আদায় করেন।

ফিলিস্তিনি বার্তা সংস্থা ওয়াফা জানিয়েছে, শুক্রবার সকালে দখলকৃত পূর্ব জেরুজালেমে আল-আকসা প্রাঙ্গণে ঈদের জামাত নিষিদ্ধ করা হয় এবং ইসরায়েলি বাহিনী মসজিদমুখী বিভিন্ন পথ বন্ধ করে দেয়।

খবরে বলা হয়েছে, মুসল্লিরা দামাস্কাস গেটসহ আল-আকসার আশপাশের সম্ভাব্য প্রবেশপথগুলোতে জড়ো হন। ইসরায়েলি বাহিনী মসজিদের ভেতরে প্রবেশের সুযোগ না দেওয়ায় তারা বাইরে অবস্থান করেই ঈদের জামাত সম্পন্ন করেন। আল জাজিরার লাইভ আপডেটেও বলা হয়েছে, আল-আকসা ২১ দিন ধরে বন্ধ রয়েছে এবং একই সময়ে গাজায় ফিলিস্তিনিরা ধ্বংসস্তূপের মধ্যে ঈদ উদযাপন করছেন।

জেরুজালেম গভর্নরেট এই পদক্ষেপের তীব্র নিন্দা জানিয়েছে। তাদের ভাষ্যে, এটি ধর্মীয় স্বাধীনতার ওপর সরাসরি আঘাত এবং একটি “বিপজ্জনক উসকানি”। ওয়াফার প্রতিবেদন অনুযায়ী, গভর্নরেট বলেছে, এ ধরনের পদক্ষেপের লক্ষ্য হলো নতুন বাস্তবতা চাপিয়ে দেওয়া এবং আল-আকসা মসজিদকে তার ফিলিস্তিনি ও ইসলামি পরিবেশ থেকে বিচ্ছিন্ন করা। গভর্নরেট আরও সতর্ক করেছে, এই নীতি জেরুজালেমের ধর্মীয় ও ঐতিহাসিক অবস্থান বদলে দেওয়ার প্রচেষ্টার অংশ।

আল-আকসা মসজিদ টানা ২১ দিন বন্ধ থাকার বিষয়টিও এখন বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠেছে। ওয়াফা ১৮ মার্চের এক প্রতিবেদনে জানিয়েছিল, ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষ নিরাপত্তার অজুহাতে টানা ২০ দিন আল-আকসা বন্ধ রেখেছে এবং উপাসকদের প্রবেশে বাধা দিয়েছে। এর এক দিন পর ঈদের সকালে সেই নিষেধাজ্ঞা আরও কড়া আকারে দেখা যায়। ওয়াফার আরেক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ১৯৬৭ সালের পর এই প্রথম আল-আকসায় উপাসনা ও ধর্মীয় আচার পালনে এমনভাবে বাধা দেওয়া হয়েছে।

জেরুজালেমে ঈদের আনন্দের বদলে অনিশ্চয়তা

সাধারণত ঈদুল ফিতরের দিন ভোর থেকে আল-আকসা মসজিদ প্রাঙ্গণ মুসল্লিতে ভরে যায়। পুরনো জেরুজালেমের সরু গলি, মসজিদের আঙিনা, আশপাশের বাজার-সব জায়গায় থাকে উৎসবের আবহ। কিন্তু এবার পরিস্থিতি ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। ইসরায়েলি সেনা ও পুলিশি উপস্থিতির মধ্যে অনেক মুসল্লিকেই প্রবেশমুখে আটকে দেওয়া হয়। কেউ কেউ মসজিদের কাছাকাছি পৌঁছালেও আর এগোতে পারেননি। ফলে প্রবেশদ্বারের সামনের রাস্তাই হয়ে ওঠে তাদের নামাজের স্থান। ওয়াফার ভাষ্যমতে, এই পরিস্থিতি জেরুজালেমজুড়ে ক্ষোভ ও হতাশা তৈরি করেছে।

ধর্মীয় উৎসবের দিনে এমন পদক্ষেপ ফিলিস্তিনিদের কাছে কেবল নিরাপত্তা-নিয়ন্ত্রণের বিষয় নয়, বরং তাদের ধর্মীয় অধিকার, জাতীয় পরিচয় এবং ঐতিহাসিক সংযোগের প্রশ্নের সঙ্গেও জড়িত। আল-আকসা শুধু একটি মসজিদ নয়; এটি মুসলিম বিশ্বের অন্যতম পবিত্র স্থান এবং ফিলিস্তিনি জাতীয় অনুভূতির একটি কেন্দ্রীয় প্রতীক। তাই ঈদের জামাতের মতো গুরুত্বপূর্ণ এক দিনে মসজিদে প্রবেশ বন্ধ করে দেওয়া ফিলিস্তিনিদের কাছে বড় ধরনের অপমান ও দমনমূলক বার্তা হিসেবেই ধরা হচ্ছে। এই প্রেক্ষাপটে জেরুজালেম গভর্নরেটের ভাষ্য, আল-আকসাকে তার প্রাকৃতিক ইসলামি ও ফিলিস্তিনি পরিবেশ থেকে বিচ্ছিন্ন করার চেষ্টা চলছে।

গাজায় ধ্বংসস্তূপের মাঝেও ঈদের নামাজ

এদিকে গাজা উপত্যকায়ও ঈদের চিত্র ছিল বেদনাবিধুর। আল জাজিরা ও ওয়াফার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সেখানে বহু পরিবার খোলা জায়গায়, ধ্বংসপ্রাপ্ত মসজিদের সামনে কিংবা ক্ষতিগ্রস্ত আবাসিক এলাকার ফাঁকা স্থানে ঈদের জামাতে অংশ নেয়। খান ইউনিসের উত্তরে হামাদ সিটিতে শত শত মানুষ উন্মুক্ত স্থানে ঈদের নামাজ আদায় করেছেন বলে ওয়াফা জানিয়েছে। কঠিন মানবিক সংকট, বাস্তুচ্যুতি এবং চলমান বিধিনিষেধের মধ্যেও মানুষ ঈদের ঐতিহ্য ধরে রাখার চেষ্টা করেছেন।

গাজার ধর্মীয় অবকাঠামোর ক্ষয়ক্ষতিও ভয়াবহ। ওয়াফা জানিয়েছে, ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে শুরু হওয়া যুদ্ধে গাজায় প্রায় ১ হাজার ২৪০টি মসজিদের মধ্যে ১ হাজার ১০০টির বেশি আংশিক বা সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়েছে। আল জাজিরার লাইভ আপডেটেও একই সংখ্যা উদ্ধৃত করে বলা হয়েছে, দেরি ২০২৩ থেকে ইসরায়েলি হামলায় গাজার অধিকাংশ মসজিদ ধ্বংস বা অকার্যকর হয়ে পড়েছে। অন্যদিকে রয়টার্সের ফেব্রুয়ারির এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, গাজায় অন্তত ৮৩৫টি মসজিদ সম্পূর্ণ ধ্বংস এবং আরও ১৮০টির বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। অর্থাৎ ভিন্ন সূত্রে কিছু পার্থক্য থাকলেও সামগ্রিক চিত্র একই-গাজায় ধর্মীয় স্থাপনাগুলোর ওপর ধ্বংসযজ্ঞ ব্যাপক মাত্রায় হয়েছে।

এই ধ্বংসস্তূপের মাঝেও ঈদের নামাজ আদায় ফিলিস্তিনিদের এক ধরনের স্থিতিস্থাপকতার বার্তা বহন করে। খোলা আকাশের নিচে, ভাঙা মিনার ও ক্ষতিগ্রস্ত মসজিদের সামনে দাঁড়িয়ে নামাজ আদায় করা শুধু ধর্মীয় অনুশীলন নয়, বরং টিকে থাকারও এক প্রতীকী প্রকাশ। যুদ্ধ, অবরোধ, ক্ষুধা, বাস্তুচ্যুতি ও প্রিয়জন হারানোর বেদনার মধ্যেও তারা ধর্মীয় আচার থেকে পুরোপুরি সরে যাননি। আল জাজিরা বলছে, এই ঈদ গাজায় আনন্দের উৎসবের চেয়ে অনেক বেশি হয়ে উঠেছে স্মৃতি, শোক এবং টিকে থাকার দিন।

 

সূত্র: আল জাজিরা এবং  ওয়াফা


সম্পর্কিত নিউজ